সময়, কবিতা, ছোটগল্প, দেশ, দেশাচার
অদ্ভুত এক মহড়া চলছে সময়ের। সকালে মোনালিসা রোদ চুমু দেয় কপালে। একটু পরেই সবুজাভ ছায়া পড়ে শহরের শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে। সে ছায়ায় রোদের তাপ আরো অনেক বেশী, তাজা সর্ষের মতো ঝাঝালো সে ছায়ার মুখ। সকালের মোনালিসা রোদ যেন উড়নচন্ডী উর্বর্শী ভালবাসা হয়ে চৈতালী মাতাল হয় সে ছায়ায় নেচে নেচে।
দুপুরে ভ্যাপসা গরমে ভরে উঠে সময় আর ঘর। মোনালিসা রোদ আর উড়নচন্ডী উর্বর্শী ভালবাসা শুকনো খটখটে এক টুকরো রুটি। এর মাঝে শরীরের ভাজে ভাজে চ্যাপটে যাওয়া চিটচিটে ঘাম আর বুদবুদের সমাহার। অপরাহ্ন সময়টি চামড়া ছেড়া বুড়ো কুকুরের মতোন। এতটুকু তৃপ্তির আশায় জিব বের করা হাপানো হাপরের শ্বাস।
বিকেলটা একটু শান্তি, রাতের আশায় আহরহ খোলা বাতাস। রাত আবার সকাল, দুপুর আর বিকেলকে ভাবিয়ে টানাপোড়ন অস্থির।
এধরণের সময়গুলো মাঝে সাঝে ভাল হলেও বড় বেশী চড়বড়ে। কোন মুহুর্তের উপরই ভরসা রাখা যায়না। কখন কি আসবে, তার সামান্য আভাসও পাওয়া যায়না।
মাঝে মাঝে মনে হয়, জিলিপীর মিষ্টি আবরণের মাঝে কাচালংকার উৎকট ঝাল। সহসাই মেজাজ খারাপ হয়, মুখের ভেতরে একমুহুর্তেই তেতো স্বাদ।
এমনি এক সময়কে বেয়ে বেয়ে সকাল হল। বাজার শেষে বউয়ের কাছে রান্নাঘরে চটের থলেটি রেখে গোসলটি সেরেছি মাত্র। এর মাঝেই বাইরের মোনালিসা রোদ চুমুর বদলে ছোবল মারছে যত্রতত্র।
বউএর সাথে ভালবাসার পর যে কাব্যিক মেজাজ নিয়ে গল্প শুরু করেছিলাম, তার সমাধি আর সহমরণ বাজারে যাবার আগেই ঘটে গিয়েছে। গোসলখানা ছেড়ে শোবার ঘরে ঢুকে বাইরের পোষাক পড়া শুরু করতেই বসার ঘরের দরজার ঠক্ ঠক্ টোকার আওয়াজ শুনতে পেলাম। টাওয়েলটাকে বিরক্তির মতোই গায়ে জড়িয়ে কর্কশ গলায় ‘কে’বলে কোন উত্তরে অপেক্ষা না করেই দরজা খুলে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে দাঁড়ালাম। দেখি একজন দাঁড়িয়ে আছে বাইরে।
- কে আপনি? আপনাকে তো চিনতে পারলাম না!
- আমার নাম রাজনীতি, আমাকে তো আপনাদের ভাল করেই চেনার কথা।
প্রতিদিন সকালে পত্রিকা পড়ে তো আমাকেই ভাজেন আপনারা।
- ভাজি বটে! সবখানেই ভাজি। কিন্তু এখন আমার সময় নেই। অফিসে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি বিদেয় হোন।
- না, আমাকে একটু সময় দিতে হবে।
রাজনীতির সাথে দহরম মহরম আমার কখনোই ছিলনা। কিন্তু ছা’পোশা কেরানী আমি, তার সাথে বিবাদে যেতেও সাহস হলনা। তাই দরজা থেকে একটু সরে তাকে বসার ঘরে ঢোকার জায়গা করে দিলাম। ভীতু কেরানী সত্বার ভেতরেও একটু সাহস জোগাড় করে বললাম,
- যা বলার, তাড়াতাড়ি বলুন।
- আমি বিপন্ন।
- তাই? কিন্তু বিপন্ন তো আপনি সর্বদা, সবখানেই। এটা আবার নতুন কি হলো?
- কিন্তু এবারের অবস্থা আরো বেশী খারাপ। আমার সাহায্য দরকার।
- আমি সাধারণ নিম্নবিত্ত কেরানী, আমি আপনাকে কি সাহায্য করবো? আমার বাড়ীওয়ালার কাছে যান।
খুব গুনী মানুষ। সকালকে বিকেল করতে পারেন, বিকেলকে রাত।
- আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনার সাহায্যই আমার দরকার।
নাছোড়বান্দার মতো জানালো রাজনীতি।
বেশ মেজাজ খারাপ হলো আমার। এই শালার রাজনীতি যদি তার হর্তাকর্তাদের কাছে এতটা নাছোড়বান্দা হতো, তাহলে তাকে নিয়ে পুতুলের মতো নাচতো না কেউ। এখন তার যতো ঝাঁঝ আমার মতো ছন্নছাড়া এই কেরানীর কাছে। কিনতু কেরানীদের যা ভাবনা, তা বলার সাহস কি পায় কখনো? তাই বললাম,
- বলুন কি সাহায্য করতে পারি।
- খুবই ছোট ব্যপার!
