আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমাদের শিক্ষাঙ্গনে অবকাশ

গত পরশু সকালে কলেজে গিয়েই শুনলাম সেকন্ড ইয়ারের একটা ছেলে কলেজের ১৫ তলার ছাত থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। একজন শিক্ষক দেখে ফেলায় ছেলেটি প্রাণে বেঁচে যায়। ছেলেটির আত্মহননের চেষ্টার কারণ পড়াশোনার তীব্র চাপ, বায়োকেমিস্ট্রির একগাদা পেন্ডিং আইটেম(মেডিকেল কলেজের ক্লাস-টেস্ট তথা টিউটোরিয়াল)। মনটা ভারী হয়ে গেল। আইটেম নেয়ার ফাঁকে এ নিয়ে ছাত্রদের সাথে দু-একটা কথা বললাম।

স্কুল থেকেই চলছে এই অসুস্থ মধ্যবিধ সম্প্রদায়ের অসুস্থ ইঁদুর-দৌড়। আমাদের শৈশব-কৈশোর এতটা নির্মম ছিল না। এতটা ইঁদুর-কল ছিল না স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। এখনকার স্কুল-কলেজ-মেডিকেল কলেজ পড়ুয়াদের জীবন দেখলে আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। বাস্তবিক পক্ষে এদের কোন ছুটি নেই।

স্কুল যদি কোন কারণে লম্বা ছুটি দিচ্ছে তো স্কুলেই কোচিং ক্লাস চলছে। এস,এস,সির পর কলেজ ভর্তি কোচিং, এইচ,এস,সির পর বুয়েট-মেডিকেল-ভার্সিটি ভর্তির কোচিং, পাশ করার পর সাত রাজার ধন এক মানিক- চাকরী মেলার পর বস তথা কর্পোরেট-দালালদের তুষ্ট করার জন্য রোবটের মত কাজ করে অফিসকে নিজের ডেরা বানানো- মোটামুটি এই দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের জীবন। তরুণ ডাক্তারদের অবস্থা তো জঘন্য, ঢাকায় জীবন-ধারণের টাকাটা উপার্জন করতে তাঁদের সপ্তাহে ৭২-৮৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয় এবং এই থেকে তাঁদের আয় হয় ৩০-৩২ হাজার টাকা- যে টাকাটা তাঁদের সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টাতেই প্রাপ্য। এই অসুস্থ বিদ্যা-ব্যবসা আমাদের জন্য শুভ নয়। শিক্ষার নামে মানবিকতা বর্জিত এই বিরামহীন নিষ্পেশনযন্ত্র আমাদের কিছু কলের মানুষ উপহার দেবে, মানুষ নয়।

কিছু শিক্ষার্থী নিজ যোগ্যতায় মানুষ হবে ঠিকই কিন্তু এই কৃষ্ণগহ্বর তাদের গ্রাস করে নেবে। সমাধানের পথ ভাবা উচিত এখনই।

“There’s no point in bringing a baby into the world if all that it’s going to do is work to go on living, to go on living and work to go on living again. If that’s all the point of life then what are we here for?” – প্রোফেসর রিচার্ড ডকিন্সের একটা লেকচারে এই কথাগুলো খুব মনে ধরেছিল। অথচ এর ঠিক উল্টোটাই হয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। আমাদের স্কুলে একটি কুখ্যাত আইন করা হয়েছিল- “বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের কোথাও কোন ধরণের খেলাধূলা করা যাবে না।

“ মনে আছে স্কুল ছাড়ার দিন ডায়াসে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে আমি আবেগে ভেসে না গিয়ে স্কুলের এই কালা-কানুনসহ কয়েকটি অসঙ্গতির তীব্র সমালোচনা করি। এখন সেভেন পড়ুয়া ছোট ভাই অর্জুনের মুখে শুনতে পাই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কালা-কানুনটি রদ করেছে। কিন্তু ছাত্রদের এখন আর খেলার সময় নেই একদম! আমি যে সময়কার কথা বললাম তখন আমাদের এই স্কুলটি কাগজে-কলমে দেশের সেরা স্কুল নির্বাচিত হয়েছিল তৃতীয়বারের মত। গত বছর গরমের সময় অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোদের গরমের ছুটি-টুটি দেয়?”
“হ্যাঁ দেয় তো! এই মাস তো প্রায় পুরোটাই ছুটি। “
-তাহলে দিনরাত ব্যাগ নিয়ে কোথায় ছুটছিস?
-কেন ছুটির মধ্যে কোচিং হবে স্কুলে।


