আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

একদিন বিদিত লাল দাশ

বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুন্য হউক, পুন্য হউক, পুন্য হউক, হে ভগবান। বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ, পুর্ন হউক, পূর্ন হউক, পূর্ন হ্‌উক, হে ভগবান। রবীন্দ্রনাথ ‘কবর জিয়ারত করিয়া / দোওয়া করিবায় / দরবারে খোদায় মাফ করিয়া দিও আল্লায়/ গিয়াস পাগেলায়। ’ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ। সিলেট শহর ১৯৮২ সালের জুলাই মাসের এক মেঘলা মধ্যাহ্নে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছিল ; ভিজে যাচ্ছিল সিলেট শহরের রাস্তাঘাট; মাঠ-গলি-ময়দান।

শহরটির শেখঘাটের একটি অতি পুরনো দালানের বৈঠকখানার মেঝের কার্পেটের ওপর বসে তন্ময় হয়ে বৃষ্টির ঝিরঝির শব্দ শুনছিলেন বিদিত লাল দাশ। তাঁর ৪৭ বছর বয়েসি দীঘল শরীরটি স্তব্দ। ভরাট মুখে পুত্রশোকের চিহ্ন স্পষ্ট। তাঁর পরনে সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি, চোখে রূপালি ফ্রেমের চশমা। সৌখিন মানুষ বলেই গলায় সব সময় একটি সোনার চেইন পরেন।

তবে এই শোকার্ত সময়ে আর সেটি পরছেন না। মেঝের ওপর পাতা কার্পেটটি পুরনো। এক সময় কার্পেটের রং যে ঘন নীল ছিল তা বোঝা যায়। কার্পেটের ওপর একটি কালো রঙের ডবল রিড- এর মিনি বোম্বে কির্তন হারমোরিয়াম। বিদিত লাল দাশ যেন অনেকটা অন্যমনস্ক হয়ে হারমোনিয়ামের সাদাকালো রিড-এ আঙুল বুলিয়ে ভীমপলশ্রী রাগের সুর তুলছিলেন: ণ্ স জ্ঞ ম প ণ র্স ... তিনি এই মুহূর্তে বিষন্ন হয়ে ভাবলেন-ভীমপলশ্রীর বিষাদিত সুর ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ- এর অত্যন্ত প্রিয় ছিল।

শান্ত্রীয়সংগীতের ভান্ডারে যা কিছু ছিল আমৃত্যু ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ তাঁর প্রিয় শিষ্য বিদিত লাল দাশকে উজার করে দিয়েছেন । তবে বিদিত লাল দাশ- এর মার্গসংগীতের গভীরতম প্রদেশে আর যাওয়া হয়নি। লোকসংগীতের অমোঘ আকর্ষনে গাজির গান , মালজোরা, পির-মুর্র্শিদি, দেহতত্ত্ব, ভাটিয়ালি, জারিসারি, বিচ্ছেদী, রায় বিচ্ছেদ, শ্যাম বিচ্ছেদ, মঙ্গলা, গুষ্ঠ, ফিরা গুষ্ঠ, নৌকাবাইচ, ধামাইল- এসব লোকজ গানেই অবগাহন করেছেন। বাংলার মরমি গানের ভাবদর্শন তাঁর হৃদয়কে মথিত করে রেখেছে। সিলেট অঞ্চলে অনেক মরমি সাধক ছিলেন।

(এখনও আছেন। ) আরকুম শাহ, কালা মিয়া, মুন্সি ইরফান আলী। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন সাধক, দরবেশ ও গীতিকবি। সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৯৭ জন মরমি কবির গান বিদিত লাল দাশ -এর সংগ্রহে রয়েছে। এঁদের গানের মর্মার্থ বোঝা অত্যন্ত কঠিন।

বিদিত লাল দাশ বিশ্বাস করেন, ... এঁদের গান চর্চা করলে ঈশ্বর-সাধনা হয়ে যায়। মার্গসংগীতেও ঈশ্বর সাধনা হয় ঠিকই। তবে মাতৃভাষার মিঠা বুলি আর বিবাগী সুর মন বড় বেশি কাড়ে ... জানালায় বৃষ্টির শব্দ আর ভীমপলশ্রীর বিষাদিত সুরে আমার শোক ঘনীভূত হয়ে উঠতে থাকে। গত বছর আমার ছোট ছেলে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। নীলম-এর বয়েস ছিল চার।

