সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আজ জাতীয় বাজেটের ২৫% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করা, কলেজসমূহে স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল নির্মাণ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ বরাদ্দ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বর্ধিত বরাদ্দ, উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি সংকট নিরসনকল্পে নতুন সরকারি কলেজ নির্মাণ ও পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করে ডাবল শিফ্ট চালু করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান, পিপিপি’র নামে শিক্ষার বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধসহ নিম্নোক্ত দাবিতে অর্থমন্ত্রী বরাররব স্মারকলিপি পেশ করা হয়।
স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচির পূর্বে সকাল ১১·৩০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সভাপতি ফখরুদ্দিন কবির আতিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী তমাল, দপ্তর সম্পাদক ইমরান হাবিব রুমন, সাইফুজ্জামান সাকন, মলয় সরকার, স্নেহার্দী চক্রবর্ত্তী রিন্টু। সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জনার্দন দত্ত নান্টু।
সভায় বক্তারা বলেন, ‘কৃষি নির্ভর এদেশে শিক্ষা, কৃষি ও শিল্পখাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দিলেও প্রতি বছরই সামরিক খাতসহ অনুৎপাদশীল খাতগুলোতে বরাদ্দ বেড়েই চলছে।
এবারও যুদ্ধ বিমান ও যুদ্ধ জাহাজ ক্রয়ের জন্য এবারের বাজেটে বরাদ্দের কথা শোনা যাচ্ছে। অথচ উচ্চশিক্ষায় আর মাত্র ১১০ কোটি টাকা বেশী বরাদ্দ দিলে শিক্ষার্থীদের কোনো বেতন ফি দিতে হয় না। পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গবেষণা আজ প্রায় বন্ধ। ভর্তি সংকট নিরসনে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগে নতুন নতুন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ।
দীর্ঘ ১১ বছর থেকে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল নির্মান ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাবছর ক্লাস চালু রাখার দাবি করলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
আবার পিপিপি’র নামে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার ব্যবসায়ীদের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন সংকট নিরসনে এবার বাজেটে শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এবার বাজেটে নিম্নোক্ত ৫ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
এরপর একটি মিছিল বিশ্ববিদ্যালেয় ক্যাম্পাসে প্রদক্ষিণ শেষে অর্থমন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষা ভবনের সামনে পুলিশ বাধা দেয়। সেখানে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে পুলিশী বাধার নিন্দা জানানো হয়।
সমাবেশ শেষে জনার্দন দত্ত নান্টুর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি পেশ করেন।
***************************************************************
অর্থমন্ত্রী বরাররব স্মারকলিপি
প্রতি
মাননীয় মন্ত্রী,
অর্থ মন্ত্রণালয়,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
বিষয়ঃ ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুসারে জাতীয় বাজেটের ২৫% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করা, কলেজসমূহে স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল নির্মাণ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ বরাদ্দ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বর্ধিত বরাদ্দ, উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি সংকট নিরসনকল্পে নতুন সরকারি কলেজ নির্মাণ ও পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করে ডাবল শিফ্ট চালু করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান প্রসঙ্গে।
জনাব,
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা নেবেন। আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে আপনি ২০১০-’১১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন।
বাজেট পেশের পূর্বে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের চিত্র এবং এর সমাধানকল্পে আমাদের সংগঠনের কিছু দাবি আপনার মাধ্যমে সরকারের কাছে তুলে ধরতে চাই।
প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সকল স্তর সংকটে জর্জরিত। সরকারি হিসাবে দেশে এখনো ১৪,১৯৯টি গ্রামে কোনো ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সরকারি নীতিমালা অনুসারে কমপক্ষে ২,০০০ জনসংখ্যা অধুষিত গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকার কথা। অথচ এমন প্রায় ২ হাজার গ্রাম আছে যেখানে কোনো প্রকার স্কুলই নেই।
সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা ১৯৯৮ সালে ছিল ৩৭,৭০৯টি, ২০০৫ সালে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ৩৭,৬৭২টি। বর্তমানে প্রতিবছর প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয় ৩৪ লাখ শিশু। তাদের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পৌঁছে ২২ লাখ। অর্থাৎ চার বছরে ঝরে পড়ে (Drop-Out) ১২ লাখ শিশু। এ বছর ১০টি বোর্ড মিলে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ৯ লক্ষ ৬০ হাজার ৪৯২ জন।
