আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

স্বপ্ন গুলো উড়ে যায়, আকাশের মেঘের সাথে। গল্প

স্বপ্ন গুলো উড়ে যায়, আকাশের মেঘের সাথে। দুই দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। থামার কোন লক্ষন নেই। রাস্তা ঘাট ডুবে গিয়ে নদীর মত জলে থৈ-থৈ করছে। আষাঢ়ের প্রথম দিন হতেই এই অবস্থা, সামনে যে কি হবে? শিউলি ভেবে শিউরে উঠে।

সে তাকিয়ে আছে তার বস্তি ঘরের চালের দিকে। ঘরে হাড়ি পাতিল গুলি সারা ঘরে বিছিয়ে রেখেছে। তারপরও দুটা ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে। ঘরের চারপাশে নোংরা পানিতে ভনভন করে মাছি আর মশা উড়ছে। দরজার কাছে হাটু পানি জমেছে।

সেই নোংরা পানি পেড়িয়ে আজ আর গামের্ন্টেসে যেতে ইচ্ছে করছে না শিউলির। গতকাল ফেরার পথে বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ফিরে ছিল বলেই হয়ত রাত থেকেই গা গরম লাগছে। সুপারভাইজ আর ইনর্চাজরা কি তার এসব অজুহাত শুনবে? দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সে। তাছাড়া একদিন ছুটি বা অ্যাবসেন্ড হলে হাজিরা বোনাসের ৩০০ টাকা পাওয়া যাবে না। শিউলির মনটা খারাপ হয়ে যায়।

সে বিসন্ন দৃষ্টিতে বৃষ্টি দেখতে থাকে। পিছন হতে সহকর্মী রওশন বলে কিরে গোসল করবি না। সাত টা বাইজ্জা গেল কামে যাবিনা? শিউলি অলস ভঙ্গিতে উঠে দাড়ায়। অনেকক্ষন পর দাড়ানোর কারনে তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে। সে হাত বাড়িয়ে কবাটের কাঠ ধরে।

তার খুব কান্না পায়। নিজেকে বড় একা আর অসহয় মনে হয়। আয়নাটা দিয়ে নিজের মুখটাকে দেখে সে। নিজেকে বড় অচেনা মনে হয়। চেহারায় কেমন রুক্ষতা ফুটে উঠছে।

বাস্তবতার কঠিন যাতাকলে পড়ে হারিয়ে গেছে তার নারী সুলভ কোমলতা। রংজ্বলা হলুদ সুতির জামাটার মত যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তার জীবন। সুই সুতার কাজ করতে গিয়ে চোখের উপর অনেক প্রেসার যায় তাই প্রায়ই চোখ জ্বলে। ফ্যাক্টরীর ডাঃ পরীক্ষা করে চশমা পড়তে বলেছে তাকে। সে দুঃখে হেসেছে শুধু।

গরীবের কি চশমা মানায়? সবাই তাকে নিয়ে হয়ত ঠাট্টা মশকরা করবে। ভাগ্যকে সুযোগ পেলেই দোষ দেয় শিউলি। চারদিকের নানান যন্ত্রনার সাথে ইদানীং নতুন যন্ত্রনা দেখা দিয়েছে। লাইন সুপারভাইজার কামরুল বেশ কিছুদিন হল তার পিছু লেগেছে। সে লোভ দেখায় নতুন সংসারের।

বলে, আমার সংসারে তুই রানী হয়ে থাকবি। সে আরো কত কিছু বলে, কিন্তু শিউলির মনে হয় এ সবি কামরুল বানিয়ে বানিয়ে বলছে। সে মনে মনে বলে পুরুষের হাড় আমার চেনা আছে। শুরুর দিকে এরকম ভালো ভালো কথা বলার পর বছর ঘুরতেই তাদের আসল বন্য রুপ বেড়িয়ে যায়। তাই মন হতে কামরুলকে বিদায় করে সে।

শিউলি ফিরে যায় অতিতে। বাবা মায়ের সংসারে ভালই ছিল স। তার বাবার ছিল বরিসালে ফলের দোকান। বাবার আয়ে পাচ ভাইবোনের সংসারে সে খারাপ ছিল না। তারপর রিকসার গ্যারেজের মালিক রানার সাথে তার প্রেম হয়।

বাবা মায়ের অমতে বিয়ে করে রানাকে। বাবা মা তাকে বলে তোর মত মেয়ে আমাদের দরকার নেই। খুব কষ্ট পেয়েছিল সেদিন শিউলি। সেও তাই প্রতিজ্ঞা করে ছিল আর কখনো ওদের দুয়ারে যাবে না সে। রানা রিকসার মিস্তি হিসেবে বেশ ভাল ছিল।