তারই স্মৃতিরক্ষায় আমি এই পৈতৃক বাড়িতেই প্রতিষ্ঠা করেছি ‘নীলম লোক সংগীতালয়’। তিন বেলায় শিক্ষার্থীরা গান শিখতে আমার কাছে আসে। আজ আর এই মেঘলা দুপুরে ছাত্রছাত্রী কেউ আসেনি। আকাশের যা অবস্থা তাতে আসবে বলেও মনে হয় না। ওরা এলে ওদের গান শেখালে আমার শোকশূন্য হয়ে যায়।

আমার বুকে তখন বিষাদ জমে না। আজ আমার একা একা দুঃখ পাবার দিন। গতকাল সুবীর এসেছিল । সুবীর- সুবীর নন্দী। ঢাকায় সংগীতমহলে দিনদিন ওর কদর বাড়ছে।

আর বাড়বেই না কেন-সিলেটের ওই গানপাগল যুবকটির কন্ঠে যে মধু আছে। তা ছাড়া সুবীর যথেষ্ট বিনয়ী। ওর সাফল্য অবধারিত। সংগীত বিষয়ে আমি যা যা জেনেছি, সব ওকে উজার করে শিখিয়েছি। দিন কয়েক আগে আমি ওকে বললাম, বাংলার লোকসংগীত সাধানায় লাভ কী জান সুবীর।

বলুন, শুনি। এতে তোমার ঈশ্বর-সাধনা হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকদিন আধ ঘন্টা কিংবা এক ঘন্টা করে বাংলার লোকসংগীত সাধনা করো, দেখবে যে তুমি প্রার্থনার কাছাকাছি পৌঁছে গেল। এই কথা শুনে সুবীর আমার পদধূলি গ্রহন করল ... এই বিষন্ন বর্ষার দিনে আমার মনে আজ বারবার নীলম- এর নিষ্পাপ মুখটি মনে পড়ে যা্চ্ছে। নীলম ছিল আমার আর কনক -এর চোখের মনি।

আমাদের যাদুধন। তাকে হারিয়ে আমার বুকে সারাক্ষণ কী এক শূন্যতার হাহাকার ঘুরপাক খায়। হে ঈশ্বর, আমায় তুমি এত গভীর দুঃখ দিলে? আমার পুত্রের মৃত্যুশোক আর গভীর বেদনা বহনে আমি অপারগ হে ঈশ্বর । আমি ওর শোক ভুলতে কখনও গানের সুরে, কখনও স্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন আমার দীর্ঘশ্বাস আর শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ে শেখঘাটের শত বছরের পুরাতন এই রংহীন আস্তরহীন জমিদার বাড়িতে ... কিন্তু, কিন্তু, এ বাড়ি দেখে কে বলবে এ দালান একদা শত মানুষের ভিড়ে গমগম করত।

সিলেট অঞ্চলে আমার ঠাকুর্দার জমিদারি ছিল। ১৯৬৫ সালে আইয়ুব শাসনের আগ পর্যন্ত এ বাড়ির ঈর্ষণীয় রমরমা ছিল। দূর্গাপুজার সময় লখনৌ শহর থেকে বাইজীরা আসত; তারা গানবাজনা করত। আমার বাবা ছিলেন ফিলমের ডিষ্ট্রিবিউটর আর আসাম সংসদের সদস্য। আজ আর সেই জুরীগাড়ী নেই, সেই নফর-নায়েব-বাঁদী-গোলামও নেই, সেই পোষা বুলবুলিও নেই।