- ঠিক আছে, ভনিতা না করে বলুন দ্রুত।
- এটা রেখে দিন আপনার কাছে। যখন বলবো, তখন জালাবেন। ]
বলেই একটা দেশলাইএর কাঠি এগিয়ে দিল হাতে। আমি অবাক হয়ে সন্মোহিতের মতো হাতে নিলাম কাঠিটি। অতি সাধারণ এক দেশলাইএর কাঠি।
বারুদের কালো রঙ কাঠির একদিকে জড়িয়ে। তার একটি দিক একটু ভাঙ্গা হলেও মনে হচ্ছে জ্বলবে কাঠিটি। কাঠিটি কাঠের। ঘোলাটে সাদা রঙ। উপরের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েই দেখলাম, কিছু না বলেই বিদায় নিয়েছে রাজনীতি।
দরজা বন্ধ করে কাঠিটির কথা ভাবতে ভাবতেই ফিরে গেলাম আবার শোবার ঘরে।
একটু বিমোহিতের মতো প্যান্ট শার্ট পড়ে জুতোটি পড়তে গিয়েই আবার একটু ফিরে এলাম বাস্তব পৃথিবীতে। ডান পায়েরটি একটু ছিড়ে আছে বাঁ’দিকে। এই টানাটানির দিনে আবার নতুন জুতো কিনতে হবে ভেবে খিচড়ে উঠলো মেজাজ। সামনে আবার ঈদ।
বউ এর শাড়ী, ছেলের পোষাকআসাক কিনতেই প্রানান্ত, এর মাঝে আবার জুতো! কাঠির কথা ভুলে কিছুটা হাতাশ কবি স্বত্বার বাড়তি প্রভাবে সুকান্তের কথাই মনে পড়লো। “আহা! ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়!” ছেড়া জায়গাটিতে হাত বুলিয়ে জুতোটি পায়ে গলাতেই আবার দরজায় টোকা। ফিতে না বেঁধেই তিরিক্ষি মেজাজে দরজা খুললাম বসার ঘরের।
- আপনি কে? কি চাই?
- আমার নাম ধর্ম। আপনার কাছে সাহায্য চাই।
- একটু আগে রাজনীতি এসেছিল। আবার আপনি?
- তাই নাকি। তো ভাল যে, আমি একটু পরে এসেছি।
- কেন দু’জনে একসাথে এলে কি ক্ষতি হতো? সকালে অফিসে যাবার তাড়ার মাঝে আমাকে দু’বার দরজা খুলতে হতো না।
- দু’জনে একসাথে চলার মাঝে অনেক সমস্যা আছে।
আপনারা তা বুঝতে চান না বলেই এত সমস্যা।
- বুঝি, তারপরও সক্কাল সক্কাল ধর্ম রাজনীতির তাত্বিক আলোচনার মেজাজ আর সময় আমার নেই। যা বলার তাড়াতাড়ি বলে বিদায় হোন তাড়াতাড়ি।
- আমি বিপন্ন। আমাকে ধর্ষন করা হয়েছে।
দেখলাম, সত্যিই বেশ বিপর্যস্ত ধর্মের চেহারা। পোষাক আসাক ছিড়ে একাকার। চেহারায় আচড়ের গভীর চিহ্ন। নিজে ততোটা বিশ্বাসী না হলেও বেশ মায়া হলো তার এই চেহারায়। তাই জানতে চাইলাম,
- এদেশের প্রায় সবাই তো আপনারই অনুসারী।
আপনাকে ধর্ষন করার কার এতো সাহস!
- এখানেই তো সমস্যা। আমার তথাকথিত অনুসারীরাই আমার বড় ধর্ষক।
- আমি কি করতে পারি?