আমি প্রমাদ গুণলাম। এ কেমনতর ছুটি? 'ছুটির দিনে ছুটোছুটি'র বদলে কোচিং! এর চেয়ে আমাদের সেই সাত দিনের নিশ্চিন্ত “আমের ছুটি”ই ভালো ছিল। ২০ দিনের ছুটির নামে এরা পেল কোচিং এর জাঁতাকল। অজানতেই পুঁজির কাঁচামাল হয়ে গেল কচি-কাঁচার দল!
মেডিকেল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় আমাদের এনাটমির ব্যাচ-টিচার ফাতেমা ম্যাডাম বলেছিলেন, “ছুটি ছুটি করেই আমাদের জাতটা গেল। বাইরের ওরা খালি কাজ আর কাজ করে।

” আমি তখন মৃদু প্রতিবাদ করতে গিয়েও থেমে গিয়েছিলাম পণ্ডশ্রম হবে ভেবে। কেন আমাদের ছুটির জন্য এত ছোঁক-ছোঁক? আমরা কি ভেবে দেখেছি? বৈধ ছুটি কম বলেই কিন্তু এত অঘোষিত ছুটি, ক্যাম্পাসে অটো-ভ্যাকেশন ইত্যাদির প্রাদুর্ভাব! ‘বাইরের’ মতো কিন্তু আমাদের ১ মাসের টানা কোন ক্রিসমাসের ছুটি নেই। আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, মেডিকেল কলেজগুলো, সব সরকারী স্কুল-কলেজ সপ্তাহে ৬ দিন খোলা থাকে। ৬দিন খোলা থাকলে শেষ দিনটি হাফ-ডে হবার রীতিটিও মেডিকেল কলেজে মানা হয় না। স্কুলে আমাদের সময় মানা হত।

এখন কী হয় জানি না। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, নটর ডেম কলেজ, হোলি ক্রস কলেজ, বি,এফ শাহীন কলেজ এবং একমাত্র মেডিকেল কলেজ হিসেবে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ সপ্তাহে ৫ টি কর্মদিবসের প্র্যাকটিস অত্যন্ত সফলভাবে করে চলেছে। নটর ডেম কলেজে আমাদের সব সময়ই উইকেন্ডের জন্য পড়া না জমিয়ে উইকেন্ড ‘ইনজয়’ করার পরামর্শ দিতেন প্রোফেসাররা। ‘বাইরে’ কিন্তু আমাদের জন্মেরও আগে থেকে সপ্তাহে ২ দিন ছুটির চল (মোটামুটি পাঁচ এর দশক থেকেই!) এবং কোন মূল্যেই উইকেন্ড মাটি করতে রাজি হতে চায় না ‘বাইরের’ লোকেরা। আমাদের দেশে ঈদ-পুজো-বড়দিন-বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও জাতীয় দিবসগুলোতে যে ছুটিগুলো থাকে সেগুলোর ইফেক্টিভিটি কিন্তু ‘বাইরে’র লম্বা সামার ভ্যাকেশনের মত না।

টানা কোন ছুটিই আমাদের দেশে নেই। ভারতে বেশ লম্বা পুজোর ছুটি আছে। আর সপ্তাহে একদিন ছুটি আসলে কোন ছুটিই না। ওই একদিন মানুষ তার যাবতীয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর চেষ্টা করে। কাজেই এই নিয়মে প্র্যাকটিক্যালি কোন বিশ্রামই সে পায় না।

আর্গোনমিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা স্বাস্থ্যের জন্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক- খুব বেশি বিপজ্জনক। ছাত্রদের তো কোন নৈমিত্তিক ছুটি বা অর্জিত ছুটি নেই। এই ছুটকো-ছাটকা ছুটি কিন্তু টানা ১ মাস ছুটির বা দুইদিন উইকেন্ডের কোন বিকল্প নয়। বাধ্য হয়েই তাদের মন বিদ্রোহ করে বসে, শুরু হয় অনুপস্থিতি কিংবা সবাই মিলে ‘অটো!’ কাজেই দুনিয়ার তাবৎ কাজ ‘বাইরে’র লোকে করে আর আমাদের দেশের লোকে শুধু ভেরেন্ডা ভাজে- এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। আমাদের ফাঁকিবাজি বেশি, কিন্তু তার কারণ কেউ ভাবে না।