কেবল ঘুলঘুলিতে অলস পায়রাগুলি পাখা ঝাপটায়। কিন্তু, এ বাড়ি দেখে কে বলবে ১৯৪৬ সালে এই বাড়িতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা পন্ডিত জওহরলাল নেহরু এসেছিলেন? আমার বাবা সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও তাঁর চোখে ছিল পাকিস্তানের স্বপ্ন। করতেন মুসলিম লিগ । আর আমি? আমি পরবর্তীকালে গেয়েছি- সিলেট প্রথম আজান ধ্বনি বাবায় দিয়াছে ... কিংবা; কবি দিলওয়ার সাহেবের এই গানটি রহমতের নদীয়া তুমি রহমতের নদীয়া, দয়া করো মোরে হজরত শাহজালাল আউলিয়া। ১৯৪৬ সালে আমার বাবাকে আসামের সংসদ সদস্যের টিকিট দিতেই আমাদের এই বাড়িতে নেহরু এসেছিলেন।

এসব ভাবলে আজ আমার বড় আশ্চর্য লাগে ...যখন ...যখন বর্তমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর কালো ছায়া পড়েছে। অ-গনতান্ত্রিক পথে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হচ্ছে। গত বছর (১৯৮১) তিরিশ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বর্তমানে বংলাদেশের হর্তাকর্তা হয়ে বসে আছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। এ বছর ২৪ মার্চ তিনি নিজেকে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ঘোষনা করেছেন।

সর্বত্র কানাঘুঁষা শোনা যাচ্ছে এরশাদই নাকি অতি শীঘ্র বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে তাহলে কী দাঁড়ায়? বিদিত লাল দাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ... তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মের প্রত্যাশায় দিনরাত খেটে মরেছেন; যে রাষ্ট্র জনগণকে দেবে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, যে রাষ্ট্র করবে মানুষের অন্নবস্ত্রের সংস্থান ; একটি শোষনহীন, বৈষম্যহীন এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে রাষ্ট্র দেবে নেতৃত্ব। অথচ ... অথচ স্বাধনীতার মাত্র দশ বছরের মাথায় সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এমন গভীর হতাশা, অ-গনতান্ত্রিক আচরণ এবং গভীর নৈরাশ্য দেখতে হবে তা কে জানত ... । বাংলাদেশ তো তাহলে আইয়ুব শাসনেই ফিরে গেল! হায়! যে স্বৈরাচারি আইয়ুব শাসন আমাদের সম্পদ গ্রাস করেছিল।

এককালে জকিগঞ্জ এবং সিলেট শহরে আমাদের বিস্তর জমিদারি ছিল। যার অধিকাংশ সম্পদ পাকিস্তানি শাসামলে বেহাত হয়ে গেছে। অবশ্য অনেক সম্পদ আমরা বিক্রিও করে দিয়েছি । বিস্তর সম্পদ দানও করেছি। সিলেট সরকারি স্কুল, মধুবন মার্কেট, কুদরত উল্লাহ মসজিদ চত্বর এবং স্টেশন ক্লাব -এসব আমাদেরই দান করা জমির ওপর গড়ে উঠেছে।

আমরা দান করেছি এই ভেবে যে ... কি হবে ঘরবাড়ি সহায়-সম্পদ দিয়ে? সবই যে শূন্য ... হায়! এই শূন্যতায় আমি আমার যাদুধন নীলমকে হারালাম। কবে যেন নির্মলেন্দু চৌধুরীর কন্ঠে শুনলাম হাসন রাজার গান? লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি বালা নায় আমার, কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যেরও মাঝার। এই গানটি শুনে আমি এতই অভিভূত হয়ে যাই যে শাস্ত্রীয় সংগীত ছেড়ে জীবনভর হাছন রাজার গান গাইব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাস। কবে যেন? কবে ... আমার শরীরের শিরা-উশিরায় যে রক্ত বইছে তাতে রয়েছে সংগীতের অদৃশ্য স্বর। আমার বাবা গান করতেন; মা বাজাতেন সেতার ।

সাত বছর বয়েসে গুরু প্রাণের দাশ- এর কাছে আমার গানের হাতেখড়ি হয়েছিল। তবে তাঁর কাছে বেশিদিন শেখা হয়নি। যে বছর আমাদের এই শেখঘাটের বাড়িতে পন্ডিত নেহরু এলেন ... সে বছরই (অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে) বাবা আমাকে আর আমার ভাইকে সিলং নিয়ে গিয়ে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন । সিলং থেকে সিলেট ফিরে এলাম ১৯৫৮ সালে । আমাদের সঙ্গে ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ।

