আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও একডজন রহস্য: (খালিপেটে পড়া নিষিদ্ধ)

সাবটাইটেল দেখে থমকে গেলেন?
আপনার ভালোর জন্যই বলছি। খালি পেটে এ বই পড়তে বসবেন না। আর যদি আমার ভালোমানুষি উপদেশ অগ্রাহ্য করে পড়তে বসেই যান বইটা, পেটে খিদে নিয়েই, তাহলে আপনার বিড়বিড় করা বকাঝকা আর চিড়বিড়ে মেজাজ এর দায় কিন্তু আমি নেবো না।

সবচে ভালো হয়, যদি এখনই এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসেন। তাহলে আমার সাথে আপনার মেজাজের একটা কমন গ্রাউন্ড (বা কাপ) থাকলো।


বই এর গল্প করতে এসে কেন এত খানা-পিনার কথা হচ্ছে ভাবছেন? বলছি একটু পড়েই।
আগে বরং কিছুক্ষণ দুঃখের ফিরিস্তি দেই।
ফেব্রুয়ারী মাস শুরু হতেই দেখছি আশপাশের সবাই বেশ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠছে। শীতের শেষ হতে না হতেই ফেইসবুক নিউজফিডে দেখেছি বসন্ত মাথাচাড়া দিয়েছে। কেউ পলাশ ফুলের ছবি পোস্ট করে, তো কেউ জ্যামে বসে আমের মুকুলের ছবি তোলে।

পহেলা ফাল্গুন, ভ্যালেন্টাইনস ডে আসতে আসতে চতুর্দিকে সরগরম অবস্থা। ভাষার মাস, খুব ভালো লেগেছে যখন এক তারিখ থেকেই সবার প্রোফাইল পিকচার পাল্টে হয়ে গেছে নিজ নিজ নামের বাংলা আদ্যক্ষর, নিউজফিড ছেয়ে গেছে রঙিন বাংলা বর্ণমালায়।
কিন্তু লোকজনের এসব আনন্দ আমার ভালো লাগছিল না মোটেই। বাড়ি ফিরে তাই ফেইসবুকে লগইন করি সাবধানে, নিউজফিডে একটু উঁকি দিয়েই ঝট করে চলে যাই নিজের দেয়ালে। কারণ একটাই, সেটা হোলো বইমেলা।


চাকরী এবং অজ-পাড়াগাঁয়ে বাসা, দুইয়ে মিলে অর্ধেক মাস পেড়িয়ে গেলেও বইমেলায় যাওয়া হয় নি। এদিকে কিছু পিশাচ-শ্রেণীর বন্ধু-বান্ধব প্রায় প্রতিদিন বইমেলায় গিয়ে বিকট দাঁত বের করা ছবি পোস্ট করে, অথবা মেলা থেকে কেনা রাশিরাশি- ভারাভারা বই চাদরের উপর বিছিয়ে ছবি তুলে আপলোড করে। মোটকথা, অসহ্য।
গোয়েন্দা ঝাকানাকার মোড়ক উন্মোচন হবে শুনতে পেয়েই তাই সোজা ছুটি নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে বিকেলের আগেই টুনি-বান্ধবীটাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে বইমেলা চলে গেছি। সেদিনের গল্প করে এখন আর আপনাকে দুঃখ দিতে চাই না, শুধু এটুকুই বলে থামি যে, মেলার পেয়ারাওয়ালা মামা থেকে শুরু করে হালিম বিক্রেতা চাচা পর্যন্ত, দূর থেকে দেখলেও আমাদের চিনতে পারবেন, আর সেদিন ফিরে কেনা বই এর ছবি তুলতে গিয়ে চেয়ারের উপর উঠে ফোন তাগ করতে হয়েছে বিছানায়, ছড়ানো বই নইলে ফ্রেমে আঁটছিল না।


