আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

প্রতিবাদী তন্বী লুসি ( ছোট গল্প, কাল্পনিক )....................বিবিবাঁধন

সাধারন মানুষ লুসি মনে মনে ওর নেক্সট মিশনটার বিভিন্ন দিক নেড়ে চেড়ে দেখছিল। মিশনটা যেহেতু যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে ও যখন একটি একা ও উদ্দিপক তরুণী মেয়ে, সে ক্ষেত্রে কি কি প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে এবং এলে ও কি করে সেগুলি সামাল দিবে তাও ভাবছিল। ওর আইডল হচ্ছে এমন সব প্রতিবাদী মানুষ, যারা চোখে দেখা যায় এমন অন্যায় এর বিরুদ্ধে আমরণ অনশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এদের একজন অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করে দেন, তবে উনি প্রভাবশালী এবং ওনার অনেক ভক্ত থাকায় ওনার দাবি মেনে নিয়ে সবসময় ওনার অনশন ভাঙ্গান হয়। আর একজন আছেন জীবনভর প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন ঘোষণা দিয়েছেন, এবং গত এক যুগ উনি কিছুই খান নাই, শুধুমাত্র স্যালাইনে নির্জীব বেঁচে আছেন, এবং তিনি একজন নারী!!!! ভক্তিতে লুসির হৃদয় নুয়ে আসে মানুষগুলোর প্রতি, লুসি ভাবে মানুষকে কতটা ভালবাসলে এমন আত্মত্যাগ করা কারো পক্ষে সম্ভব হতে পারে।

লুসি নিজেও তাই প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওর মত করে, এবং ও ওর ভাবনা ছড়িয়ে দিতে চায় সর্বত্র। এটাই ওর মিশন আর কাল থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে ওর এই পরীক্ষা। কাল সকাল সকাল কাজটা শুরু করবে, তাই ঘুমিয়ে পরা ভাল ভেবে ও লেপ টেনে শুয়ে পরল, ওর চেহারায় আত্মতৃপ্তির আভাটা ও দেখতে পেলনা যদিও। লুসি বরাবরি টম বয় টাইপ। ওর বয়স যখন মাত্র ১৪ তখনি ওকে যুবতীদের মত দেখাত, ওর ফিগার তখন ৩২-২৬-৩৪।

বিকালে যখন ফ্ল্যাট বাসার নিচে পিচ ঢালা কাল কুচকুচে রাস্তায় অন্য মেয়েরা স্রেফ হাঁটত আর গল্প করত ও তখন ছেলেদের সাথে মাঠে,ক্যাপ পড়ে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় ব্যস্ত থাকত। ফুটবলে গোলকিপার আর ক্রিকেটে উইকেট কিপার এর জায়গা ওর বাঁধা ছিল। বড়রা বারণ করে করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, শুনত কে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ওর এই পাগলামো চালু ছিল। ছেলেদের রোম্যান্টিক দৃষ্টিকে ও তখনও পাত্তা দিত না।

বান্ধবীর দেখাদেখি যখন ও বিদেশে আরও পড়াশোনা করতে গেল, তখন ক্লাস মেট মিঠুর কান্না দেখে গলে গিয়ে ও ওর প্রেমে পরে গিয়েছিল আর বিয়েও করে ফেলেছিল কাউকে কিছু না জানিয়ে। দেশে ফিরে যখন বাসায় জানাল ঘটনাটা, ওকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিল ওর বাবা, ওদিকে ছয় মাস সংসার করেই অসহ্য লাগায় মিঠুকেও ছেড়ে দিয়ে আবার বাবার বাসায় চলে এলো ও, সেও বছর খানেক হয়ে গেল, সেই থেকে ও একা। একটু ওজন বেড়েছে ওর আগের চেয়ে, ওর ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স এখন ৩৬-২৮-৩৪ আর ঝাড়া সাড়ে পাঁচফুট লম্বা ও। মাঝে মাঝে সুন্দর ছোট্ট বাবু দেখলে ওর নিজের করা এবরওশন এর কথা মনে পড়ে যায় আর ভাবে ওরও এমন একটা ফুটফুটে ছোট্ট সোনামণি থাকতে পারত। মিঠুকে যদিও এখন আর মিস করেনা ও।