ভারতীয় মার্গসংগীতে তালিম আমি তাঁর কাছেই নিয়েছি। তবে লোকগানেই আমার নিয়তি ঈশ্বর নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন । ১৯৬২ সালে ঢাকা রেডিওতে অনুষ্ঠান শুরু করি। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বর্ণালী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথম বাংলাদেশের মানুষ আমার কথা জানতে পারে। অবশ্য তার অনেক আগেই নির্মলেন্দু চৌধুরীর কন্ঠে হাছন রাজার গান শুনে আমি হাছন রাজার গানে মগ্ন হলাম।

বাংলার মরমি লোকগানের যাদুতে আমি তখন আচ্ছন্ন । হাছন রাজার বাড়ি গিয়ে ‘হাছন উদাস’ বইটি নিয়ে এলাম। গাইলাম - হাছন রাজায় কয় আমি কিছু নয় রে/ আমি কিছু নয় অন্তরে বাহিরে দেখি শুধু দয়াময় ... আমি তখন এই গান গাই আর কান্দি। সাহস করে উজান ধল গ্রামের শাহ আবদুল করিম এর একটি গান সুর করলাম। প্রাণ কান্দে মনো কান্দেরে, কান্দে আমার হিয়া, হায়রে দেশের বন্ধু বৈদেশ গেলো আমায় ফাসরিয়া রে।

হায়! আজ আমি নীলম- এর জন্য কান্দি। ওর এলোমেলো লালচে চুল, সফেদ রং, টলটলে চোখ, আধো আধো বোল। কত স্বপ্ন ছিল নীলমকে গান শেখাবো। হাছন রাজার গান, রাধরমনের গান, উকিল মুন্সির গান, রশীদ উদ্দিনের গান, শীতালং শাহের গান, দূরবীন শাহর গান, শাহ আবদুল করিমএর গান, ক্বারি আমির উদ্দিনের গান ...হায়! ঈশ্বর আমার স্বপ্ন সার্থক করলেন না ! হাছন রাজায় কয় /আমি কিছু নয় রে/ আমি কিছু নয়/ভিতরে বাহিরে দেখি/ শুধু দয়াময় ... এই কথায় আমার মনে প্রশ্ন জাগে ... নীলম কি আমি? কিংবা আমিই নীলম? মেঘলা অপরাহ্নে পুরনো জমিদার বাড়িতে কেমন সোদা গন্ধ ছড়িয়েছে। ঘুলঘুলিতে আলসে ঘুম-পাওয়া কবুতরের গুমগুম গুমগুম শব্দ।

মনে হয় অলিন্দের আবছা আঁধারে একটি পালক ঝরে পড়ে। জানালার পাল্লায় এলোমেলো অস্থির বাতাসের ঝাপটা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দে আমার নেশা ধরে যায়। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়। শিশুর কান্নার কন্ঠে সম্বিত ফিরে পেলাম।

পাশের ঘরে বিশ্বদিত কাঁদছে। কনক ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কনক-কনক রাণী দাশ আমার সমস্ত সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সুখে-দুঃখে আমার পাশে এতকাল ছায়ার মতন অটল দাঁড়িয়েরয়েছে। কিন্তু...কিন্তু কনককে এখন সান্ত্বনা দেয় কে? সন্তান হারানোর যে কী কষ্ট।

নীলম ছিল আমার আর কনক -এর হৃদয়ের জাদুধন। ও আর ফিরে আসবে না। হায়! আজ সকালের দিকে মেঘহীন আকাশে ঝলমলে আলো ছিল। তখন গিয়াসউদ্দিন আহমেদ এসেছিলেন। একটা গান নিয়ে।

