আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অবহেলিত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা



স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীনের অসামান্য অবদান রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা। কিন্তু স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও স্বধীন স্বদেশ ভূমিতে একখন্ড জমি নেই তার। দেশে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এ বাড়ি ওবাড়ি করে ঘুরছেন। ভাঙা একটি মাচাং ঘরে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা জেলার আলীকদমে পাহাড়ী জনপদ বাবু পাড়ায় বসবাস করেন।

এক সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ থাকলেও এখন তা বেহাত হয়ে গেছে। জীবনের সকল মায়ামোহ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ করে দেশ স্বাধীনের অসামান্য অবদানের জন্য সরকার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিলেও হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তাঁর দিন চলে একটি ভাঙা মাচাং ঘরে অতিকষ্টে, অনাহারে অর্ধাহারে, রোগে-শোকে। দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশ বছর হল। দেশ স্বাধীনের চল্লিশ বছর পার হলেও বৃদ্ধাস্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলছে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরার।

মুক্তি যুদ্ধে বিজয়ী হয়েও তিনি হেরে গেলেন সংসার জীবনে। সে সময়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবিকার তাগিদে এখন দিনমজুর। সম্মান কিংবা গার্ড অব অনার পাননি তিনি কোন স্বাধীনতা, বিজয় দিবস কিংবা জাতীয় দিবসে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে কিন্তু তাঁর জীবন যুদ্ধ থেমে নেই। জীবন যুদ্ধ করতে গিয়ে দিন মজুর কিংবা বন জঙ্গল থেকে জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করে দিন চলে তাঁর।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা (৭০) সকালের খবরকে জানান, মেজর হেমন বাবুর অধীনে মুক্তিযুাদ্ধকালীন ৭৫জনের মুক্তি বাহিনীর একটি দলের সঙ্গে ভারতে ফারশুয়া ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের কাছ থেকে থ্রি নট থ্রি রাইফেল পান তারা। একটানা ২৭ দিন প্রশিক্ষণ শেষে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আসেন । ৮বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর টিএম আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। দিনক্ষণ স্মরণ করতে না পারলেও বয়সের ভারে নুয়ে পরা মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা বলেন, রোয়াংছড়ি উপজেলার কানাইজো পাড়ায় পাক বাহিনী ও তাদের মিত্রশক্তি ভারতের মিজুরামের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের বিরুদ্ধে সুবেদার মেজর টিএম আলীর নেতৃত্বে একটি সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল।

১০থেকে ১২ ঘন্টা স্থায়ী যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৩০ জন শহীদ হন এবং শত্রু পক্ষের একজন মারা যান। এ সম্মুখ যুদ্ধে তিনি সহ আটজন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা অংশ গ্রহণ করেন। সবার নাম স্মৃতিতে ধরে রাখতে না পারলেও সুচিমং মার্মা ও লাইংগ্যা বম নামে দু’জনের নাম স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে তাঁরা চট্টগ্রাম জেট ফোর্সের সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের হাতে অস্ত্র জমা দেয়া হয় বলে জানান। কান্ত ত্রিপুরা জানান, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি স্বরূপ পাওয়া মূল সনদের কপিটি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে একটি আর্থিক সাহায্য আবেদনের সাথে জমা দেন ৫থেকে ৬ বছর আগে।

অসচেতনাবশত: তিনি ছায়াকপি রাখেননি। ভিলেজার হিসেবে মাতামূহুরী রেঞ্জের বাবু পাড়ায় একখন্ড জমিতে তৈরী করা দু’চালা একটি ভাঙা মাচাং ঘরে ষার্টোদ্ধ স্ত্রী রুপতি ত্রিপুরাকে নিয়ে অসহায় এ মুক্তিযোদ্ধার দিন কাটছে। বর্তমানে তিনি মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দেশ স্বাধীন হলেও নিজের নামে একখন্ড জমি নেই দেশের কোথাও। মাতামূহুরী বনরেঞ্জ কর্মকর্তা হারুনর রশিদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা মাতামূহুরী রেঞ্জে ভিলেজার হিসেবে থাকেন।

বর্তমানে তিনি বয়সের ভারে চোখের দৃষ্টি শক্তিও হারাতে বসেছেন। নেই কাজের সামর্থ্য। মুক্তিযোদ্ধা হলেও জীবিকার তাগিদে এখন তিনি দিনমজুর। ১৫থেকে ১৬ বছর আগে মাসিক ৫শ‘ টাকা করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানী ভাতা পেতেন। সনদ হারানোর কারণে এখন সে ভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের কাছে অনেক আবেদন নিবেদন করেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠাতে পারেননি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি এইটুকু সান্তনা। শেষ বয়সে যখন শান্তি আসেনি আর শান্তির আশা করিনা। মরণেই শান্তি খুঁজে পাবো। ’ আলীকদম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল মান্নান বলেন, কান্ত ত্রিপুরা নামে তিনি কোন মুক্তিযোদ্ধাকে চিনেন না।

আলীকদমে চারজন গেজেটভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তবে তাঁরা কেউ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বান্দরবান জেলার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না। কয়েক বছর আগে তাঁরা আলীকদমে আসেন। বর্তমানে তাঁরা সরকারী ভাবে যথারীতি সম্মানী ভাতাদিও পাচ্ছেন। জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মো. সেলিম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, কান্ত ত্রিপুরা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।

কান্ত ত্রিপুরা সুবেদার মেজর টিএম আলীর সহযোদ্ধা হিসেবে রোয়াংছড়ির কানাইজো পাড়ায় সংগঠিত হানাদার বিরোধি সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন। টিএম আলীর নামে ওই এলাকায় একটি স্মৃতিসৌধ আছে। এদিকে উপজেলা প্রশাসনেও মুক্তিযোদ্ধা কান্ত ত্রিপুরা নাম নেই। গেজেটভূক্ত ৪জন মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় কান্ত ত্রিপুরার নাম নেই বলে উপজেলা নির্বাহী কার্যালয়ের সুত্রে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন কান্ত ত্রিপুরা।

এক সময় মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছিল। সে সনদটিও এখন বেহাত হয়ে গেছে তার। দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি সরকার ক্ষমতায় আসীন। শেষ বয়সে হলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চান বর্তমান সরকারের কাছে।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।