ঢাকা মহানগর পুলিশে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রবণতা। পিআরবি অ্যাক্ট অমান্য করার মাধ্যমে পেশাদারি থেকেও ছিটকে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। জুনিয়রিটি-সিনিয়রিটির ধার না ধেরে লিপ্ত হচ্ছেন সংঘাত-সংঘর্ষে। ভেঙে পড়ছে চেইন অব কমান্ড। এসব কারণে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও চরম আকার ধারণ করেছে পুলিশে।
কনস্টেবল এমনকি কোথাও কোথাও জুনিয়র সেরেস্তাদার হিসেবে থানার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এএসআই। জুনিয়র ওই সেরেস্তাদারই ডিউটি বণ্টন করছেন, দারোগারাও থাকছেন তার অনুকম্পা প্রার্থী হয়ে। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় পোস্টিং দেওয়ার ক্ষেত্রেও জুনিয়রিটি-সিনিয়রিটির মূল্যায়ন থাকছে না। বিভাগ পর্যায়ে ডিসির সেকেন্ড ম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে যেমন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি থানার অফিসার ইনচার্জের পরবর্তী দায়িত্ব অর্পণেও রয়েছে খামখেয়ালিপনা। পদায়নের ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি-জুনিয়রিটি মূল্যায়িত না হওয়ায় তাদের আচার-আচরণ ও দায়িত্ব পালনে অমান্য হচ্ছে চেইন অব কমান্ড।
গুলশান বিভাগের ডিসি তারই অধীনস্থ হিসেবে ২৫তম বিসিএস ব্যাচের শফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন গুলশান বিভাগের এডিসি (প্রশাসন) হিসেবে। অথচ শফিকুল ইসলামের সিনিয়র ২৪তম বিসিএস ব্যাচের শাহনেওয়াজ খালেদকে পোস্টিং দেওয়া হয় এক ধাপ কম মর্যাদায় এডিসি হিসেবে। ফলে এডিসি শফিক তারই সিনিয়র এডিসি শাহনেওয়াজের ওপর নানা রকম খবরদারিত্ব দেখানোসহ মারামারিতে জড়িয়ে পড়ার জঘন্য নজির সৃষ্টি করেন। শুধু গুলশান বিভাগেই এমন উদাহরণের সূত্রপাত ঘটেনি। মতিঝিল বিভাগেও মঞ্চস্থ হয়েছে একই দৃশ্যপট।
সেখানে সিনিয়র হিসেবে এডিসি শিমুল বিশ্বাস থাকলেও তার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তা মেহেদী হাসানকে এডিসির (প্রশাসন) দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওয়ারী বিভাগে ২৫তম বিসিএস ব্যাচের রাফিউল ইসলামকে প্রশাসনিক এডিসি করা হলেও তারই সিনিয়র এডিসি নজরুল ইসলামকে দেওয়া হয় জোনের দায়িত্ব। লালবাগেও অভিন্ন পরিস্থিতি। বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জরাও খেয়ালখুশিমতো অর্পণ করে থাকেন দায়িত্ব। নিজেদের সুবিধামতো গঠন করেন পাঁচ-সাতটি পর্যন্ত সিভিল টিম।
ডিএমপির সব থানায় যথারীতি দুটি করে সিভিল টিম থাকলেও বনানী থানায় এর ব্যতিক্রম। এখানে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে সাতটি সিভিল টিমের। সিভিল টিমগুলো বাণিজ্য নিশ্চিতের কাজে বেশি ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই নিত্যনতুন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতে রাজধানীতে চলাফেরা করা মানুষজন সিভিল টিম নামধারী পুলিশ সদস্যদের দ্বারা হয়রানির শিকার হননি এমন নজির পাওয়া কষ্টকর। কথিত সিভিল টিমগুলো অপরাধ নির্মূলের ক্ষেত্রেও বিন্দুমাত্র ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই মনে করেন।
অতি সম্প্রতি বনানী থানাধীন মহাখালী ফ্লাইওভারের উভয় প্রান্তে দায়িত্ব দেওয়া হয় দুটি সিভিল টিমকে। রাতে সাব-ইন্সপেক্টর মুকুল মিয়া ও সাব-ইন্সপেক্টর নূর মোহাম্মদ ৩০০ গজ ফ্লাইওভারের দুই পাশে ছিলেন। কিন্তু তাদের ডিউটির সময় ফ্লাইওভারের ওপরে রীতিমতো ফিল্মিস্টাইলে বন্দুকযুদ্ধ চালিয়ে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তাহলে দুই সিভিল টিমের সদস্যরা ওই সময় কী করছিলেন, এর জবাব মেলেনি আজও।
প্রচণ্ড প্রতাপশালী সিভিল টিম : সিভিল টিমের সদস্যরা মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব খাটিয়ে থাকেন।
আর রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশনায় যারা দায়িত্ব পান, তাদের নিয়ে তো কথাই নেই। কারণ এই কর্মকর্তারা থাকেন অধিক মাত্রায় বেপরোয়া। বনানী থানার সিভিল টিমের দাপুটে সাব-ইন্সপেক্টর মুকুল মিয়ার অদৃশ্য ক্ষমতার কাছে গুলশান বিভাগের ডিসি-এডিসি পর্যন্ত অসহায়। এর আগে ডিসি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মুকুলের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সতর্ক থাকতে গুলশান বিভাগের সব থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবু 'গোপালগঞ্জের জামাই' এসআই মুকুল মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পারেননি ডিসি।
চাকরিবিধি লঙ্ঘনসহ শৃঙ্খলাভঙ্গের নানা অভিযোগ আছে বাড্ডা থানার সিভিল টিমের এসআই পলাশ, সোমেন বড়ুয়া ও সাবেক অপারেশন অফিসার লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে। বাড্ডার সাবেক অপারেশন অফিসার লিয়াকত আলী শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে চাকরিজীবনও এ থানাতেই কাটাচ্ছেন। ফলে অপরাধীদের সঙ্গে চমৎকার আত্দীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তার। সেখানে ওসির বডিগার্ড হিসেবে থাকা কনস্টেবল রাকিবের দাপটের সামনে এএসআই, এসআইরা পর্যন্ত আতঙ্কে থাকেন। সিভিল টিমের মতো বেপরোয়া আচরণে বহাল রয়েছেন ক্যান্টনমেন্ট থানার এসআই আবু কাইয়ুম, আবদুল হালিম ও এসআই বদিউজ্জামান।