কোন উত্তর না দিয়ে আরেকটি দেশলাইএর কাঠি রেখে বিদায় হলো ধর্ম। একই ধরণের কাঠি। শুধুমাত্র কাঠের রঙটি আরো একটু কালচে ধরণের।
ওটা কে রাজনীতির দেয়া কাঠিটির পাশে রেখে বেরিয়ে পড়লাম অফিসে। শহরে হরতাল, ধর্মঘট। ছেড়া জুতো পড়েই হাটতে হবে এতটি পথ! সকালের মোনালিসা রোদ তার কমনীয়তা বিসর্জন দিয়েছে অনেক আগেই।
অফিসে পৌঁছে দেখি একই আলোচনা। সবার মুখে মুখে একই কথা।
আমাদের বড়সাহেবের বাড়ীতে এসেছিল মানবতা আর যোগাযোগ। তার এসিস্ট্যান্ট এর বাড়ীতে ন্যায়বিচার আর শিক্ষা। লিঁয়াজো অফিসার তার শশুরবাড়ীতে ঘরজামাই থাকেন। তার কাছে এসেছিল শুধুমাত্র স্বাধীনতা। অর্থনীতি আর ধর্ম গিয়েছিল আমাদের পিওনের কুড়েঘরে।
খেলাধুলা আর রাজনীতি গিয়েছিল আমাদের বড় কেরানীর বাড়ীতে। কালও নাকি অনেকের বাড়ীতে আসাযাওয়া হবে। সবাই এত বেশী উত্তেজিত যে, কাজেই মন বসালো গেল না। গুরুগম্ভীর বড়সাহেবও সবাইকে ডেকে ডেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন সব। কারা কারা এসেছিল, ক’টা করে দেশলাইএর কাঠি কে কে কে পেয়েছি, ইত্যাদি।
বিকেলে বাড়ী ফিরে পেটরোগে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে গেলাম ড: রাগীমনের চেম্বারে। আমার মতো নিম্নমধ্যবিত্তের সেখানে যাওয়া একেবারেই সাজে না। তবে ব্লগের কল্যানে কিছুটা পরিচয়ের কারণে তীরুদা বলে খাতির করেন এই ডাক্তার। সেজন্যই সম্ভব। তারপরও গরীবের ঘোড়ারোগের মতোই অনেকটা।
সেখানেও একই আলোচনা। তার কাছে নাকি অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই হাজির হয়েছিল চিকিৎসা। তার একটু পরই এসেছিল স্বাধীনতা। ড: রাগীমনের টেবিলে ছুরি কাচির পাশাপাশি দু’টো দেশলাইএর কাঠিও দেখতে পেলাম।
চেম্বার থেকে ফিরে ছেলেকে মায়ের কাছে রেখে গেলাম “অপর বাস্তব” দুই এর কর্মশালায়।
কৌশিকের সাথে সেখানে রয়েছেন রাহা, অমি রহমান পিয়াল, এস্কিমো, জামাল ভাস্কর সহ আরো অনেকে। এমনকি ত্রিভুজও নাকি একটি আগে এনেছিলেন সেখানে। আমি আসবো শুনে মুখ ব্যাজার করে তড়িঘড়ি করে বাড়ী চলে গিয়েছেন। সেখানেও “অপর বাস্তব” এর পাশাপাশি একই আলোচনার বাতাস। কৌশিকের টেবিলেও দু’টো দেশলাইএর কাঠি সযত্নে রাখা দেখতে পেলাম।
বেশ ক’দিন ধরে চলছে এমন। সারা শহরে দেশলাইএর কাঠিকে ঘিরে বেশ একটি বারুদ বারুদ ভাব। আমাদের পাড়ার ক্লাবঘরের আড্ডার টেবিলের উপর স্তুপীকৃত দেশলাইএর কাঠি। নাপিতের চুলকাটা কাঁচি আর ক্ষুরের পাশাপাশি জমানো দেশলাইএর কাঠি। কশাইএর দোকানের কাঠের গুড়ির পাশে দেশলাইএর কাঠি।
স্কুলের শিক্ষকের টেবিলে বই, চক, ডাস্টারের পাশে দেশলাইএর কাঠি। চারিদিকে কেমন যেন বারুদের গন্ধ ঘিরে ধরেছে আমাদের।
আমি প্রতিদিন হরতাল, মিছিলকে পাশে ফেলে হেঁটে হেঁটে অফিসে যাই। একটু দেরী করে ফেরার সময় সন্ত্রাসীর ভয়ে রক্ত জমে বুকের ভেতরে। বাড়ীভাড়া না বাড়ানোয় বাড়ীওয়ালার ছেলে যখন মস্তান নিয়ে আমাকে ভয় দেখায়, তখন কাঁপতে থাকে শরীর।
আমাদের একসময়ের স্বাধীনতা বিরোধী মন্ত্রী মহোদয়ের বিশাল বাড়ীর সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে অফিসে যাওয়ার সময় সে কাঁপুনি বেড়ে যায় আরো বেশী। টিভিতে আমাদের ক্ষমতাশীন নেতাদের কলুষিত চেহারা দেখলে মনে হয়, বুকের ভেতরে কাঁপুনিতে হৃদপিন্ডই বেরিয়ে আসবে শরীর ছিড়ে। রাস্তায় জননেতাদের মাস্তানের পশুত্বে ধর্ষিত হয় তরুনী, মৌলবাদী কুকুরের ক্ষুরে কাটে ছাত্রের গলা। আর আমরা প্রতিদিন কেঁপে কেঁপে মরি।
এর মাঝে আমাদের বাসার বসার ঘরের টেবিলে দেশলাইএর কাঠির স্তুপ ধীরে ধীরে আরো বেশী বড় হয়েছে।
সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ধীরে ধীরে সাহস পাই। হাত পায়ে শক্তি ফিরে আসে। উধাও হয় শঙ্কা, উধাও হয় ভয়। আমার সংকল্পবদ্ধ চোয়াল, দাউদাউ অপেক্ষা নিশিদিন, কখন শমন আসবে, কখন জ্জলবে সে কাঠি!
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।