গত বছর ৭টি বোর্ড মিলে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ৩,৭১,৩৮২ জন। অর্থাৎ প্রথম শ্রেণী থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়া পর্যন্ত প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। দারিদ্র্যের কষাঘাত আর শিক্ষার নিম্নমানই Drop-Out এর কারণ। Drop-Out কমাতে স্কুল ছাত্রদের একবেলা খাবার, ইউনিফর্ম, বিনামূল্যে খাতা-কলমসহ শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। এদিকে প্রাথমিক স্তরে বর্তমান ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত (১ঃ৪৯) , যা মানসম্পন্ন শিক্ষার মোটেই সহায়ক নয়।
এজন্য পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
অনেক উপজেলাতেই মাধ্যমিক স্তরে কোনো সরকারি স্কুল ও কলেজ নেই। মাধ্যমিক স্তরে ১৬ সহস্রাধিক স্কুলের মধ্যে সরকারি স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৩১৭টি। এ বছর এসএসসি-তে ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করেছে ৭,১৩,৫৬০ জন। সরকারি-বেসরকারি মিলে ৩,১৫০টি কলেজে আসনসংখ্যা আছে ৫ লাখ।
২৫১টি সরকারি কলেজে আসনসংখ্যা আছে ৯২,৩৯৬টি। ১০টি বোর্ডে GPA ৪ - ৫ পর্যন্ত পেয়েছে ৩,৭০,৬৭১ জন। অর্থাৎ GPA ৪ পেয়েও প্রায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী সরকারি কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। এই ভর্তি সংকট নিরসনে সরকারি উদ্যোগে নতুন কলেজ নির্মাণ করা প্রয়োজন। সংকটের আশু সমাধান হিসেবে ভাল কলেজগুলোতে ডাবল শিফ্ট চালু ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আনুপাতিক হারে শিক্ষক সংখ্যা ও বিভিন্ন অবকাঠামো বৃদ্ধি প্রয়োজন।
ভর্তি সংকটের আপাত সমাধান করতে চাইলেও বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা আবশ্যক।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভুগছে তীব্র বাজেট ঘাটতিতে। মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ বাজেট বিবরণী অনুয়ায়ী ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অনুদান ৬৮২ কোটি টাকা। এর ৮৮% ব্যয় হয় বেতনভাতা,পেনশন ও সাধারণ আনুসঙ্গিক খাতে। আর ১১% মাত্র শিক্ষা আনুসঙ্গিক খাতে ব্যয় হয়।
চলতি অর্থবছরে শিক্ষা বাজেটের মাত্র ৬·৯৮% ও জাতীয় বাজেটের মাত্র ০·৯২% বিশ্ববিদ্যালয় খাতে বরাদ্দ ছিল।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলেও এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটে বরাদ্দ মাত্র ০·০৭৬৯%। অর্থাৎ ১০০০ ভাগের ১ ভাগেরও কম। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণা বাঁচাতে, আবাসন সংকট নিরসন এবং ডাইনিং-ক্যান্টিন ও লাইব্রেরি-ল্যাবরেটরির মান বাড়াতে সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের উচ্চশিক্ষার আয়োজন একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
সেটা এমনই যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেই এখন একরকম বিলুপ্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কলেজসমূহের সংকট নিরসনে ছাত্রসমাজের দীর্ঘদিনের দাবি স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল, পর্যাপ্ত ক্লাসরুম নির্মাণ ও শিক্ষক নিয়োগের সরকারি ঘোষণা ইতোপূর্বে দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশেষ বরাদ্দের প্রয়োজন।
অন্যদিকে, শিক্ষকদের যে বেতন দেওয়া হয় তা দিয়ে বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় কোনো পরিবার সম্মানজনকভাবে চলতে পারে না। মানবেতর জীবনযাপন করে তাঁরা মানসম্পন্ন শিক্ষা দেবেন কিভাবে? ফলে শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জিডিপির ৮ ভাগ বা জাতীয় বাজেটের ২৫ ভাগ বরাদ্দ করার করার দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষানুরাগী মহলসহ আমাদের সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু বার বারই এ দাবি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং শ্রীলংকায়ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩·৮ শতাংশ, অথচ আমাদের দেশে তা মাত্র ২·০৩ শতাংশ। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া সমগ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করা সম্ভব নয়।
আর এ কথা কে অস্বীকার করবে যে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করা ছাড়া একটি দেশের জাতীয় অগ্রগতি সাধন সম্ভব নয়।
উপরন্তু বর্তমান সরকার ঘোষণা দিয়েছে স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের। সরকার যদি এই প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সত্যি সত্যি আন্তরিক হয় তাহলে শিক্ষাখাতের সম্পূর্ণ দায়িত্বই রাষ্ট্রকে নিতে হবে, পর্যাপ্ত সংখ্যক স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে হবে।
তাই, বাজেটকে সামনে রেখে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নিম্নোক্ত দাবি পূরণের জন্য আপনার মাধ্যমে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
১· ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুসারে জাতীয় বাজেটের ২৫% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করতে হবে।
২· উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি সংকট নিরসনকল্পে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করে ডাবল শিফ্ট চালু এবং নতুন সরকারি কলেজ নির্মাণ করতে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।
৩· জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহে স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল নির্মাণ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।
৪· পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে এবং আবাসন ও পরিবহন সংকট নিরসনে বর্ধিত বরাদ্দ দিতে হবে।
৫· জেলা জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ এবং ঐতিহ্যবাহী কলেজসমূহকে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।