আমরা কি এটা ভেবে দেখেছি যে, বৈধ ছুটির অভাব কিন্তু ছাত্রদের ক্লাস ফাঁকি এবং কর্মচারীদের কাজ-ফাঁকির প্রধানতম কারণ। মানুষ যখন কাজের ন্যায্য মূল্য পায় না, কাজ যখন তার ব্যক্তিগত জীবন কেড়ে নেয় তখনই কিন্তু সে ফাঁকি দেয়া শুরু করে। পড়াশোনা বা কাজের জন্য বাড়ি থেকে কয়েকশো মাইল দূরে থাকা ছাত্র বা লোকটি মাসে অন্তত ১-২ বার বাড়িতে অসুস্থ পিতামাতাকে দেখতে যেতে পারবে না- এটা কোন সুস্থ নিয়ম হতে পারে না। আজকাল লোকে বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে, জাফর ইকবাল স্যার তাঁর একটি অনবদ্য কলামে এ নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। ভালো বই পড়তেও প্রয়োজন অবকাশ।

ছাত্রদের মধ্যে এখন নাট্যচর্চা, বিতর্ক, ফিল্ম-ফেস্টিভ্যাল, ছবি-আঁকা, ভালো গানবাজনা শোনা –এসব প্রায় হারিয়েই যাচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির প্রাণ ছাত্রসংসদগুলো অনির্দিষ্টকাল ধরে বন্ধ পড়ে আছে। কাজেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে পড়েছে। আমরা কিন্তু প্রায়ই সংস্কৃতির সংজ্ঞা ভুলে যাই। সংস্কৃতি কিন্তু জীবনের সর্বাঙ্গীন রূপ- নিছক কিছু কালচারাল প্রোগ্রাম মাত্র নয়! মানুষের যে সীমাবদ্ধ সামাজীকিকরণের প্রক্রিয়া আমাদের দেশে চলছে তার পরিণাম শুভ নয়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলে ঢুকতে কোচিং, অতঃপর ভর্তিযুদ্ধ, কচি কচি পিঠে পাহাড়পরিমাণ ব্যাগের বোঝা, পি,এস,সি, জে,এস,সি- স্কুল-ব্যাচ-কোচিং-দম ফেলার সময় পায় না ছেলে-মেয়েগুলো। তারপর মহাযুদ্ধ- এস,এস,সি! এস,এস,সির পরও ফুরসৎ নেই, কলেজে ভর্তিযুদ্ধ! কলেজে ঝোড়োগতির দেড় বছর শেষে এইচ,এস,সি এবং তারপর আবার ৩-৪ মাসের দীর্ঘ কোচিং শেষে “জীবনযুদ্ধ” অর্থাৎ বুয়েট-মেডিকেল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। অর্থাৎ চলমান প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা রোবটের মত বিরামহীন খেটে যায়, তাদের ‘কপোট্রনিক সুখ-দুঃখ’ও মূল্যহীন, তাদের কোন ছুটি নেই, খেলতে তাদের মানা, তারা কোথাও বেড়াতেও যেতে পারে না। অথচ পাশের দেশেই পড়াশোনার তীব্র চাপের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা সামার বা পুজোর ছুটিতে দেশ চষে ফেলছে। জয়েন্ট এন্ট্রান্স তারা নিয়ে ফেলছে এইচ,এস,সির দু সপ্তাহ পরই।

অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি তারা নিচ্ছে উচ্চমাধ্যমিকের সমান্তরালেই। কাজেই জয়েন্টের পর বেশ ঝাড়া-হাত-পা হয়ে কাশ্মীর থেকে আন্দামান ছুটে বেড়ানোর একটা সুযোগ থাকে। তারপরও সেখানে শিক্ষাসংক্রান্ত আত্মহত্যা কম নয়। আমাদের মত সিস্টেম হলে তো ওদের বাঁচিয়ে রাখাই মুশকিল হত! উন্নত দেশগুলোর কথা বাদই দিলাম। তবে ওরা কিন্তু এমনিতেই উন্নত হয় নি।