এই কেনা বইগুলোর মাঝে সবচেয়ে নজর-কাড়া ছিল 'গোয়ন্দা ঝাকানাকা ও এক ডজন রহস্য' -র গাঢ় নীল প্রচ্ছদ। ভাগ্যিস সেদিন আগেভাগেই পৌঁছে গেছিলাম, মোড়ক উন্মোচনের আগেই দেখি দোকানে থাকা সব কপি কাড়াকাড়ি করে কিনে ফেলেছে সবাই। একটু দেরীতে এসে পৌছনো কেউ আর কিনতেই পায়নি কিছু।
রাতে শুধু ছবি পোস্ট করেই তুষ্ট থাকতে হয়েছে, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি বেশি না জেগে। গোয়েন্দা ঝাকানাকার সাথে ঠিকভাবে মোলাকাত হয়েছে পরদিন সকালে।

অফিসে যাবার পথে। আশা করি আপনার চা ঠান্ডা হয়ে যায়নি, কারণ এতক্ষণ খেঁজুরে আলাপের পর এই এখন শুরু হচ্ছে 'গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও এক ডজন রহস্য' নিয়ে গালগল্প।
সকালের আলোয় বইটা হাতে নিয়েই মন ভালো হয়ে গেল। দুর্দান্ত প্রচ্ছদ!
গাঢ় নীল সন্ধ্যার আকাশের গায়ে, একটা বিল্ডিং এর পানির পাইপ বেয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে দস্যু বদরু খাঁ -কে, মুখে উৎকট হাসি নিয়ে সে পোজ দিচ্ছে যেন প্রচ্ছদের জন্যে, জানালা দিয়ে উদ্বিগ্ন কিংকু চৌধারীকে সেটা বুড়ো আঙুল তুলে পয়েন্ট করে দেখাচ্ছেন চুরুট হাতে উপমহাদেশের সবচেয়ে মারকুটে আর বিখ্যাত গোয়েন্দা ঝাকানাকা। এদের পেছনে আকাশে ঝুলছে বাঁকা চাঁদ।

বই এর মুদ্রণ চমৎকার, প্রচ্ছদে আকাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তারার ডটগুলোও দেখা যাচ্ছে!
ছবি আঁকা দেখেই বোঝা যায়, তবু বই খুলে দেখি লেখা আছে, প্রচ্ছদঃ সুজন চৌধুরী। আমাদের অতি প্রিয় সুজনদা।
বই এর ফ্ল্যাপে দেখি প্ল্যানচেট চলছে, রীতিমত ভূতের সভা বসে গেছে, তিন বিশিষ্ট জনের ভূত এসে ঝাকানাকার গল্পের সুখ্যাতি করে গেলেন। এর মাঝে স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের ভূত দেখলাম আবার অনেক ইন্ডাস্ট্রিয়াস, তিনি রবি ঠাকুরের ভূতের কাছ থেকে বাংলা শিখে নিয়ে প্রশংসাbaNI লিখে দিয়ে গেছেন।
প্রচ্ছদ আর ফ্ল্যাপ দেখেই মুগ্ধ, পাতা উল্টে দেখি, সুন্দর হরফে ঝকঝকে ছাপায় উৎসর্গ বার্তা, 'অনুজপ্রতিম সুপারম্যান সামিউল ওয়াসেক "শাহেনশাহ" সিমনকে'।


মন আরো ভালো হয়ে গেল।
পয়লা ফাল্গুনের দিনে শুরু করে টানা পাঁচদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জ্যামে বসে পড়ে ফেলেছি সবগুলো গল্প। বইটা শেষ করেছি বদরুর মতই বিরাট এক উৎকট হাসি মুখে নিয়ে।
গোয়েন্দা ঝাকানাকার রহস্যগল্পের আমি অপেক্ষাকৃত নতুন পাঠক, নতুন কিছু গল্প পড়া থাকলেও বেশিরভাগই পড়া হয় নি। বইতে তাই সব গল্পই প্রায় নতুন আমার কাছে।


