অতি দক্ষ মিথ্যুক না হলে সত্যবাদিতা উৎকৃষ্ট পন্থা নতুন কোনো ব্লগসাইট কিংবা অনলাইন ফোরাম জন্ম নিলে সেখানে একজন জামায়াত সমর্থক একাত্তরে জামায়াতের ভুমিকাকে ডিফেন্ড করতে সক্রিয় হয়ে উঠেন, সে ফোরামে নিজের পাইওনিয়ারিজম কিংবা নিজের আনুগত্য প্রকাশের এমন সুবর্ণ সুযোগ তারা কেউ হারাতে চান না। যারা এইভাবে জামায়াতের ভুমিকাকে ডিফেন্ড করতে চান তাদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ঠ্য আছে। সেসব বৈশিষ্ঠ্যের একটা পরিচিতি হতে পারে এ লেখা।
তারা এইসব আলোচনা শুরু করে একাত্তরের প্রকৃত ইতিহাস জানতে চাই জাতীয় প্রস্তাবনা দিয়ে কিংবা আরও কৌশলী হলে সেটায় নিজের অবস্থান নিরপেক্ষ রাখতে গিয়েই তারা প্রথমেই একাত্তরে জামায়াতের দালালীর অভিযোগটা স্বীকার করে নেন। আরপর তাদের সরল আলোচনা শুরু হয়, সেখানে মন্তব্যের কলামে তাদের বিভিন্ন সমর্থকের উপস্থিতি দেখা যায়, এইসব সমর্থক গোষ্ঠী তাদের বিজ্ঞ মতামত প্রকাশ করে মন্তব্যের কলামে, সেখানে তারা জানায় লেখাটা যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ এবং এভাবেই প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা সম্ভব হবে/ বিভিন্ন উৎসাহব্যাঞ্জক মন্তব্যের শেষে যারা জামায়াতের সমর্থকদের বিরোধিতা করে তাদের সবাইকে অশিষ্ঠ, গালিবাজ বলবেন, তাদের অযৌক্তিক আচরণের দায়ে অভিযুক্ত করবেন।
দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় এটুকু বলা যায় বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে যারা জামায়াতের একাত্তরের ভুমিকা নিয়ে আলোচনা করেন তারা সবাই একাত্তরে জামায়াতের দালালীর ইতিহাস সম্পর্কে অবগত এবং এ বিষয়ে তারা যথেষ্ট সচেতন। তারা সচেতন ভাবেই জামায়াতের এই ভুমিকা বিষয়ে অন্যান্যদের বিরোধিতাকে প্রতিরোধ করতে চান। তাদের আলোচনা শুরু হয় দালাল আইন দিয়ে, এবারও তাদের ধারণা ছিলো তাদের দালালীর অভিযোগের বিচার হবে দালাল আইনে, কিন্তু সরকার আন্তর্জাতিক আইনে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করায় তাদের একটু এগিয়ে গিয়ে শুরু করতে হচ্ছে। তারা সে কারণে এখন যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা পড়ছেন।
দালাল আইনে বিচার হওয়া যুক্তিযুক্ত এ প্রস্তাবনা একটা পর্যায়ে দিয়ে তাদের যুক্তির ধারাগুলো হবে দালাল আইন রদ করেছেন বঙ্গবন্ধু, গত দুই বছরে ছাত্র শিবির এবং ছাত্রী সংঘ ছাত্রলীগের চেয়ে বেশীবার বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করেছে এ কারণেই।
সুতরাং তাদের নেতাদের দালালীর অভিযোগ এখন ধোপে টিকবে না। এই যুক্তির পরবর্তি ধাপ হবে শুধুমাত্র জামায়াত নয় বরং অন্যান্য অনেকেই তো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দালালি করেছে, শুধুমাত্র জামায়াতকেই কেনো সকল দালালীর অপবাদ হজম করতে হবে, তারা এই অভিযোগে আক্রান্ত বোধ করেন, তাদের মনে হয় ঘরশুদ্ধ মানুষ তাদের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে, সে হাত থেকে একাত্তরের বাংলাদেশে নিহত সাধারণ নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝড়ছে।
