আমার জঙ্গলের বাসায় মাঝে মাঝেই চড়ুই-কবুতর বাসা করে। তবে সেগুলো করে আমি যে রুমগুলো ব্যবহার করি না, সেখানে। একবার দেখলাম একটা চড়ুই আমার থাকার রুমে ঢুকে পড়েছে। পাখিটার সাহস ভালোই। বারান্দার দরজার উপর বসে কিচির-মিচির করে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল।
পরে আবার অন্য রুমে চলে গেল। দেখলাম ঐ রুমের ঘুলঘুলির ভাঙা অংশে খড়কুটো নিয়ে ঢুকছে। মাঝে মাঝে শুধু মাথাটা বের করে তাকিয়ে থাকে।
ঐ রুমের জানালা দিয়েই বেশির ভাগ সময় যাওয়া-আসা করত। শুধু সকাল বেলাই কেন যেন আমার রুমের বারান্দা দিয়ে ঢুকত আর কিচির-মিচির করে আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়ে যেত।
আমি নড়ে-চড়ে উঠলেই ফুড়ুৎ করে পালিয়ে যেত। মাঝে মাঝে জামাই-বউ দুটো জানালায় বসে সংসারের নানান আলাপ-আলোচনা করতে বসত।
কিছুদিন ছুটিতে গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরে এসে দেখি আমার গোসলখানার জানালায় কিছু খড়কুটো পড়ে আছে। ভাবলাম বাতাসে হয়ত উড়ে এসেছে।
কিন্তু সপ্তাহ খানেক পরে দেখি খড়কুটোগুলো একটা পাখির বাসায় রূপ নিচ্ছে। খুব অবাক লাগল, এত কাছাকাছি আমার হাতের নাগালে বাসা করার সাহস পেল কিভাবে।
আমি গোসলখানায় ঢুকলেই চড়ুইগুলো ফুড়ুৎ করে পালিয়ে যেত। কিন্তু একদিন অবাক হয়ে দেখলাম চড়ুইটা উড়ে যাচ্ছে না। বাসার পাশে চুপটি মেরে বসে আছে আর আমাকে পিট পিট করে তাকিয়ে দেখছে।
নিশ্চয়ই কোন ঘটনা আছে।
আমি আরেকটু কাছে যেতে পাখিটা উড়ে গেল। এবার ভালো করে বাসার ভেতরটা দেখলাম। হুমম, যা ভেবেছি তাই। পাখিটা ডিম পেড়েছে, এইজন্য চট করে ডিম রেখে পালিয়ে যাচ্ছিল না।
চারটা ডিম দিয়েছে, তিনটা সাদা, একটা কালো। কিছু ছোট ছোট পলিথিনের টুকরা রেখে দিলাম বাসার পাশে। পরের দিন দেখি উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। বৃষ্টির হাত থাকে বাঁচাতে ডিমগুলোর চারপাশে পলিথিনের টুকরোগুলো জড়িয়ে রেখেছে চড়ুইটা।
চড়ুইটাকে খাবার দেয়া শুরু করলাম।
ভাত কিংবা চাল বাসার পাশে দিয়ে রাখতাম। চড়ুইটা সারাদিন ভরে কুটুর কুটুর করে খেত। আর আমি মাঝে মাঝে উঁকি মেরে দেখতাম ডিমগুলো ফুটেছে কি না। এক সময় হতাশ হয়ে দেখা ছেড়ে দিলাম। হঠাৎ একদিন মনে হল কিচির-মিচির কিছু বেশি শোনা যাচ্ছে।
উঁকি মেরে দেখি লাল টুকটুকে চারটা বাচ্চা যাদের এখনও চোখ ফোটেনি।
ছবি তুলতে গিয়ে বেশি কাছে চলে গিয়েছিলাম, বাসাটা একটু নড়ে গিয়েছিল। বাচ্চাগুলো মনে করল বুঝি তাদের মা এসেছে খাবার নিয়ে। মাথা উঠিয়ে বিশাল হা করে চিঁ চিঁ শুরু করল। বেচারাদের খাওয়া ছাড়া বুঝি দুনিয়ায় আর কোন কাজ নেই।
এরপর কয়েকদিন ছুটিতে ছিলাম। ফিরে এসে শুনি কিচির-মিচির শব্দগুলো আরও জোরালো হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখি বাচ্চাগুলোর চোখ ফুটেছে, পালক গজিয়েছে। শুধু উড়তে শেখাটাই বাকী। আমাকে দেখে ভয়ে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে।
একটু আদর করে দেয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। তবে খুব আলতো করে ছুঁয়ে দিলাম। বেশি আদর করতে গেলে যদি ভয়েই মরে-টরে যায়।
এরপর আবারও একটা কাজে ঢাকা যেতে হল। প্রতিবার যাবার আগে কিছু বেশি করে খাবার দিয়ে যেতাম বাসার পাশে।
এবার গিয়েই মনে হল ফিরে এসে মনে হয় বাচ্চাগুলোকে আর দেখতে পাবো না। ঠিক তা-ই হল। ফিরে এসে দেখি বাচ্চারা উড়তে শিখে কোথায় চলে গেছে। বাসাটা শূন্য হয়ে পড়ে আছে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।