উন্নত দেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
(৫ম পর্ব)
ম্যট্রিক পরীক্ষা তথা এস, এস, সি পরিক্ষা দেবার জন্য মনে হয় শুধু আমাকেই চকদৌলত ক্যম্পের বাইরে গিয়ে স্কুলে যেতে দেয়া হোল। অন্যান্য পরিবারের ছেলেরা ও পড়াশুনার জন্য বাইরে স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য ক্যম্প কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হলেও কর্তৃপক্ষ (একজন পাঞ্জাবী মেজর) তা নাকচ করে দেন।
অনেক সামরিক পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুল বা কলেজ থেকে উঠিয়ে নেন, কারন অনেকেই মনে করেছিলেন ক্যম্পে নেয়া হলে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশে যাওয়া হবে। ১৯৭৩ এর শুরুতে এসে অনেকেই মনে করলেন যে, কাজটি সঠিক করেন নি। স্কুল বা কলেজে এডমিশন থাকলে অন্ততঃ তাদেরকে ক্যম্পের কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে বন্দী জীবন যাপন করতে হোত না।
এরই মধ্যে ছোটদের জন্য ক্যম্পে পড়াশুনার পাঠশালা শুরু হয়ে গেল। মাঝ বয়েসি ছেলেদের ব্যস্ত রাখার জন্য খেলাধূলা।
অনেক কিছুই এখন পরিষ্কার ভাবে স্মৃতিতে নেই। পরিবার থাকছে কেম্পে তিন বোন সহ, বাবা মা একটি কক্ষে। পরিবারের সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই।
বাবা আমার স্কুলের জন্য চাকুরী কালীন সময়ে ৩০০(তিনশত) রুপিয়া স্কুল কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়ে দিতেন সরাসরি। এ নিয়ে কোনদিন আমাকে ভাবতে হয়নি। সত্তুর দশকে তিনশত রপিয়া বেশ ভারি রকমের অর্থ, অর্থাৎ আমার স্কুল ছিল বেশ ব্যয় বহুল। ক্যম্পে থাকাকলিন কি ভাবে সেই অর্থ বাবা যুগিয়েছেন, তা আমি এখনও জানি না।
ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি চকদৌলত ক্যম্পের বাইরে সর্বপ্রথম ১৪-১৫ বছর বয়সে একদম অচেনা পথে পারি দিয়ে স্কুলে যেতে হবে।
কারন ১৯৭৩ সালে এপ্রিলে আমার এস, এস, সি পরীক্ষা। এ্যবোটাবাদ থেকে মারী আসা-যাওয়ার পথ আমার মোটামুটি জানা ছিল, কিন্তু
চকদৌলত --> ঝেলাম --> রাওয়ালপিন্ডি --> হাসানাব্দাল হয়ে এ্যবোটাবাদ। এই রুটে আমি কি বাবা ও ট্র্যভেল করেন নি। ভরসা ছিল বেশ কয়েকটা
১। আমি বাঙ্গালী, পরিবেশ পরাজিত পাকিস্তানিদের।
২। উর্দু ফ্লুয়েন্ট বলতে পারি এবং কিছুটা পড়তে ও পারি।
৩। পাঞ্জাবী ভাল বলতে না পারলে, বুঝতে কোন অসুবিধে হয় না।
বিধাতার কৃপায় এই অচেনা পথ পারি দিয়ে ফেললাম।
চকদৌলত --> ঝেলাম – লোকাল বাস;
ঝেলাম --> রাওয়ালপিন্ডিঃ দুর পাল্লা সরাসরি বাস, মাঝ পথে উঠা।
রাওয়ালপিন্ডি --> হাসানাব্দাল হয়ে এ্যবোটাবাদ দুর পাল্লা সরাসরি বাস।
এ্যবোটাবাদ শহর থেকে এপিএস স্কুল ক্যম্পাস – পাঁচ মাইল, সবচেয়ে পরিচিত পথ।
রাওয়ালপিন্ডিতে বাবার পাঞ্জাবী বন্ধুর বাসায় এক রাত থাকা।