কিন্তু ছাপার হরফে, গল্পগুলোর যেন চেহারাই ফিরে গেছে! ব্লগে যে গল্প পড়া আছে, বইতে সেগুলো পড়তে আরো অনেক উপভোগ্য হয়েছে।
এবং এর কারণও আমি ভেবে বের করেছি।
গোয়েন্দা ঝাকানাকার গল্প গুলো ঠিক আলো-আঁধারি ভরা থ্রিলার নয়, গল্পে রহস্য তো আছে বটেই, কিন্তু আরো যেটা আছে সেটা হচ্ছে একটা নিজস্ব রকমের মজলিশী মেজাজ। সত্যজিৎ রায়ের তারিণী খুঁড়োর গল্প যারা পড়েছেন তারা জানেন, ওই গল্পগুলোতে একটা আলাদা রকম আমেজ আছে। যেন চা, কিন্তু ঠিক চা নয়, মশলার ফোড়ন দেয়া সুবাসিত চা।


এই মুচমুচে কুড়মুড়ে মেজাজটা, কম্পিউটার স্ক্রিনের চাইতে হাতে ধরা বইয়ের কাগজে খোলতাই হয়েছে বেশি।
চায়ের কথা যখন উঠলোই তখন বলি কেন আপনাকে খালিপেটে বই পড়তে নিষেধ করছিলাম। গোয়েন্দা ঝাকানাকা, তার অ্যাসিস্ট্যান্ট কিংকু চৌধারী, এমনকি তাদের সন্দেহভাজনদের তালিকায় থাকা নিত্যনতুন অভাজনদের সকলেরই মারাত্মক চায়ের নেশা! এক 'গোঁফ চুরি' গল্পেই সবাই মিলে জিজ্ঞাসাবাদের টেবিলে কয় কেতলি চা খেয়ে উজাড় করলো তার হিসেব রাখতে হিমশিম খেতে হয়েছে। তাই পড়তে পড়তে একটু পর পরই মন উশখুশ করতে থাকে চায়ের জন্য।
ইনফ্যাক্ট গল্পগুলো পড়তে গিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জিনিস খাবার জন্য ব্যাকুল হতে হয়।

সবচেয়ে বেশি খেতে ইচ্ছে করে আচারের তেল, চানাচুর আর শসাকুচি দিয়ে মুড়িমাখা। মাঝে মাঝে বেলা বিস্কুটে কামড় দেয়ার জন্য প্রাণ ছটফট করে, সমুচা, সিঙারা, রুটি আর কাবাব তো আছেই। সবচেয়ে ঝামেলা হয় যখন মাঝরাতে হঠাৎ করে ল্যাংড়া আম বা পরোটা দিয়ে ভুটানি কবুতরের কলিজা ভুনা খাবার খায়েশে ঘুম বরবাদ হয়।
তাই বলছিলাম, বুদ্ধিমান পাঠক, ভরপেট খেয়ে, নিদেনপক্ষে দুই ফ্লাস্ক চা এবং এক প্যাকেট বেলা বিস্কুট নিয়ে গল্প পড়তে বসলে সবদিক থেকেই সুবিধা।
চা-বিস্কুটের অত্যাচার বাদ দিলে, গল্পগুলো চমৎকার।

সব গল্পই সমান মানের নয়, কিছু কিছু মোটামুটি , কিছু কিছু ভালো, আর বেশ কয়েকটা দুর্দান্ত ভালো গল্প আছে। আমার খুব, খুব পছন্দের লিস্টে আছে 'মিস্টার অ্যান্ড মিসেস হাফমজুর হত্যা রহস্য', 'গোঁফ চুরি রহস্য', 'অজ্ঞান পার্টি রহস্য', 'গোয়েন্দা বদরু খাঁ ও ফেডারেল বিটকেল ইউনিয়নে জাল ভোট রহস্য', 'জাঙ্গিয়া (আহেম!) রহস্য' এবং ' পিসুনচ্ছাড় (আহেম আহেম!) রহস্য'।
এক এক গল্প এক এক কারণে বেশি পছন্দ, কিন্তু দুটো গল্প পছন্দ হবার পেছনের কারণ উল্লেখ করতে ইচ্ছা করছে। 'গোঁফ চুরি' গল্পটা পছন্দ এটার বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনার জন্যে। হাসিঠাট্টার মাঝেই চমৎকার করে ধরা পড়ে গেছে আপাতদৃষ্টে সৎ/মহৎ প্রতিষ্ঠানের বড় ধরণের পুকুর চুরির একটা উদাহরণ।

