আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

খেলনা

...ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাচিয়া,সদাই ভাবনা, যা কিছু পায়, হারায়ে যায়, না মানে স্বান্তনা...
খেলনাটার দাম পাঁচশত পঞ্চাশ টাকা। একটা ছোট টেডি বিয়ার। পশমী শরীর। সাদা আর বাদমী মেশানো রং। ওটার মালিক ছিলো পাড়ার সবচেয়ে বড়লোকের মেয়ে সিনথিয়া।

সিনথিয়া ওটাকে ‘বিলি’ বলে ডাকতো। সিনথিয়ার অনেক অনেক খেলনার মধ্যে বিলিও ছিলো একটা। সিনথিয়ার যে কত কত খেলনা, তার ইয়াত্তা নেই। খুব সুন্দর একটা আলমারির তাকে ছিলো বিলির বাসা। বিলির প্রতিবেশী ছিলো একটা বার্বি ডল।

সিনথিয়া সেটার নাম দিয়েছিলো ‘ডলি’। রাতে যখন সিনথিয়াদের পুরো বাড়িটা ঘুমিয়ে পড়তো, তখন খেলনারা জেগে উঠতো। বিলি তার প্রতিবেশী ডলির সাথে গল্প করতো। একটু আধটু ভালোও লেগে গিয়েছিলো তার ডলিকে। বিলি স্বপ্ন দেখতো, ডলিকে নিয়ে সে একদিন ঘর বাঁধবে সিনথিয়ার টয় হাউসটাতে।

খুব দারুন কাটছিলো সেখানে বিলির দিন কাল। সিনথিয়া তাকে নিয়ে খেলতো, তাকে গোসল করিয়ে দিতো, তার পশমগুলো আঁচড়ে দিতো। কত যে যত্ন করতো, তার ইয়াত্তা নেই। বিলি প্রায়ই ভাবতো, সে সিনথিয়ার জন্য জীবন পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারবে। একদিন খেলতে খেলতে সিনথিয়া বিলির ডান হাতটা একটু ছিড়ে ফেললো।

তখন কি যে বিচ্ছিরি দেখাতে লাগলো তাকে। সিনথিয়া তাকে আর ঠিক করলো না। বাড়ির এক কোনে ফেলে রাখলো। ময়লার মাঝে পড়ে থেকে বিলির মন খুব খারাপ লাগতো। ডলির সাথে দেখা হতো না।

রাতের আধারে যখন খেলনারা জেগে উঠতো, তখন ঘরের এক কোনে ঘাপটি মেরে পরে থাকতো বিলি। কাউকে মুখ দেখাতো না লজ্জায়। চুপিসারে কাঁদতো। কেউ শুনতো না। এভাবেই দিন কাটে বিলির।

ধুলো পড়ে তার সাদা আর বাদামী পশমে। ময়লা হয়ে যায় বিলির চেহারা। একদিন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে বিলিকে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় সিনথিয়া। বিলি গিয়ে পড়ে পাশের রাস্তার কিনারায়। রাত হয়।

একা পথের মাঝে বিলির ভয় হয়। রাতের কুকুর গুলো যখন মেইন রোড দিয়ে দৌড়ে যেতো, বিলির তখন ভয়ে হাত পা কাঁপতো। তেলাপোকা, ইঁদুরকে খুব ভয় ছিলো বিলির। কিন্তু ডাষ্টবিনের ডাউস সাইজের ইঁদুর গুলো তার গায়ের উপর দিয়ে হেটে যেতো। একটা দু’টো পশম তুলে নিয়ে যেতো যাবার সময়।

তেলাপোকা গুলো তার সারা গায়ে চড়ে বেড়াতো। বিলি কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলতো আর ভাবতো, নিশ্চয়ই সিনথিয়া একদিন তাকে আবার তুলে নেবে। একটু আদর আর একটু যত্নের জন্য বিলির ছোট্ট হৃদয়টা খুব কাঁদতো। একদিন সিনথিয়ারদের পাশের বাসার গরীব মেয়ে সোহাগী তাকে পথের পাশে দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে গেলো তার বাসায়। সোহাগীদের বাসাটা খুব গরিব।

সিনথিয়ার মতো এতো খেলনা তার নেই। একটা দু’টো খেলনা হাড়িকুড়ি আর একটু খেলনা ঘড়ি। খেলা শেষে সোহাগী বিলিকে তাদের সাথে একটা ট্রাঙ্কে রাখতো। সোহাগী তার নাম দিলো মুটু। কেন দিলো সেই জানে।