যৌক্তিক পদ্ধতিগুলোর নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনের মাধ্যমেই তারা উন্নতি করেছে। কাজেই ওটা পাশ্চাত্যের, এখানে বাতিল- এই মানসিকতা থেকে যেমন বেরিয়ে আসতে হবে তেমনি অন্ধ অনুকরণও বন্ধ করতে হবে।

শিক্ষার পরিবেশকে আরো সহনশীল ও জীবনঘনিষ্ঠ করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান একটুও না কমিয়ে তাদেরকে অবকাশ দেয়া সম্ভব। সারা দুনিয়া যেটা পারে আমরা কেন পারব না? আমাদের শিক্ষার্থীরা, আমাদের তরুণরা মেধায় কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই।

সাকিবের 'অরেঞ্জ জুস তত্ত্ব' এখানে বিফল! প্রথমত, অবিলম্বে সব সরকারী-বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে ২ দিন ছুটি চালু করা উচিত। প্রতিদিনের ক্লাস এক ঘণ্টা বাড়িয়ে খুব সহজেই এটা করা সম্ভব। এতে করে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে একটা দিন অন্তত বিশ্রাম পাবে। অবসর ছাড়া কোন সৃজনশীলতা হয় না। দ্বিতীয়ত, স্কুলগুলোতে অন্তত পক্ষে ৭ দিনের গ্রীষ্মকালীন ছুটি দেয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।

এ সময়ে স্কুল-কর্তৃপক্ষের কোচিং করানো নিষিদ্ধ করা দরকার। তৃতীয়ত, সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষার দিকে যেতেই হবে। পাবলিক পরীক্ষার দুই সপ্তাহের মধ্যে সম্মিলিত ভর্তি-পরীক্ষা শুরু হবে এবং ১ মাসের মধ্যেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তিপরীক্ষা শেষ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় মাত্র ৩-৪ দিনে ভর্তিপরীক্ষা নেয়া সম্ভব। নিবন্ধন সবই অনলাইন করা উচিত।

অযথা সারা দেশে ফর্ম জমা দেয়ার জন্য ছুটে বেড়ানোর পাগলামো বন্ধ হবে।

মেডিকেল কলেজগুলোতে সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাস মোটেই যৌক্তিক কিছু নয়। অনেকেই ভাবে বিদেশে সপ্তাহে ৫ দিন ক্লাস নেয় বলেই ওদের ৬-৮ বছর সময় লাগে। এসব ধারণা অজ্ঞতা ও ভুল প্রচারের ফসল। ৮ বছরে কোর্সগুলো আসলে ৪+৪ অর্থাৎ আন্ডারগ্র্যাড প্লাস গ্র্যাজুয়েট কোর্স এবং সেই বিশাল কোর্স তারা সপ্তাহে ৫ দিনে শেষ করছে।

আমাদের আন্ডারগ্র্যাড মেডিকেল কারিকুলাম বিলেতের অনুকরণে গড়া। ওরা কিন্তু সপ্তাহে ৫দিন ক্লাস নিয়ে, উইকেন্ডে নেচে-গেয়ে-পার্টি করে দিব্যি শেষ করে ফেলছে। আমরা কেন পারব না? আমাদের দেশেই আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে প্রতিদিন ৮টা-আড়াইটার পরিবর্তে ৩টা পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে দিব্যি কোর্স শেষ করছে। ইংল্যান্ডের সেরা মেডিকেল স্কুলগুলোতে টিপিক্যালি ৮টা-৪টা বা ৯টা-৫টা ক্লাস নিয়ে ৫ দিনে চালাচ্ছে। রাতে ওয়ার্ড নেই।