অভিযোগ রয়েছে, আবু কাইয়ুম জোয়ার সাহারায় ওয়ালটন পুলিশ বঙ্কে অপরাধের প্রধান আখড়ায় পরিণত করেছেন। সেখানে তিনি রাত-দিন লোকজন আটক করে হয়রানিসহ সামারি বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকেন। ওয়ালটন পুলিশ বঙ্ থেকে পাইকারি দরে ফেনসিডিল কেনাবেচারও নানা উদাহরণ রয়েছে।
শৃঙ্খলাভঙ্গ পদে পদে : দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তারা কথায় কথায় এমপি-মন্ত্রীদের দোহাই দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে পাশ কাটিয়ে চলেন। ডিসি পদমর্যাদার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, কনস্টেবল বদলির ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যের লিখিত ও মৌখিক সুপারিশ থাকছে।
অনেক ওসি-দারোগার দাপটে ডিসি-এডিসিরাও কোণঠাসা থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিএমপির থানাগুলোয় ডিউটিকালেও অফিসারদের পুলিশি পোশাক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও চরম অনীহা দেখা যায়। এতে কে পুলিশ অফিসার, কে তদবিরকারী আর কে-ই বা আসামি তা বুঝে ওঠা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। ফলে থানায় আগতরা নানাভাবে শিকার হন প্রতারণার। এদিকে ডিসি পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশনা ছাড়া প্রতি রাতেই থানার বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে।
সেসব চেকপোস্টে পুলিশের কথিত সোর্সরাই যাবতীয় চেকিংয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বিমানবন্দর থানার সেকেন্ড অফিসারের নিয়োজিত সোর্সরা এক হয়ে যেখানে-সেখানে অভিযান পর্যন্ত চালাচ্ছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। থানা, ব্যারাক, ক্যাম্প-ফাঁড়িতে পুলিশের প্রাতঃকালীন প্যারেড কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ঊধর্্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা প্যারেডসহ নানা অনুশীলনকে চলমান প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা-সচেতনতার উৎস বলেই মনে করেন। কিন্তু তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতায় বহাল রাখা যাচ্ছে না অনুশীলন।
কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট : পুলিশের কার্যক্রম নজরদারির জন্য 'কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট' গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও নানা কারণে কাজ আর এগোয়নি। নথি থেকে জানা যায়, ২০০২ সালের ১৪ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক কমিটিতে পুলিশে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবজি, ঘুষ ও অপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নজরদারির সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য গঠন করা হয় আট সদস্যের সাব-কমিটি। এর আহ্বায়ক করা হয় কেবিনেট ডিভিশনের এডিশনাল সেক্রেটারিকে। তবে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. এম শাহজাহান ও আজিজুর রহমানের অভিমত হচ্ছে, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবেই সুশৃঙ্খল পুলিশ বাহিনীতে নানা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে।
পুলিশের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনাগত প্রশিক্ষণে দুর্বলতা আছে বলেও তারা মন্তব্য করেন। ইউএনপিডির গবেষণা তথ্য উল্লেখ করে ড. এম শাহজাহান জানান, ১০০ কনস্টেবলের মধ্যে ৯৬ জনই তাদের ২০ বছরের চাকরিজীবনে বড়জোর তিন মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। অথচ তাদের প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, চাকরিজীবনে সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবলদের উন্নত প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি। তবে সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, পুলিশের বর্তমান কিছু কর্মকাণ্ড দেখে সন্দেহ হচ্ছে, তাদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে কোথাও যেন একটা গলদ রয়েছে।
শাস্তি পান শুধু কনস্টেবল : পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে পুলিশের বিরুদ্ধে মোট ১৩ হাজার অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল পেশাদারিতে অনিয়ম-অনাচার, শৃঙ্খলাভঙ্গসহ ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার। ১ হাজার ৮৮১ জনের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে চুরি, ডাকাতি, খুন কিংবা ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর সব অভিযোগ। বাকি অভিযোগগুলো হচ্ছে জনহয়রানি ও ঘুষ গ্রহণসংক্রান্ত। দায়িত্বশীল সূত্রটি জানায়, সিকিউরিটি সেলে জমা পড়া অভিযোগ তদন্ত করে মোট ৬১৫ জনকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ৬১২ জনই কনস্টেবল। চাকরিচ্যুত করা কিংবা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে ১২৮ জনকে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মহাপরিদর্শকের বক্তব্য : পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, 'পুলিশ সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও অপরাধে জড়াচ্ছেন এটি অস্বীকার করছি না।
অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ পুলিশের যতসংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা জনপ্রশাসনে নজিরবিহীন বলেও মন্তব্য করেন আইজিপি।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।