তবে বিলির মুটু নামটা খুবই পছন্দ হলো। সোহাগী তার ছেড়া হাতটা সেলাই করে দিলো, তার ময়লা জমে যাওয়া পশম পরিষ্কার করে দিলো। মুটু/বিলিকে ঠিক তার আগের চেহাড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। সোহাগী তাকে অনেক আদর করতো। তবুও মাঝে মাঝে মুটুর তার আগের জীবনের কথা মনে পড়তো।

সিনথিয়া, তার সেই আলমারীর বাসা, প্রতিবেশী বার্বি ডল ডলি, সব মনে পড়তো। যদিও সোহাগীর কাছে সে খুব ভালো ছিলো, তবুও মুটুর মনে হতো, একদিন নিশ্চয়ই সিনথিয়া তাকে নিয়ে যাবে। আবার আদর করবে, গোসল করিয়ে দিবে। একদিন সোহাগী যখন তাদের উঠোনে মুটুকে নিয়ে খেলছিলো, তখন দূর থেকে সিনথিয়া তাকে দেখে ফেললো। সিনথিয়া এসে সোহাগীর হাত থেকে মুটু কে কেড়ে নিলো।

চিৎকার করে বললো, ‘এটা আমার খেলনা। এটা তোর খেলনা না। চোর কোথাকার, আমার খেলনা চুরি করেছিস’। সোহাগী গরীবের মেয়ে। তাই মুটুকে সে আর আকড়ে রাখলো না।

ভয়ে ভয়ে দিয়ে দিলো সিনথিয়াকে। সোহাগীর খুব খারাপ লাগছিলো, তার এতোদিনের খেলার সাথীকে হারাতে। তবে মুটুর কিন্তু খুব ভালো লাগছিলো, কারন সে আবার তার প্রিয় সিনথিয়ার কাছে ফিরে যাচ্ছে। সোহাগীর জন্যও একটু খারাপ লাগছিলো। তার খুব খারাপ সময়টাতে এই সোহাগীই তাকে আশ্রয় দিয়েছিলো।

বাঁচিয়েছিলো নিত্যদিনের খোলা পথের ধারের ভয়গুলো থেকে। কিন্তু তার আসল মালিক তো সিনথিয়া। তাই মুটুর খুব ভালো লাগছিলো আবার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারার আনন্দে। সিনথিয়া নিশ্চয়ই তার ভুল বুঝতে পেরেছে। সিনথিয়া মুটুকে ঘরে এনে তার আলমারির তাকটাতে রেখে দিলো।

পুরনো যায়গায় ফিরতে পেরে মুটুর খুব ভালো লাগে। ঠিক তেমনই আছে সবকিছু। প্রতিবেশী ডলির দিকে তাকিয়ে সে যথারীতি একটা লাজুক হাসিও দিয়ে ফেললো। দু’দিন পরই আলমারীটার একটা কোনায় লেগে আবরো মুটুর হাতের কিছুটা অংশ ছিড়ে গেলো। সিনথিয়া আবার তাকে রুমের জানালাটা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো রাস্তায়।

পথের এক কোনে বসে ছোট্ট মুটুর হৃদয়টা ভেঙ্গে যায়। প্রচন্ড অভিমান হয় মানুষগুলোর প্রতি, পৃথিবীটার প্রতি। মনে মনে ভাবে সে আর কক্ষনো সিনথিয়ার কাছে ফিরতে চাইবে না। দূর থেকে সোহাগী আবারো মুটুকে পথের পাশে পরে থাকতে দেখে। কিন্তু তার সাহস হয়না পুতুলটাকে আবারো ঘরে নিয়ে যেতে।

যদি আবারো বড়লোকের মেয়েটা তাকে এসে দোষ দেয় তার খেলনা চুরি করার। আগেরবার তার প্রিয় মুটুকে মেয়েটা নিয়ে যাবার পর তার যে খুব খুব কষ্ট হয়েছিলো। আবারো মুটুর জায়গা হয় পথের পাশে। মুটুর খুব ইচ্ছা হয় কেউ এসে তাকে তুলে নিয়ে যাক। কিন্তু কেউ তার মালিক হয় না।

একদিন একটা দ্রুতগামী গাড়ি এসে মুটুকে মিশেয়ে দিয়ে যায় পথের সাথে। কিন্তু কেউ তা জানতে পারে না।
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।