তাদের পরবর্তী ট্রাম্পকার্ড হলো বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের কারা কারা জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সাথে করমর্দন করেছেন সেসব ছবি আপলোড করা। এইসব তারা ট্রফির মতো সাজিয়ে রাখে ব্যক্তিগত কম্পিউটার ফাইলে, তাদের কম্পিউটারের মাই পিকচার ফোল্ডারে এইসব ছবি সাজানো থাকে, তারা বিভিন্ন পিয়ার শেয়ারিং সাইটে গিয়ে এইসব বিনিময় করে কি না আমার জানা নেই, কিংবা তাদের কোনো সেন্ট্রাল কমান্ড থেকে এইসব ছবি সরবরাহ করা হয় কি না সেটাও আমার জানা নেই,শাহ হান্নানের ৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের অংশ হিসেবে হয়তো অনুগত শিক্ষিত জামায়াত কর্মীদের এইসব পেন ড্রাইভে সরবরাহ করা হয়েছে।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যারা নতুন কোনো ফোরামের অস্তিত্ব জানলেই সেখানে জামায়াতের একাত্তরের ভুমিকাকে ডিফেন্ড করতে উপস্থিত হন তারা যথেষ্ট আশাবাদী, তারা প্রতিবার প্যান্ডোরার বাস্কটা খুলে দিয়ে ধারণা করেন এবার হয়তো ফোরামের মানুষজন জামায়াতের প্রতি সহানুভুতি বোধ করবে, কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায় কেউ না কেউ ইতিহাসের পাতা খুলে জামায়াতের দালালীর বিষয়গুলোকে সবার সামনে তুলে ধরছে।
এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক, মসজিদে মাজারে গিয়ে দশ কোটি টাকার সিন্নি দিলেও ইতিহাসের বইয়ের পাতাগুলোতে আলাদা কোনো তথ্য হাজির হয়ে যাবে না রাতারাতি এই বিষয়টা সম্পর্কেও আমি যথেষ্ট নিশ্চিত কিন্তু এরপরও যারা বিভিন্ন ফোরামে জামায়াতের ভুমিকাকে যারা ডিফেন্ড করতে চায় তাদের জামায়াতী অধ্যাবস্যয়ের কারণটা উপলব্ধি করতে পারি নি আমি।
আলোচনার সর্বশেষ পর্যায়ে যখন এইসব যুক্তি হাজির হয় যে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথে রাজনৈতিক মিতরতা গড়ে তুলেছিলো সুতরাং জামায়াতের নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচার করা সমচীন নয় তখন বলতেই হয়
আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথে একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে করেছে এটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য,
একই সাথে এটাও সত্য যে জামায়াতের শীর্ষপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে সংযুক্ত ছিলো, তারা শুধুমাত্র নৈতিক ভাবে এটা সমর্থন করেনি বরং তারা সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহন করেছে একাত্তরের বর্বরতায় এবং প্রয়োজনে নিজেদের প্রচেষ্টায় এবং ব্যক্তিগত ও দলীয় উদ্যোগে স্বাধীনতা সংগ্রামের সপক্ষের মানুষদের হত্যার উদ্যোগ গ্রহন করেছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতালিপ্সায় যা করেছে সেটার সাথে এ বিষয়গুলোকে সম্পৃক্ত করতে চাওয়াটা কিংবা এটার সাথে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কারণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বিষয়টা ট্যাগ করতে চাইলে রাজনৈতিক ভাবে বিচার করে বলা যায় ,
আওয়ামী লীগ জামায়াতকে কাছে টানতে চাইছে কিন্তু জামায়াত খালেদা জিয়ার আঁচলের তলা থেকে বের হতে চাইছে না বলে তাদের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে
আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল, তাদের রাজনৈতিক অভিলিপ্সা রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন করা কিংবা সরকার গঠন করা। জামায়াত যেমন ধর্ম বেচে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়, আওয়ামী লীগও বিএনপি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিপক্ষের লোকজনের সাথে রাজনৈতিক মিত্রতা গড়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়। এ কাজের জন্য তারা অনেক ধরণের নষ্টামি করবে, সেটা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতালোভী চরিত্র।
