আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমাদেরও ফুসফুস ফুটো হয়ে গেছে, সিদ্ধার্ত



দীপ্তিকে দেখেছি টেলিভিশনে। কান্নায়, বিলাপে বারবার ভেঙে পড়েছে সে; তার হাত ধরে, পিঠ ধরে তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে দুইজন। শোকাকুলা দীপ্তি বারবার বলছিল, “আমি আর বাঁচতে চাই না। আমি আর বাঁচতে চাই না। ”

রাজশাহীর কনস্টেবল দীপ্তি যখন বারবার তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে মরে যাবার কথা বলছিল, তখনো তার সিঁথিতে জ্বল জ্বল করছিল সিঁদুর।

অথচ কী এক ঘাতক এসে ফুটো করে দিয়ে গেলো দীপ্তির দয়ীতের ফুসফুস, নিয়ে গেলো প্রাণ, নিয়ে গেলো সাথী, নিয়ে গেলো প্রেম, নিয়ে গেলো সিঁথির সিঁদুর।

দীপ্তির বিলাপ কয়েক সেকেন্ডের বেশি আমি সহ্য করতে পারি নি। তাই, টিভির পর্দায় সেই বিলাপরতার থেকে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছিলাম দেয়ালের দিকে। তবু, হায়! পিছু ছাড়ে নি কান্নার রোল। তবু, মরমে এসে বাজছে তার বিলাপ।



কিন্তু দীপ্তির জন্য কী করতে পারি আমি!

হয়তো ঘাড় কাত করে একটু কেমন তেরসা হয়ে যখন তাকাতো সিদ্ধার্ত, তা দেখেই দীপ্তির জুড়িয়ে যেতো বুক। হয়তো মৃদু ঝগড়া বা অভিমানের পর, হঠাত যখন দীপ্তি দেখতো, ঘাড় কাত করে একটু কেমন তেরসা হয়ে সিদ্ধার্ত টিভি দেখছে একা, তখন হয়তো মুহূর্তেই গলে পানি হয়ে যেতো দীপ্তির রাগ, হয়তো খুব প্রেম উছলে উঠতো মনে। হয়তো তখন, সে ছল করে বসতো গিয়ে সিদ্ধার্তের কাছে।

কিন্তু সিদ্ধার্ত আজ নেই। দিপ্তীকে কে এসে ফিরিয়ে দেবে সিদ্ধার্তেও গায়ের গন্ধ? কে এসে ফিরিয়ে দিতে পারবে সিদ্ধার্তেও নিশ্বাসের ঘ্রাণ?
কতো দিপ্তীর বুক খালি হলো গত ক’মাসে? সেই হিসেব গুণতে গুণতে আঙ্গুলের ক’ড়ে ফুরোয়।

তবু সংখ্যা ফুরোয় না। সংখ্য গুণতে গুণতে দীপ্তিদের, সিদ্ধার্তদের মুখগুলো হারিয়ে যায়, নামগুলো হারিয়ে যায়, তারা শুধু সংখ্যা হয়ে বাঁচে।

কিন্তু যদি আমি হতাম দীপ্তি! যদি সহসা এক কুক্ষণে শুনি, আমার সিদ্ধার্ত’র ফুটো হয়ে গেছে ফুসফুস! কী করবো আমি! ওহ! প্রভু! এমন দিন আসার আগে তুমি ভূমি তলে আমাকে লুকাও।

আমার মা, বাবা, ভাই, বোন, এমনকি আমার ‘সিদ্ধার্ত’-এর বিষয়েও আমি ভীষণ পজেজিভ। হ্যাঁ, শব্দটা এখানে পজেজিভ-ই হবে, কেবল কেয়ারিং নয়।




শুধু আমি নই, গড়পরতা আম-জনতারা এমনই। প্রত্যেক সংসারেই এমন একজন থাকে, যে মা মুরগির মত, ডানার নিচে নিজের সকল প্রিয়মখ নিরাপদে রাখতে চায়।


আমার মধ্যেও মা মুরগির চরিত্রটা আছে। আমার ডানার নিচে ছানার মতন করে, চিলের নজর থেকে বাঁচিয়ে, আমি নিরাপদে রাখতে চাই আমার মা, বাবা, ভাই, বোন আর পতিকে।


সকলে ঘরে ফিরলো কি-না এই নিয়ে, আর সকলের মতই, আমারও চিন্তার শেষ নেই।

ঘরের কেউ একজন বাইরে থাকা মানে পুরা পরিবারটাই বাইরে রয়ে গেলো; অনিরাপদ রয়ে গেলো। কেননা বাইরেটা এখন নিরাপদ নয়।


কিন্ত কে তাকে অনিরাপদ বানালো, কেন বানালো, সেই সব-ও লোকেদের অজানা নয়। একটি শান্ত জনপদ কী করে ব্যক্তিদের জেদাজেদির কারণে অনিরাপদ, অস্থির হয়ে উঠলো, কী করে লোভের আগুণে পুড়ে ছাই হলো কতো কতো দীপ্তির সোনার সংসার সেই কথা হয়তো বর্ণিত হবে ভবিতব্যের কোনো এক শোকগাথায়।


সেই গাথায় হয়তো সোনার অক্ষরে জ্বল জ্বল করবে কনস্টেবল সিদ্ধার্তের নাম, হয়তো সেই গাথারই একটি পর্বে নায়িকার মর্যাদা পাবে বুক খালি হওয়া দিপ্তী।




