আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ
ইচ্ছা হল ধর্ম নিয়ে কি ভাবি সেটা ব্লগার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবার। কয়েকভাবে চেষ্টা করেও নিজের চিন্তাধারা সহজ ভাবে লিখতে সমর্থ হলাম না। অবশেষে ঠিক করলাম আমার ধর্ম শিক্ষা কেমন হল সেটাই লিখি, হয়ত এভাবেই নিজের সঠিক ভাবটা প্রকাশ করতে পারব। লেখা শুরু করলাম আমার বাবা বাল্যকাল থেকেই।
আমি জন্ম হয়েছি এক বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত পরিবারে এবং পরিবারটি মুসলিম।
অন্যদিকে আমার বাবা জন্ম হয়েছিল এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে, তবে পরিবারটি ঘোর মুসলিম। বিধায় ছোটবেলা হতেই বাবার কোরান তিলাওয়াতে হাতে খড়ি হয়। ১৯৬৯-এ বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষের ছাত্র এবং দুইটা টিউশুনি করত। একদিন ছাত্রের মা বাবাকে এসে অনুরোধ করল ছেলের জন্য ভাল কোরান শিক্ষক (হুজুর আর কি) ব্যবস্থা করে দিতে। আমার বাবা দেখল কোরানতো সে নিজেই পড়াতে পারে বরং হুজুরের থেকে বাবার নিজেরই পয়সার দরকার বেশি।
সেই থেকে ঐ ছেলেকে বাবা নিজেই কোরান পড়ানো শুরু করে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন কমিউনিজমের জোয়ার, সেই জোয়াড়ে বাবাও ভেসে গেল এবং স্বগর্বে নাস্তিকতার গান গাইতে লাগল। দেশ স্বাধীন হল, মুজিব গেল, জিয়া গেল এমনকি রাশিয়া থেকেও কমিউনিজম উড়াল দিল কিন্তু, আমার বাবার মাথা থেকে কমিউনিজম গেল না। দাদির বড়ই দুঃখ ছিল যে তার মত এমন নিষ্ঠাবান ধর্মপ্রাণ মহিলার গর্ভে জন্ম নেওয়া এককালের কোরান শিক্ষাদানকারি আমার বাবা এখন কোরান তিলাওয়াত তো দুরের কথা নামাজও পড়ে না। যাইহোক এভাবে চলতে চলতে বাবার বিয়ে হল মায়ের সাথে, তিন বছরের মাথায় আবির্ভাব হল আমাদের ভাইবোনের।
আমার নানা নাস্তিক না হলেও, তেমন ধর্মকর্ম করতেন না, যদিও মারা যাবার কয়েক বছর আগে নামাজ রোজা ধরেছিলেন। ফলে আমার মায়ের দিক হতেও তেমন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ছিল না।
সময় গড়াল, আমরা ভাইবোনও বড় হতে থাকলাম, কিন্তু আমার বাবা আমাদের ধর্ম শিক্ষাদানে কোন তাগিদ অনুভব করল না। স্কুলের বন্ধুদের তিলাওয়াতের সংখ্যা বাড়তে লাগল কিন্তু, আমাদের ভাইবোনের গাড়ি যাত্রাই শুরু করল না। মাঝে মাঝে দাদি কিছুদিনের জন্য গ্রাম হতে আমাদের বাড়িতে আসত।
তখন যতটুকু সম্ভব আমাদের দুইজনকে অন্তত নামাজ, রোযা জাতীয় ধর্মীয় কর্মকান্ডগুলোতে হাতেখড়ি দিতে চেষ্টা করতেন, যদিও তেমন লাভ হয় নি। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় ইসলাম শিক্ষা বইতে ৮/৯ টা সূরা ছিল। পরীক্ষার তাগিদে পড়া সেই সূরাগুলো দিয়েই আমার ধর্ম শিক্ষা শুরু। নামাজ রোযার নিয়ম কানুন গুলো শিখেছিলাম স্কুলের ইসলাম শিক্ষা বইয়ের আলী ও যেবুর এসো নিজে করি ধরনের অধ্যায় গুলোর সাহায্যে। বাবা নিজে ধর্ম কর্ম না করলেও কখনই ধর্মবিরোধী কথা বলত না আমাদের সাথে।