দেড় মাস প্রস্তুতি পর্ব, মার্চের ৩১ তারিখে, এস, এস, সি প্রস্তুতি প্রর্বের জন্য ১৫ দিন ছুটি।
তারপর ১০ দিনের মাঝে পরো পরিক্ষা শেষ। তার পর বাড়ি (আমার জন্য ক্যম্প)।
এখানেই আমি বিধাতার কৃপা বিশেষভাবে অনুভব করলাম। একমাত্র ইতিহাসের তারিখ গুলো ছাড়া যাই পড়ি, একবার
পড়লেই তা মনে তেকে যাচ্ছে (যেটা এখন নেই)। পরীক্ষা দিয়ে ফেললাম।
এবারে আমার যাবার পালা, সংগে ট্রাঙ্ক সহ 'হোল্ড অল' (বিছানা মোড়ানো)।
রাওয়ালপিন্ডি এসে ঝামেলায় পড়লাম। বাবার যেই বন্ধুর বাসায় থাকার কথা, তিনি নেই। ওনাদের বাড়িতে বেশ কিছু ব্যস্ততা। আন্টিকে সালাম দিয়ে ওনাদের গেষ্ট রুমের দিকে যাবার জন্য তাকিয়ে আছি, উনি বললেন;
------ “ তুম বাদ মে আও, আভি জাগা নেহি হ্যয়"
আমি তো মহা বিপদে, থাকবো কোথায় রাতে? রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঝেলাম হয়ে চকদৌলত ক্যম্পে বাবা - মার কাছে যাওয়া তো দিনে আমার জন্য সম্ভব।
আমি বুঝলাম আঙ্কেল নেই, তাই এই পাঞ্জাবী মহিলার আসল চেহারা বেরিয়ে এসছে। গত বার একজন বাঙ্গালী অফিসারের ভাইয়ের সাথে উনার হোটেল ভাড়া করায় এসছিলাম। ওটা স্পষ্ট মনে আছে, একদিনের জন্য ১১(এগার) টাকা, এটাচ্ড বাথ।
আমিও আর আন্টির কাছে দ্বিতীয় অনুরোধ না করে, ট্যক্সি নিলাম, ট্যক্সি ড্রাইভারকে বললাম,
-------- “রাজা বাজার মে কোই সস্তা হোটেল মে লে মুঝে লে চলিয়ে। "
সে তো নিয়ে গেল, ঘোড়া পতিত বিষ্ঠা রাস্তায় দিয়ে নিয়ে গেল।
ঘোড়ার বিষ্ঠার গন্ধ যে কত তীব্রতর হতে পারে তখনকার রাওয়ালপিন্ডির রাজাবাজার তার একটি উদাহরন। ছয় রুপিয়াতে দোতলায় হোটেল রুম ভাড়া হোল। নিচের তলায় সব দোকান ঘর। আমার বয়সের দেখে চেহারা দেখে বার বার আঁচ করতে চাইছিল, আমি কি করতে এই ঘুপচির হোটেলে এসেছি। পরিচয় আমাকে জিজ্ঞেস করে নি, সম্ভবত এপিএস এর স্কুল ড্রেসের কারনে।
রুম দেখিয়ে দিল, লাইট জ্বালিয়ে দেখলাম লো ভোল্টেজের কারনে, রুমের অনেক কিছুই দেখা যায় না। বাথরুম এটার এটাচ্ড না (ছয় রুপিয়াতে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা ঠিক না)। বাথরুমে যেতে হবে, জিজ্ঞেস করতে দোতলার গলি দিয়ে আরেক কোনায় নিয়ে গেল। এখানে সুইচ অন করে দেখলাম, বিদ্যুৎ বাতির আলো দিয়ে শুধু আধো ময়লাম প্যনটা নজরে পরে। হোটেল বেডরুম থেকে এখানে ভোল্টেজ আরও নিম্নমুখি।
কোনরকমে বাথরম সেরে রুমে এসে দরজা বন্ধ করে শুতে চলে গেলাম। অচেনা এই স্থানে বাইরে হোটেলে খাওয়ার কথা চিন্তাতেই আনলাম না। সকাল হলে সরাসরি বাস স্ট্যন্ডে।
সকাল হোল, সোজা বাস স্ট্যন্ড, নাস্তা বাস স্ট্যন্ডেই। টিকেট করে পকেটে মাত্র ছয় রুপি।
বিধাতার কাচে দোয়া করতে থাকলাম, চকদৌলত ক্যম্পে পৌঁছা ছাড়া আমার আর কোন করচ যেন না হয়। বিধাতা মনে হয় শুনলেন, সারে তিন টাকা খরচে, চার ঘন্টার মত জার্নি করে চকদৌলত ক্যম্পে পৌঁছলাম।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।