তারা বিভিন্ন বক্তৃতায় যতটা না নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে স্বীক্রিতি দিতে চায় জামায়াত তার চেয়ে বেশী জোর গলায় তাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়। জামায়াত মরিয়া হয়েই তাদের হাতে একাত্তর তুলে দিতে চায়, তাদের দাবী
আওয়ামী লীগকে মুক্তিযুদ্ধের দল
আওয়ামী লীগকে মুক্তিযোদ্ধাদের দল বলে গুরুত্বপূর্ণ করে তুললে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুত্বটা হ্রাস পায় কিছুটা। তারা তখন দাবী করতে পারে তাদের রাজনৈতিক ভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ, সুতরাং তারা স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল নয়।
গণতান্ত্রিক ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার সনদ পাওয়া আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের প্রশাসন পরিচালনার স্বীকৃতি দিতে না চাওয়ার বিভিন্ন ছলচাতুরিতে গড়ে ওঠা অসহযোগ আন্দোলনের একটা পর্যায়ে জনগণ সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করে, তাদের শ্লোগান এবং মনঃস্তাত্ত্বিক বদলের ধরণটা উপলব্ধি করতে পারে নি জামায়াত, এটা একটা ঐতিহাসিক সত্য, তারা একাত্তরের অধিকাংশ সময়ই জনগণের প্রত্যাশার বিরুদ্ধে গিয়ে এদেশের সাধারণ জনগণের স্বাধীনতা লড়াইয়ের বিরোধিতা করেছে, তারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করেছে কিংবা পাকিস্তানীদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছে এমন নয় বরং তারা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রতিহত করতে চেয়েছে।
জনগণের স্বাধীনতার আকাংক্ষার বিরুদ্ধাচারণের ক্ষমতা ছিলো না আওয়ামী লীগের, তারা বাধ্য হয়েই জনগণের পাশে থেকে জনগণকে দিক নির্দেশনা দিয়ে জনগণের মুক্তির সংগ্রাম পরিচালনায় সহযোগিতা করেছে, কিন্তু মূল অংশগ্রহনকারী শক্তি ছিলো জনগণ, তাদের উপরে যেমন নির্মম অত্যাচার হয়েছে, শুধুমাত্র বাংলা ভাষী হওয়ার কারণে তাদের যেমন মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে, যেমন ভাবে কল্পিত খায়েশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গ্রামের পর গ্রাম জ্বালানো হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কিংবা তাদের তাবেদারদের প্রতি কোনো মমত্ববোধ অবশিষ্ট ছিলো না।
আওয়ামী লীগ পরবর্তীতে ক্ষমতার লোভে জনগণের দাবীর সাথে, জনগণের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ, কিন্তু সেটা আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত, সম্মিলিত ভুল, সেটার সাথে দেশের সাধারণ জনগণের আকাঙ্খা আর প্রত্যাশাকে মিলিয়ে ফেলবার কোনো কারণ নেই, জনগণ সব সময়ই এই অবিচারের বিচার দাবী করেছে, তারা বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও জনগণ বিচারের দাবি থেকে পিছু সরে আসে নি। আওয়ামী লীগ এইসব জনগণের দাবির প্রতি লক্ষ্য রেখেই নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গিকার অন্তর্ভুক্ত করছে, সেতা জনগণের দাবীর জয়, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রকাশ নয় সেটা। এটা বুঝতে হলে জনগণের সাথে একাত্মতা থাকতে হবে, জনগণের প্রাণস্পন্দন বুঝতে হবে, এটা বুঝতে আইন্সটাইন হতে হয় না , চোখ কান খোলা রাখলেই সেটা স্পষ্ট বুঝা যায়।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।