ইন্টারনেট নিয়েই কাটছিল লুসির দিন। নিজে কম্পুটার এর ছাত্রী হওয়ায় এর সবচেয়ে ভাল ব্যবহার জানত ও। হঠাৎ ব্লগে প্রতিবাদী এই মানুষগুলোর কথা পড়ে ও যেন উপলব্ধি করল নিজ দেশের জন্য ওর ও কিছু করার আছে, বিদেশের সাথে তুলনা করে নিজ দেশের মানুষকে অনেক অসহায় আর নিপীড়িত মনে হল ওর। ভেবে দেখল কিছু দুর্নীতি পরায়ন মানুষের জন্য আজ ওর দেশের কোটি লোক দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। প্রতিবাদ জানানোর কথা মাথায় এলো ওর, কিন্তু ভেবে দেখল ও যেমন অস্থিরমনা ওর পক্ষে দীর্ঘ দিন ধরে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবেনা।

তাই চমক লাগান প্রতিবাদের ভাষা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ও ওর মিশন সেট করল। মাইনাসে মাইনাসে প্লাস সুত্র ধরে ওর প্লান এগিয়েছে। ও ভেবে দেখেছে মানুষ নিজে অপরাধ করলেও অন্য অপরাধীকে পছন্দ করে না। তাই ও জঘন্য সব অপরাধের ভিডিও করে ইন্টারনেটএ ছড়িয়ে দেবে ঠিক করল যা দেখলে ঘৃণায় মানুষের গা রি রি করে উঠবে, মানুষ বাজে কাজকে ঘৃণা করতে শিখবে। কাজ হোক বা না হোক ওর প্রতিবাদ জানানর স্পৃহা যে এতে নিবৃত হবে এই বিশ্বাস থেকে ও ওর মিশন সাজিয়ে নিল।

আশে পাশে তাকিয়ে ও দেখল মানুষের লোভ, লালসা, স্বার্থপরতা, হিংস্রতা অর্থহীন আর এতে অন্য মানুষ অনেক কষ্ট পায়, কখনবা যুগ যুগ ধরে, সারা জীবনও। ও লিস্ট করল প্রতিবাদ জানিয়ে কি কি অপরাধ ও করতে পারবে। ও তো আর সরকারী চাকরি করে না যে ও ঘুষ খেয়ে সেটা প্রচার করে প্রতিবাদ জানাতে পারবে। তাই ওর লিস্টে ও সেগুলোই রাখল যা ও ওর সংগ্রহ করা বখে যাওয়া কিছু ছেলেদের মাধ্যমে করতে পারবে। ও ব্যবহার করেছে ওর কলেজ এর বন্ধু পল কে, পল ওর ভাল বন্ধু ছিল বরাবর,সবাই জানত পল বখে যাওয়া ছেলে, ও মেশেও বখে যাওয়াদের সাথে, কিন্ত পড়াশোনায় ভাল বলে সরাসরি কেউ ওকে কিছু বলতে পারত না।

পলের সাথে ও ওর আইডিয়া শেয়ার করল, প্রথমে পলের আক্কেল গুড়ুম হলেও লুসির দৃঢ়তার কাছে হার মেনে পল নিজে ঝুঁকি নিয়েই লুসিকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে এ মিশনটায়, বরাবরের মত লুকিয়ে গেছে লুসির প্রতি ওর প্রবল আকর্ষণ। পল ভালই চেনে লুসিকে, জানে ও সাহায্য না করলে অন্য কারো কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে ও ঠিকই পূর্ণ করবে ওর মিশন। এক মাস পর কোন এক শুক্রবারে..................... গত এক মাসে লুসি ওর মিশন প্রায় শেষ করে এনেছে। ও এর ভেতরে যা যা অপকর্ম করেছে ভাবতেই ওর হাসি পায়, রোমাঞ্চিত হয় ও। বারে বারে মিলিয়ে দেখে নেয় ও কিছু করা বাদ পড়ে গেল কিনা।