আয় রোজগার দিয়ে ভালই যাচ্ছিল তার দিন। কিন্তু রানার নেশা করাটাই অসহ্য লাগত শিউলির। বিয়ের আগে সে জানতো রানা শুধু সিগেরেট খায় কিন্তু বিয়ের পর দেখলো গাজা আর বাংলা মদও খায় রানা। কত অভিমান ঝগড়া সে করেছে কিন্তু রানা কে ফেরানো যায়নী। এক সময় এটাকে নিয়তি বলেই মেনে নিয়ে ছিল সে।

রানা যখন নেশা করতো তখন সামান্য কথাতেই গায়ে হাত তুলতো। বন্য পশুর মত হয়ে যেত তার লাল চোখ। তারপরও তাদের সংসার চলতে ছিল। দেড় বছরের মাথায় এল সেই কালো দিন। রানা গ্যারেজে ভাড়া করা মেয়ে মানুষ নিয়ে ধরা পড়ল।

সাত দিন জেল খেটে ঘরে ফিরলো। কিন্তু শিউলি তখন আর সে সংসারে থাকবে কি করে? যেখানে বিশ্বাসের কোন মূল্য নেই। বুকটা তার ভেঙ্গে গেল। মায়ের সংসারে পরাজিত মুখ নিয়ে যাবার কোন ইচ্ছে তার হলনা। তাই প্রতিবেশি রহিমা খালার হাত ধরে চলে এল এই ঢাকা শহরে।

প্রথমে মির পুরের একটা গামের্ন্টেসে কাজ নিয়ে ছিল হেলপার পদে। তারপর আরো দুইটি ফ্যাক্টারী ঘুরে এখানে এসেছে। সুয়িং মেশিন অপারেটর পদে কাজ করছে সে। ছোট এই জিবনে এত বেশি ঘাত-প্রতিঘাত তাকে সইতে হয়েছে যে শিউলির মাঝে মাঝে নিজেকে পাথরের মূর্তি মনে হয়। হটাৎ রওসন বলে উঠে , কিরে আয়নায় কি দেখতাছোস? রুপ যৌবন থাকতে থাকতে বিয়ে করে ফেল।

নইলে কিন্তু পরে কেউ জিগাইবোনা। কামরুল ভাই কিন্তু সত্যি সত্যিই তোরে অনেক পছন্দ করে। হে আমারে কাইল খুব কইরা ধরছে যেন তোরে আমি বুঝাই। কামরুল ভাই কিন্তু দেখতে হুনতে খুব ভাল। তাছাড়া অবিবহিত একটা পোলা হইয়া হে তোর মত বিবাহিত মাইয়ারে বিয়ে করতে চায়, তইলে বোঝ সে তোর জন্য কেমন পাগল হইছে? শিউলির চোখে অশ্রু টলমল করে।

তার চোখের সামনে রানার ছবি ভেসে উঠে। হাটু জলে পা ভিজিয়ে সে গামের্ন্টেসের উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। আজ তার হাতে টিফিন ক্যারিয়ার নেই। রান্না করার মত শক্তি তার শরীরে ছিলনা। গেটের সামনের দোকান থেকে ছয় টাকা দিয়ে একটা পাউরুটি কিনে সে সে ফ্লোরে ঢুকে।

বৃষ্টি আর আর কাদায় তার বোরকাটার অবস্থা খারাপ। শিউলি গামের্ন্টেসে চাকুরি নিয়ে ঢাকায় এসে দেখলো অন্য এক দুনিয়া কে। রাস্তার পাশে দাড়ানো পুরুষরা অকারনেই নানা অশ্রিল কথা বলে, ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ আবার শরিরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতে চেষ্টা করে। তাই রওসনের বুদ্ধিতে বোরকা পড়া শুরু করে ছিল। সুইং মেশিনে পা রাখতেই কামরুল পাশে এসে দাড়ায়।

নিচু স্বরে বলে কি হয়েছে চোখ মুখ ফোলা ফোলা লাগতাছে, শরীর খারাপ করছে নী। ডাঃ এর কাছে যাও। শিউলি তার দিকে লাল চোখে তাকায়। তারপর বলে কাইল আপনারে না কইলাম আমারে নিয়ে আপনী ভাবাবেন না! নিজের কাম করেন। কামরুলের মুখটা অন্ধকার হয়ে যায়।

সে শিউলির সামনে থেকে সরে যায়। ( আগামী পর্বে শেষ)  ।


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.