জীবনের গল্প বলে যাই গল্পের মতো করে...
টেলিভিশনটা বড় ভাইয়ার হয়ে যাবার পর আমাদের স্ত্রীরা হয়তো ভাবে সব ঝামেলাই চুকে গেল; কিন্তু আমরা জানি সবচে’ বড় ঝামেলাটা থেকে গেছে এখনো। এ নিয়ে কোনো কথা উঠেনি এখন পর্যন্ত। একজন চাইছে অন্যজন তুলুক। আমার বোধহয় সাহস একটু বেশী তাই আমিই কথাটা তুলি, ছবিটা কিন্তু আমি নেবো। আমার কথা শুনে এক সাথে রাজু আর ভাইয়া দু’জনেই চমকে ওঠে।
ছবির তো কোনো মূল্য নেই, কী হতে পারে এর দাম? বাবা-মায়ের এই একটা মাত্র ছবি। কোনো এক হেভী রোমান্টিক দিনে বাবা-মা স্টুডিওতে গিয়ে এই সাদা-কালো ছবিটা তুলেছিলেন। তখন আমাদের কারোরই জন্ম হয়নি। ছবির বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। আমার মা ততটা সুন্দরী মহিলা ছিলেন না; কিন্তু এই ছবির দিকে তাকালে তাকে রাজরাণীর মতো মনে হয়।
হয়তো তার চেহারাটা ফটোজেনিক ছিল। বাবাকেও এই ছবিতে দারুণ হ্যান্ডসাম দেখায়। ছবিতে মা বসে আছেন একটা টুলের ওপর পাশে মায়ের কাঁধে এক হাত রেখে মুচকি হাসি নিয়ে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। মায়ের চেহারায় লাজুক একটা ভাব, ঠোঁটের কোণে এক টুকরো লাজুক হাসি। বাবা নিজে এ ছবিটা ফ্রেম করেছিলেন।
ফ্রেমটা ভালো হয়নি, ছবি উঁচু-নিচু থেকে গেছে। আমরা কেউ আর সেটা সমান কর নিইনি। এই অসমান ফ্রেমটাই বাবার স্মৃতি। বাবা মারা যাবার পর মা এই ছবির দিকে তাকিয়ে কেঁদেছেন। মা যখন মারা গেলেন আমরা তিন ভাই নানা সময় এটার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজিয়েছি।
এই ছবিটা আমার চাইই। ওটা হাতছাড়া করে আমি কোথাও যাবো না। অন্তত ছবিটার ব্যাপারে আমি আপোসহীন।
আমার মতো ভাইয়া আর রাজু তারা দু’জনও আপোসহীন হয়ে ওঠে। ভাইয়া তো বলেন, ঠিক আছে টেলিভিশনটা তোরা রাখ; ছবিটা আমি নিয়ে যাই।
রাজু বলে, মা-বাবার ছবি রেখে আমি কোথাও যাবো না। সুরমা আমাকে হাতইশারা করে ডেকে নিয়ে ফিস্ফিস্ করে বলে, ছবি দিয়ে কী হবে? তুমি বরং টেলিভিশনটাই নাও। আমি এ কথায় সুরমার দিকে লাল চোখে তাকাই। সে আর কিছু বলে না।
বাবা-মায়ের ছবিটা অনেক পুরাতন হয়ে গেছে; তবু এই পুরাতন ছবিটাই আমার বাবা-মা।
একবার ভাবী সারা বাড়ি ধোয়া-মোছা করলেন শুধু ছবিটা মোছা হলো না। ভাইয়া সেটা দেখে রেকে ওঠে ভাবীকে বললেন, তুমি একটা বিরাট স্বার্থপর মেয়েছেলে। কোন্ সাহসে তুমি বাবা-মায়ের ছবিটা ময়লা রেখে দিলে? সেদিন আমি জেনেছিলাম, এই ছবিটা নিয়ে আমরা কোনোভাবেই কারো সাথেই কখনো কোনো আপোসে যাবো না। ওটা আমাদের নিজস্ব সম্পদ।
ছবিটা আমরা কেউই হাতছাড়া করতে চাই না।
একটা ঝগড়ার উপক্রম হয় আমাদের ভেতর। আমি বুঝি, ঝগড়া নয় যুদ্ধ হবে প্রয়োজনে। আমাদের উচ্চস্বর শুনে দোতলা থেকে বাড়িওয়ালা চাচা নেমে আসেন। ঝগড়ার কারণ শুনে তিনি মুচকি হেসে বলেন, ছবিটাকে তিন টুকরো করে নিয়ে যাও। সবকিছু যখন তিন টুকরো হলো।
বড় ভাইয়া বলেন, এ ছবি ছেড়ে আমি কোথাও গিয়ে একরাতও কাটিয়ে আসিনি। আমি বলি, প্রতিরাতে ঘুমাবার আগে এই ছবিটা আমার একবার অন্তত দেখতে হয়। রাজু বলে, আমি বুঝি দেখি না? আমরা তিনজন একই সুরে বলি, এ ছবি না নিয়ে কোথাও যাবো না। আমাদের সিদ্ধান্ত স্থির। প্রত্যেকে নিজের সিদ্ধান্তে অটল।
বাড়িওয়ালা চাচা কী বুঝেন, কে জানে? পরমাত্মীয়ের মতো বলেন তিনি, তবে কি ঠেলাওয়ালাদের বলবো মালামালগুলো আবার জায়গামতো রেখে দিতে?
তার কথার উত্তরে আমরা কিছুই বলিনা।
০ সমাপ্ত০
প্রথম পর্ব: Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব:
Click This Link
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।