ও শুরু করেছে এক গরীব ফল বিক্রেতার পুরো ঝুড়ি সহ ফল চুরি করা দিয়ে। আগে করা প্ল্যান মত ও ফল ওয়ালার সামনে ঝুঁকে ডালিম দেখছিল, খেয়াল করছিল ফলওয়ালা হা করে ওর ক্লীভেজ দেখায় ব্যস্ত। এর পরে ও যখন দুকেজি ডালিম কিনে হাজার টাকার নোট দিল, ৫০-৫৫ বছরের বেচারা ফলওয়ালা বিনা বাক্য ব্যয় এ, যেন ঘোর লাগা চোখে ঝুড়িটা রেখে পাশের টং দোকানে টাকা ভাঙাতে গেল, একটু আড়াল হতেই পল গাড়ী নিয়ে এলো, ওর সাথের ছেলেটা ঝুড়িটা তুলল পেছনে, তখনও দেখা যাচ্ছেনা ফলওয়ালাকে, গাড়ী নিয়ে লুসিরা হাওয়া। পুরো দৃশ্যটা চায়না টাউন থেকে লুসির কেনা কলম আকৃতির একটা ক্যামেরায় ভিডিও করছিল কামাল নামে আর একটা ছেলে। প্ল্যান মত সহানুভূতির ছলে ফল ওয়ালার বস্তির বাড়ীতে গিয়ে দেখে এসেছে অনেক গুলি ছেলেপিলের সংসারে রান্না হয়নি সেদিন, বেদম মার খেল শুধু শুধু ফলওয়ালার বৌটা ওর কাছে।

এটা ছিল শুরু, এর পরে ও একে একে পথিক কে ছিনতাই করেছে দল বেঁধে, হিরোইন খেয়েছে, প্যাথেড্রীণ নিয়েছে সিরিঞ্জ এ ভরে আর ফেনশীডীল খেয়ে এসেছে স্পট এ গিয়ে। এর পরে একটা ছিনতাইকারীকে ডেকে অমানবিক ভাবে মেরেছে, ছোকড়া ছিনতাইকারীকে মারার সময় পুরো অশুভ শক্তির উপর জমে থাকা রাগ যেন মার হয়ে নেমে গিয়েছে। পীছমোড়া করে বেঁধে কাঠ দিয়ে মেরেছে ছেলেটাকে, শুরু করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতও না ও নিজে এমন কিছু করতে পারে। সব কিছু সুন্দর ঝক ঝকে ভিডিও করে রেখেছে লুসি। যে কেঊ দেখলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারবে না, শিউরে ঊঠবে বীভৎসতায়।

প্ল্যান মত ওর মুখ সহ সারা শরীর স্পষ্ট করে দেখিয়েছে লুসি, এটাই ও চায়, মানুষ যেন ওর চেহারার আভিজাত্য ও লাবণ্য দেখে বুঝে নিতে পারে অভাব বা অন্য কিছু নয়, বরং প্রতিবাদ করা হচ্ছে ওর একমাত্র উদ্দেশ্য। অন্যদের মুখ ও ঝাপসা করে দিয়েছে ভিডিওতে, যেন চেনা না যায়। আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে লুসি। দুধেআলতায় ওর গায়ের রঙ। বড় বড় মায়াবী দুচোখে কাজল টেনেছে, প্লাগ করা ভ্রু আরও এঁকে নিয়েছে, শ্যাম্পু করা দীর্ঘ মসৃণ কাল চুলে স্প্রে করেছে, কপালের ওপরে দু-গাছি চুল বারগুণ্ডি কালারে হাই লাইট করা।

গোলাপী ঠোঁটএ দিয়েছে রক্ত লাল লিপস্টিক। ওর চোখে মুখে আত্মত্যাগের দীপ্তি। শ্লীভলেস ব্লাঊজ এর সাথে লাল রঙের জর্জেট শাড়ী পড়েছে, মনে মনে ভাবছে অপ্সরারা কি এর চেয়েও সুন্দর ও আকর্ষণীয়া হবে, নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে মন চাইলো ওর খুব। ও জানে ওর শারীরিক গঠন সুন্দর ও সুঠাম, ছেলেদের কাছে ও কতটা ঈপ্সিত, তা ও কখনোই বুঝতে পারেনা যদিও কিন্তু আজ ওর নিজেকেই নিজের ভালবাসতে ইচ্ছা হল। নিপীড়িত আর অপমানিত মানুষের কথা ভেবে লুসির মুখের পেশী শক্ত হয়ে গেল নিমেষেই, ও বুঝতে পেরেছে ও নিজেকেও কোটি মানুষের সাথে সাথে বঞ্চিত আর অপমানিত মনে করে, যারা মনুষ্যসমাজের সুবিধা বঞ্চিত, অশিক্ষিত, নিষ্পেষিত মানুষ, তাদের চেয়ে ওর জ্বালা বেশী হবার কারণটাও ও বুঝতে পারল, কারণ দেশবিদেশে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা থেকে ও বুঝতে পারে মানুষে মানুষে ফারাক কত বেশী, আর কত বিস্তৃত বৈষম্য।