সেই গাথায় হয়তো থাকবে এক পোড়া সময়ের ঘ্রাণ, থাকবে সিঁথির সিঁদুর মুছে যাবার অবর্ণনীয় ব্যাথা বয়ানের চেষ্টা, থাকবে রঙীন শাড়ী খুলে সাদা থানে নিজেকে জড়ানো যুবতী বিধবার শূন্য দৃষ্টির বর্ণনা।


কিন্তু আমি তো গল্পের বিরহী নায়িকা হয়ে থাকতে চাই না। আমি তো চাই না কোনো শোকগাথা। আমার কাছে আমার ভাই, আমার মা, আমার বাবা, আমার বোন, আমার সিদ্ধার্তই সব। ওরাই আমার পৃথিবী।

ওরা আমার কাছে রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি, জগতের চেয়েও বেশি, আমার প্রাণের চেয়েও বেশি।

আর সেই প্রাণেরা, সেই সিদ্ধার্তরা পথে পথে লাশ হয়ে যাচ্ছে। সিঁথির সিঁদুর মুছে দিয়ে একেকজন চলে যাচ্ছে মর্গে; চিতায়, গোরস্থানে। কিন্তু এই যাওয়া কোনো মহৎ যাওয়া নয়। এই যাওয়া নয় একাত্তরের মত শত্রুর সঙ্গে লড়ে মৃত্যু দিয়ে কেনা আরেক নতুন জীবন।

তাহলে কেন এতো প্রাণক্ষয়!

এইভাবে শঙ্কায়, অনিরাপত্তায়, প্রতিদিন লাশ গুণে গুণে, প্রতিদিন কান্না থেকে নিজেকে আড়াল করে করে আর কতদিন!

আমরা উলোখাগড়া। রাজাদের লড়াইয়ের মর্ম আমাদের পক্ষে বোঝা ভার। কিন্তু রাজাদের কামান যখন পুড়িয়ে দেয় জনতার শোবার ঘর, তুলসি তলা, তখন আর রাজ্য কি দূরে থাকে চিন্তা থেকে?

একাত্তরে, রাজনীতি যেমন ঝড়ের হাওয়ার মত, না চাইতেই, তুমুল বেগে প্রবেশ করেছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে, এখন এই সময়টাও কি তবে তেমনি খারাপ? তেমনি তুমুল? তেমনি অনিরাপদ?

শহীদুল জহিরের উপন্যাস “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা”-এর চরিত্র আব্দুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেল একদিন পরিস্থিতির সাথে সংগতি বিধানে ব্যার্থ হয়ে যেমন ফট করে ছিঁড়ে যায়, তেমনি মাঝে মাঝে মনে হয়,আমাদেরও, অনেকেরই বোধ হয়, রাজনীতির চাপ বয়ে বেড়াবার তারটি ছিঁড়ে গেছে।

একাত্তরে মজিদের পরিবাওে ঘটে যাওয়া স্মৃতির কথা মনে করে, উপন্যাসে বর্ণিত ততকালীণ র্বতমান সময়ের ঘটনাবলী পর্যালোচনা করে, ১৯৮৬ সালে, আব্দুল মজিদ তার লক্ষীবাজারের বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে বাড্ডায় গিয়ে নতুন বসতি স্থাপন করে, তেমনি আমরাও আপাতঃ নিরাপদ কোথাও যেতে চাই। মা মুরগির মত ডানার নিচে নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে রাখতে চাই প্রিয় মুখসকল।



কিন্তু সেই রকম স্থান কি আজ আর বাংলাদেশে আছে? না-কি একাত্তরের মতনই পথ-ঘাট-লোকালয়-নিজের ঘর-পরের ঘর সবই হয়ে উঠেছে একই সমান অনিরাপদ? তাহলে আমরা আর কোথায় যাবো?

মাটির দেবতারাও আজ পুড়ে যখন ছাই, তখন নিরাশ্রয়, নিরাত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা কাতর প্রাণ হিসেবে আপনাদের দরজায় এসে মাথা কুটছি, মা! আমরা রাজনীতি বুঝি না, আব্দুল মজিদের মতন আমাদের পালানোর স্থান নেই, বিদেশ-বিঁভুইয়ে প্রিয়জনকে নিরাপত্তাবেষ্টনিতে রাখার সামর্থ্যও নেই আমাদের। তাই আক্ষরিক অর্থেই, এই পোড়া দেশই আমার মুক্তি, আমার কারাগার।

যারা আছেন রাজনীতির আরশে, তারাই আজ ত্রাণকর্তা, এই বদ্বীপের নারায়ণ। আপনাদের পায়ে মাথা কুটে মরি, হে রাজনীতির প্রভু সকল। দয়া করুণ আমাদের! আর কোনো সিদ্ধার্তকে এমন করে কেড়ে নেবেন না আমাদের বুক থেকে।

সিদ্ধার্তহীন বেঁচে থাকা কতটা কঠিণ তা দীপ্তিরা টের পায়। আর দীপ্তির বিলাপ দেখে নিজেকে দীপ্তি ভাবার আগেই আমার মনে হচ্ছে, আমার ফুসফুস ফুটো হয়ে গেছে, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চেতন হারাচ্ছি আমি, আর আমার চোখের সামনে কেমন যেনো দুলে ওঠছে অভেদ্য কুয়াশার এক পর্দা।

২৮.১২.১৩

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.