আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গোঁফ দিয়ে যায় চেনা!

গোঁফ চুরি যাওয়ার অলীক কল্পনাতে কী ভয়ানক খ্যাপাটাই না খেপেছিলেন সুকুমার রায়ের সেই হেড অফিসের বড়বাবু! সব্বাইকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করে শেষে ভীষণ রেগে বিষম খেয়ে তিনি লিখে দিয়েছিলেন, “গোঁফকে বলে তোমার আমার—গোঁফ কী কারও কেনা? গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা। ” সুকুমার রায়ের ‘গোঁফচুরি’ ছড়ার এই বড়বাবু নিছকই একটি কাল্পনিক চরিত্র। তবে গোঁফের প্রশ্নে সত্যিকারের দুনিয়াতেও কাউকে এমনভাবে উত্তেজিত হয়ে যেতে দেখলে অবাক হবেন না। নিজেদের গোঁফ দিয়েই চেনানোর কাজটা কিন্তু সত্যিই করছে এই সময়ের একদল মানুষ।

শুরুটা হয়েছিল ১০ বছর আগে এই নভেম্বর মাসেই।

অস্ট্রেলিয়ার একটি পাবে বসে সমসাময়িক ফ্যাশন নিয়ে কথা বলছিলেন দুই বন্ধু ট্রেভিস গারোনে আর লুক স্ল্যাটারি। হঠাত্ই একজন মজা করে বলে বসেছিলেন, গোঁফটাকেও ফ্যাশন হিসেবে ফিরিয়ে আনার কথা। সূত্রপাতটা এখানেই। ঠাট্টাচ্ছলে বলা এ কথাটাই পরে রূপ নিল পুরুষদের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির মতো গুরুতর আলোচনায়। শুধু ফ্যাশন হিসেবে না, গোঁফ রাখার ব্যাপারটিকে তাঁরা অচিরেই নিয়ে আসলেন প্রোস্টেট ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে, যেটা বিশেষভাবে পুরুষদেরই হয়ে থাকে।

গোঁফের ইংরেজি মুশটাসের (moustache) ম, আর নভেম্বরের ভেম্বর মিলিয়ে এ মাসটাকেই এখন অনেকে ডাকেন ‘মভেম্বর’ বলে। বিশ্বব্যাপী নভেম্বর মাসজুড়েই সচেতনভাবে গোঁফ রাখার অভ্যাস তৈরি করছেন তাঁরা।

শুরুটা হাসি-ঠাট্টাচ্ছলে হলেও এখন এটা শুধুই মজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই তত্পরতার একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যেমনটা বলেছেন, ‘পুরুষদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন করাই মভেম্বরের লক্ষ্য। ’ ২০০৪ সালে গারোনে আর স্ল্যাটারি প্রতিষ্ঠা করেছেন মভেম্বর ফাউন্ডেশন।

অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি প্রোস্টেট ক্যানসার, টেস্টিকুলার ক্যানসার ও বিষণ্নতা বিষয়ে বিশেষভাবে পুরুষদের মধ্যেই সচেতনতা তৈরির জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ২০১২ সালে তারা এই উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করেছিল ১৩ কোটি ডলার। সে বছর এটা গ্লোবাল জার্নালের শীর্ষ ১০০ এনজিওর তালিকায়ও স্থান পেয়েছিল। মভেম্বর ফাউন্ডেশনের সংগৃৃহীত অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় করা হয় প্রোস্টেট ও টেস্টিকুলার ক্যানসার নিয়ে গবেষণার পেছনে। বর্তমানে ২১টিরও বেশি দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে এই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম।

বিশ্বব্যাপী পুরুষের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যানসারটি খুবই পরিচিত ধরনের ক্যানসার। পুরুষদের মধ্যে যতজন ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তার ৩০ শতাংশই এই প্রোস্টেট ক্যানসার। আর ১৫-৩৪ বছর বয়সী পুরুষেরা আক্রান্ত হয়ে থাকেন টেস্টিকুলার ক্যানসারে। আর এটা ক্রমশই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গত ৪০ বছরে টেস্টিকুলার ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে দুই গুণ।

প্রতি ২৭০ জন পুরুষের মধ্যে একজন জীবনের কোনো একসময় ভোগেন এই ক্যানসারে। মভেম্বর তত্পরতা পুরুষদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করার পথে সত্যিই বেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

২০০৩ সালের নভেম্বরে এ উদ্যোগটা নেওয়ার বছর তাঁরা কোনো অর্থ সংগ্রহ করতে পারেননি। পরের বছর অস্ট্রেলিয়ার প্রোস্টেট ক্যানসার ফাউন্ডেশনের জন্য তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন ৫৪ হাজার ডলার। আর এখন পর্যন্ত ৩০ কোটি পাউন্ড তাঁরা সংগ্রহ করেছেন প্রোস্টেট ও টেস্টিকুলার ক্যানসারের চিকিত্সা গবেষণার জন্য।

আর এই সময়ের মধ্যে হাজার হাজার পুরুষ এ বিষয়ে সচেতন হয়েই গোঁফ রেখেছেন। রোগগুলো নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন, যেটার প্রচলন আগে সেভাবে ছিল না।

মভেম্বর তত্পরতার সবচেয়ে বড় প্রভাবটা পড়েছে গবেষণার ক্ষেত্রে। প্রতিবছর যুক্তরাজ্যের প্রোস্টেট ক্যানসার মভেম্বরের কাছ থেকে পায় দেড় কোটি পাউন্ড। যেটা ব্যয় করা হয় গবেষণা ও অন্যান্য সামাজিক সহায়তা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে।

প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের প্রধান আইন ফ্রেমের মতে, এটা একটা বড় ধরনের বদল এনেছে। তিনি বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত ব্রেস্ট ক্যানসারের তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগ আসত প্রোস্টেট ক্যানসার নিয়ে গবেষণার জন্য। কম বিনিয়োগের একটা কারণ হতে পারে যে, এটা খুবই জটিল একটা অসুখ। কিন্তু প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা গত ১০ বছরে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আর আমরা দেখতে পাচ্ছি, চার বছর ধরে মভেম্বরের প্রভাবটা কীভাবে পড়ছে।

প্রোস্টেট ও টেস্টিকুলার ক্যানসার নিয়ে গবেষণার জন্য বিনিয়োগ প্রচুর পরিমাণে বাড়ার খতিয়ানটা দেখলেই সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। ’

—আল জাজিরা ও বিবিসি অনলাইন অবলম্বনে

সোর্স: http://www.prothom-alo.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।