সকালে প্রফেসরের রাউন্ডের সময় ওয়ার্ডে ক্লাস! বিলেতের হাসপাতালগুলোতে ৯টা-৫টা, সপ্তাহে ৫দিন (৭দিনই হাসপাতাল খোলা, কিন্তু মাসের অধিকাংশ সপ্তাহে ডাক্তার-নার্সরা ২দিন ছুটি পান), উইকেন্ড ও নাইট রোটার ভিত্তিতে। শুধুমাত্র চেম্বারের সুবিধার জন্যই আমাদের চিকিৎসকরা ৬ দিন আড়াইটা পর্যন্ত অফিস-টাইম মেনে নিয়েছেন। বেতন বাড়িয়ে দিয়ে এই প্রক্রিয়া নিরুৎসাহিত করা উচিত। আরেকটা মজার তথ্য উল্লেখ করি, আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোতে কারিকুলামে উল্লেখিত ক্লাস আওয়ারের প্রায় পৌনে দ্বিগুণ পরিমাণ বেশি ক্লাস নেয়া হয়! যেমন আমার বিভাগে টিউটোরিয়াল হবার কথা মাসে দুটো, আমরা ছাত্র-শিক্ষককে কলুর বলদ জ্ঞান করি। তাই আমরা নিই দুটোর জায়গায় চারটে টিউটোরিয়াল! লেকচারও তথৈব চ! ডাক্তারদের বাধ্যতামূলক কর্মঘণ্টা পৃথিবীর সব দেশেই অন্য পেশার সমান শুধু আমাদের দেশেই ডাক্তারদের কর্মঘণ্টার কোন সীমারেখা নেই।

এটা অন্যায়। এর উল্টোপিঠ হচ্ছে, কাজের স্ট্রেসের অজুহাতে কিন্তু অনেক চিকিৎসকই কিন্তু পেশাগত দুর্ব্যবহারকে জাস্টিফাই করে নেন। এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। যে সব হাসপাতালে পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার আছেন, সেখানে সহজেই রোটা অনুযায়ী ৫দিন ও ৪০ ঘণ্টার স্ট্যান্ডার্ড কর্মসপ্তাহ বাস্তবায়ন সম্ভব। যেখানে লোকবল কম সেখানে নিয়োগ বাড়িয়ে এটা বাস্তবায়ন করা দরকার।

এতে করে কিন্তু চিকিৎসক ও শিক্ষকদের অঘোষিত, অযাচিত ভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা কমবে।
এই বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে এই উপকারগুলো হবে।
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর সাশ্রয়
- অনুপস্থিতি ও ফাঁকিবাজি কমবে
- সাফল্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে
- সৃজনশীলতার বিকাশ
- কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সমন্বয় বাড়বে।
- পড়াশোনা ও কাজে মনোযোগ বাড়বে।
- কর্মে সন্তোষ বাড়বে।


- অযাচিত ছুটি ও ফাঁকিবাজি কমবে ফলে উৎপাদন বাড়বে, কাজের গতি বাড়বে।
- স্ট্রেস কমবে কাজেই অসুস্থতা ও আহত হবার সম্ভাবনা কমবে। স্ট্রেস-রিলেটেড সাইকিয়াট্রিক ডিস্টারব্যান্স কমবে।
- ট্র্যাফিক জ্যাম কমবে।

সুমন চাটুয্যের একটা গান মনে পড়ছে –
“স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী
আমরা কি আর বইতে পারি?
এও কি একটা শাস্তি নয়?
কষ্ট হয়, কষ্ট হয়!
আমার কষ্ট বুঝতে চাও
দোহাই পড়ার চাপ কমাও
কষ্ট হয়, কষ্ট হয়।


পড়ার চাপে চেপ্টে গিয়ে,
কী করব এই শিক্ষা নিয়ে?
অমুক হও, তমুক হও, মমুক হও, তমুক হও-
কেউ বলে না মানুষ হও।
এত্ত রকম পরীক্ষায়
আমার খালি কান্না পায়,
কে করল রে এ নিয়ম?
লোকটা বোধ হয় খেলার যম!
খেলবে কেন, অঙ্ক করো,
যোগ্য হবার রাস্তা ধরো।
কোথায় রাস্তা কোথায় যাবো?
কোথায় গেলে শুনতে পাবো-
একটু পড়া, অনেক খেলা
গল্প শোনা সন্ধ্যেবেলা।
রাতের হাওয়ায় বুকের কাছে
স্বপ্ন দেখার গল্প আছে।

। "
প্রতিদিন সকালে মাস্টারি করতে যাবার সময় আমি এবং আমার পত্নী নানারকম ব্যাগের ভারে নুয়ে পড়া শিশুগুলোকে দেখি। বাইকের পেছনে বসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়া মেয়েকে দেখলে আমাদেরই কান্না পায়। আমরা নিজেরাই কি মানুষ? কবে আমরা মানুষ গড়ার সিস্টেম গড়ব? রোবট গড়ার নয়?

(লেখাটি তানিম এহসান ভাইকে উৎসর্গ করা হল)

সোর্স: http://www.sachalayatan.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.