বিবেকবান মানুষের চোখেতো ধনী আর নির্ধন একি মানুষের দুটি চোখ, একটি চোখ যদি কাঁদে, অন্য চোখ কি সুখে হাসতে পারে কখনও; এসব ভাবছিল লুসি। ভাবছিল সে যা করছে ঠিকি করছে, অনেকের তুলনায় এই প্রতিবাদ কিছুই নয়। তবে আজ তার শ্রেষ্ঠ বলিটা দেবে লুসি। আজ সে ব্যভিচার করবে। অবাধ যৌনতায় মেতে ঊঠবে আজকে পল এর সাথে, নগ্নতাকে পৃথিবীর সামনে উপস্থিত করে বুঝিয়ে দেবে দুনিয়াকে- বাস্তব কত নিষ্ঠুর আর প্রতিবাদের ভাষা কত শাণিত ও তীক্ষ্ণ হতে পারে।

যারা ওর এই ভিডিওগুলি দেখবে তারা বিবেকবান হলে কাঁদবে, প্রতিজ্ঞা করবে অন্যায় কে পালন না করে দমন করার রাস্তা খুঁজবে বলে, আর যারা অপরিণত, তাদের কামনার দৃষ্টি লুসিকে লজ্জিত করবে বটে, কিন্তু সেটাই ওর আত্মত্যাগ ও প্রতিবাদ, ভাবল লুসি। একটা হোটেল এ ঊঠেছে লুসি, পল বাইরে গিয়েছে খাবার এর অর্ডার দিতে, ফিরে এলেই সেই শেষ নোংরা ভিডিওটা করা শুরু হবে। এই মুহূর্তে, এই প্রথম যেন একটু অস্বস্তি বোধ করল লুসি, ক্যামন যেন একটু শঙ্কার অনুভূতি হল। পলের কথা ভাবতে শুরু করলো ও। এটা ঠিক পল সাহায্য না করলে ও ঠিকি অন্য কারো মাধ্যমে ওর মিশনএর কাজগুলো করিয়ে নিত, ও জানে ওর হাস্যময়ী মুখের অনুরোধ কেঊ ফেলতে পারে না।

কিন্তু পল ছাড়া ওর এই মিশনটা সফল হতে পারতনা এটাও ও জানে। ওহ হঠাৎ পুলিশ এর সাইরেনের শব্দ চমকে দিল লুসিকে। হুড়মুড় করে রুমটায় চলে এলো অনেকগুলি পুলিশ, ওদের এক জন পল এর চুল খামচে ধরে রেখেছে, ওর হাত পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাপ পরানো। ও চীৎকার করে বলছে, ''লুসি ছিনতাইকারী ছেলেটা মারা গেছে, আমাকে ভুল বুঝনা, আমি তোমাকে ভালবাসি লুসি, জেল থেকে বের হয়ে সম্ভব হলে বিয়ে করতে চাই তোমাকে। '' একজন পুলিশ অফিসার চীৎকার করে উঠল 'ইউ আর আন্ডার এরেস্ট বিচ' বলে।

লুসির ঠোঁটের কোনায় হাসি, সবচেয়ে কড়া প্রতিবাদের ভিডিওটা তৈরি না হলেও আগের সব ভিডিওগুলি ও এডভান্স ডেট এ পোস্ট করে এসেছে প্রিয় ব্লগ এ, কালকেই সারা দুনিয়া যেনে যাবে লুসির যথাসাধ্য প্রতিবাদ। ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.