এমনকি আশেপাশের অতি সরল 'অসৎ সনাক্তকরণে অপারগ' ব্যক্তিদের জন্য গল্পটা একরকম 'ইন্ট্রোডাকশন টু সুবিধাবাদী পলিটিক্স' হতে পারে।
মিস্টার এবং মিসেস হাফমজুর হত্যা রহস্য পছন্দ হবার পেছনে আলাদা করে কোন কারণ লাগে না, সঙ্গীতের প্রতি খানিকটা ভালোবাসা থাকলেই এ গল্প পছন্দের তালিকায় উঠতে বাধ্য। গল্পের একটা চরিত্রের সাথে আমি এতই সহমত যে গল্পে 'শরিয়তুন্নেসা টাইফুন' এর নাম পাল্টে 'সুরঞ্জনা হক' লিখেও দিব্যি চালিয়ে দেয়া যাবে।
ঝাকানাকা আর কিংকু চৌধারীর কথাবার্তা অনেক শুনতে পাওয়া গেলেও, বদরুর ব্যাপারে কৌতূহল খুব সহজে মেটানো যায় না। বদরু খাঁর চরিত্র খানিকটা বোঝা গেছে বই এর শেষ গল্প 'জাঙ্গিয়া (আহেম!) রহস্য তে এসে।

আশা করি এর পরের গল্পগুলোতে বদরুর বদ বুদ্ধিগুলোর কিছু কিছু তার নিজ মুখেই শুনতে পাওয়া যাবে।
দেখেছেন, আপনার চা ঠান্ডা হতে হতে শেষ ও হয়ে গেল অথচ আমি বইটার আসল বৈশিষ্ট্য নিয়েই কিছু বললাম না এখনো!
বইয়ের সবচাইতে আকর্ষণীয় উপাদান হচ্ছে, এর ঝাঁঝালো হাস্যরস।
আপনার রসবোধ সূঁচের মত সূক্ষ্ম হোক, বা কোদালের ফলার মত স্থূল, সে ধারেই কাটুক বা ভারেই, গল্প পড়ে হাসতে আপনাকে হবেই। রসবোধ না থাকলে অবশ্য আলাদা ব্যাপার, সে ক্ষেত্রে রসের সন্ধান খেঁজুর গাছের কাছে করাই শ্রেয়। ব)
বহু কথার পর যে কথাটা না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে, বইটা দেখতে হয়েছে খুব সুন্দর।

বাংলায় পেপারব্যাক এর আগে পড়িনি, এটা দারুণ হয়েছে। ছাপার মান অত্যন্ত ভালো, যদিও বেশ কিছু টাইপো চোখে পড়েছে, তাও বই সাজানোর ক্ষেত্রে মনোযোগ আর যত্নের ছাপ চোখে পড়েছে। সুন্দর একটা বই পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য লেখক, প্রকাশক, অলঙ্কারক, সকলকে অনেক ধন্যবাদ।
শেষ করি বই এর উপক্রমণিকা থেকে এক লাইন উদ্বৃত করেঃ
ছোটো-বড় সকল পাঠক-পাঠিকাকে ঝাকানাকার উদ্ভট রহস্যের জগতে স্বাগতম।

***

[পুনশ্চঃ গল্পের নামে যে রহস্য আছে, সেটা কিন্তু আমি ভেদ করেছি।

]

সোর্স: http://www.sachalayatan.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.