মা মাঝে মাঝে নামাজ পড়ত। আমি নিজে থেকেই মাঝে মাঝে নামাজ পড়তাম, আর রোজার মাসে অন্তত একটা হলেও রোজা রাখতাম। আমরা ভাই বোন রোজা রাখলে, বাবা নিজেই সেদিন বিশেষ ইফতারে ব্যবস্থা করত।
ক্লাস সিক্সে উঠবার পরে স্কুলের সিলেবাসে আরবী শিক্ষা চালু হয়। তখন কিছু আরবী শিখি, যা পরবর্তীতে কোন কাজেই আসে নাই।
স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হলাম। ২০০১ এর ২ জুন এইচএসসি শেষ হয়। ভাবলাম, এবার নিজের ধর্মটা নিয়ে কিছু জানা উচিত। অন্ততপক্ষে, কোরানে কি বলা আছে সেটুকু জানা অবশ্যই উচিত, মানি আর না মানি। নিজের বিদ্যাবুদ্ধির ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, না বুঝে যেমন বিজ্ঞান পড়ি না ঠিক তেমনি না বুঝে কোরানও পড়ব না।
যেহেতু আরবী শেখা সম্ভব নয়, তাই মাতৃভাষাতেই কোরান পড়তে হবে। পরীক্ষা শেষে বাসায় যাবার পথে কাটাবন থেকে উচ্চারণ ও অর্থসহ কোরান কিনি। কোন অনুবাদ কিনব বা তার দাম কেমন, কোন আইডিয়া ছিল না। ভাবলাম ধর্ম কর্মের ব্যাপার দোকানদার নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। আমার বিশ্বাস ভুল ছিল, ধরা খেয়েছি!
এই শুরু আমার কোরান পড়া।
বিশেষ কারণে পড়া এক পর্যায়ে থামিয়ে দিতে হয়। থেমে যাওয়ার কারন, আমি যে কোরানের অনুবাদটা কিনেছিলাম, সেটার অনুবাদ বিচ্ছিরি রকম ছিল অশুদ্ধ ছিল। একে তো গুরুচন্ডালি দোষ অন্যদিকে, যে মৌলভি অনুবাদক, সে হয়ত বাংলার থেকে উর্দু-আরবী বেশি পড়েছে। অনেক লাইনেই উর্দু আরবী শব্দের ছড়াছড়ি, অথচ প্রত্যেকটির সুন্দর বাংলা শব্দ রয়েছে। যেমন, একটা আয়াতে ছিল, “ওদের প্রশ্ন কর”; এটাকে অনুবাদে লেখা হয়েছে, “ওদের পুছুন”।
কি বিচ্ছিরি ব্যাপার? পুছুন কেন? “প্রশ্ন কর” বা “জিজ্ঞাসা কর” লিখতে ক্ষতি কি ছিল! সূরা ৪১-এর ২৪ নং আয়াতে আছে, “এখন ওরা ধৈর্য ধরলেও জাহান্নামই হবে ওদের আবাস এবং ওরা ওজরখাহী করিলেও গ্রহণ যোগ্য হবে না”। এই ওজরখাহীর অর্থ কি আল্লাহ মালুম! সূরা ৩৬ এর ২১ নং আয়াতে আছে, “অনুকরণ কর তাদের যারা চাহে না উজরত”। উজরত কি অনুবাদকই জানে! এরকম হাজারো অদ্ভুত সব শব্দ। ধৈর্য ধরে বেশ খানিকটাই পড়েছিলাম, একপর্যায়ে এমন অদ্ভুত অনুবাদ পড়া আর সম্ভব হল না। বাদ দিলাম।
তবে যতটুকু পড়েছি খাটি বিজ্ঞানের বই যেমন খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ি তেমনই পড়েছি। ততটুকুর ভিত্তিতেই ইসলাম সম্পর্কে অনেক অনেক অস্পষ্টতা কেটেছে।
অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছি, ইসলাম খুব কঠিন কোন ধর্ম নয়। মুক্ত মনে মানবিকতার ভিত্তিতে আমরা নিজের জীবনকে যেভাবে চালাতে পছন্দ করব, ইসলামের সাথে সেই জীবন পদ্ধতির খুব কমই অমিল হবে বলে আমার মনে হয় এমনকি কোরান পড়তে গিয়ে আমার মনে হয় নি ইসলামের নারীপুরুষের সম্পর্ক নিয়ে খুব বেশী বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। হাদিস কি বলে তা আমি জানিও না, জানতেও চাই না।
আমরা যেখানে এই রেডিও, টেলিভিশনের যুগে ৩৭ বছর আগের ঘটে যাওয়া ইতিহাসই ঠিক মত ধারণ করতে পারলাম না, সেখানে মহানবী (সঃ) মৃত্যুর ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরে মানুষের মুখস্তের উপর ভিত্তি করে যে হাদিস সংকলন করা হয়েছে তা নিয়ে আজাইরা কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি (অনেক ক্ষেত্রে রক্তপাত) নিতান্তই বোকার কাজ বলেই মনে হয়।
আসলে ধর্ম, সৃষ্টিকর্তা ইত্যাদি বুঝতে হবে মুক্ত মন নিয়ে। মনকে খাঁচায় বন্ধ করে কখনই সৃষ্টিকর্তা বা ধর্ম নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। আমার বাবা আমাদের এই সুযোগটাই দিয়েছিল। আমাদের বাবা আস্তিকতা, নাস্তিকতা, ধর্ম কর্ম কোন কিছুই চাপিয়ে দেয় নি।
ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমার বাবা সবসময় ১৫ মিনিট আগে অফিসে পৌছায়, কখন বাবা দেরীতে অফিসে গেছে বলে শুনিনাই। কখনও কাউকে ধোকা দিয়েছে এমন শুনি নাই। অফিসে, ঘরে বাইরে সবার মুখে শুনেছি বাবার সততার কথা, যদিও মাত্রাতিরিক্ত রাগী ও একরোখা হিসেবে বাবার দূর্নাম করে সবাই (আমিও)। ওহ, আর একটা দূর্নাম আছে বাবার সে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান গুলো (যেমন নামাজ, রোজা) পালন করে না। বাবার জীবন যাপন থেকে শিখেছি, এমন কাজ করা পাপ, যা করলে নিজেকে শ্রদ্ধা করা যায় না।
বাবা বলে, নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন ও অন্যের কোন ক্ষতি না করে জীবন যাপনের পর, মহান সৃষ্টিকর্তা যদি শুধু তার গুনকীর্তন তথা দৃশ্য ইবাদত না করার জন্য কাউকে জাহান্নামে দেয়, তবে জাহান্নামই ভাল। বাবার কাছ থেকে শিখেছি নিজেকে শ্রদ্ধা করতে, অপরকে শ্রদ্ধা করতে, নিজের দায়িত্বকে শ্রদ্ধা করতে।
ইচ্ছা থাকলেও আমার নামাজ, রোজা তেমন করা হয় না। তবুও নির্দ্বিধায় আমি বলতে পারি আমি মুসলমান। কারন আমি এক সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করি।
যতটুকু বিজ্ঞান পড়েছি তার ভিত্তিতে সৃষ্টিকর্তায় ভৌত উপস্থিতি কোথাও আছে, এমন প্রমান পাই না। তবুও কেন জানি না বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, কেউ আছেন কোথাও। মৃত্যুতেই আমার অস্তিত্ব শেষ হবে না। হোক না সে অস্তিত্ব জাহান্নামেই, তবুও আমিতো রইব।
আস্তিক নাস্তিক সকলেরই শত্রু হলাম কি?
(চলবে.........................................................................................হয়ত!!!!
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।