গিয়াসউদ্দিন আহমেদ সিলেটের একজন মননশীল মরমি গীতিকবি। আমার দীর্ঘদিনের সুহৃদ। তাঁর অনেক গানেই আমি সুরারোপ করেছি। আমি যখন কালা শাহর লেখা ‘সাধের লাউ বানাইছে মোরে বৈরাগী’ গানটি সুর করলাম সে সময় গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ওই গানটির একটি অন্তরা লিখেছিলেন। ‘সাধের লাউ বানাইছে মোরে বৈরাগী’ গানটিকে যৌথ প্রযোজনাই বলা যায়।

কেননা, ওই গানের আরেকটি অন্তরা লিখেছিলেন সুনির্মল কুমার দেব মীন! আমি হারমোনিয়ামের ওপর একটি কালো ডায়েরির ভাঁজে গিয়াসউদ্দিন আহমেদ- এর গানের কাগজটি রেখেছি। এখন টেনে বার করে নিলাম। ঝকঝকে লেখা গিয়াসউদ্দিন আহমেদ- এর। পড়তে থাকি- সুরা ইয়াছিন পাঠ করিলাম / বসিয়া কাচায়/ আমার প্রাণ যাবার বেলায়/ বিদায়কালে পড়ি না যেন শয়তানের ধোকায়/ মরিলে কান্দিস না আমার দায়/ ও যাদুধন। বুক বান্ধিয়া কাছে রইয়া/ গোছল করাইবাই আমার কথা রাখিবায়/কান্দনের বদলে মুখে কলমা পড়িবায় মরিলে কান্দিস না আমার দায় ও যাদুধন।

কাফন পিন্দায়া আতর গোলাপ দিয়া আমার গায় যখন বিদায় করিবায় তেলাওয়াতের ধ্বনি যেন ঘরে শোনা যায় মরিলে কান্দিস না আমার দায় ও যাদুধন। কবর জিয়ারত করিয়া/ দোওয়া করিবায়/ দরবারে খোদায় মাফ করিয়া দিও আল্লায় গিয়াস পাগেলায়। মরিলে কান্দিস না আমার দায় ও যাদুধন। বিদিত লাল দাশ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। গিয়াসউদ্দিন আহমেদ এর কাছ থেকে এর আগে কখনও এত মর্মস্পশী গান তিনি পাননি ।

গিয়াসউদ্দিন আহমেদ অসামান্য প্রতিভার অধিকারী । ভাবলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই গিয়াসউদ্দিন আহমেদই হালকা মেজাজে লিখেছেন- আমি গয়া গেলাম কাশী গো গেলাম সঙ্গে নাই মোর বৈষ্ণবী সাধের লাউ বানাইছে মোরে বৈরাগী ... বিদিত লাল দাশ এই বিষন্ন অপরাহ্নে হারমোনিয়ামের সাদাকালো রিড-এ আঙুল বুলিয়ে ক্রমশ এমন শোকার্ত কথার ওপর এমন এক বিষাদী সুরে যে গান দাঁড় করলেন সে গান শুনে আসন্ন মৃত্যু উপলব্দি করে কাঁদতেন নেত্রকোনার কাজল মাটির আরেক মরমি সন্তান হুমায়ুন আহমেদ ... স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী এবং বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ সিলেট বিভাগের সভাপতি বিদিত লাল দাশ ৮ অক্টোবর ভোর ৫টায় ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সিলেটের সুরানীবাজার শশ্মানঘাটে দাহ করা হয়। আশির দশকে, আমার শৈশবে, আমাদের সাদাকালো প্যানাভিশন টিভিতে বিটিভি-র বর্ণালি অনুষ্ঠানে বিদিত লাল দাশ -এর গাওয়া বেশ কয়েকটি গানের দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিপটে অম্লান। বিদিত লাল দাশ ‘পটলবাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন।

গত ৯ অক্টোবর ২০১২ সালে প্রকাশিত মানবজমিন পত্রিকায় ‘সিফোর কারপেন্টার’ নামে একজন পাঠক বিদিত লাল দাশ সম্বন্ধে লিখেছেন: ‘পটলদার হৃদয় ছিল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, কালজয়ী এই মহান শিল্পীর প্রয়াণে আমরা গভীর মর্মাহত তার আত্মার শান্তি কামনা করি। ’ উল্লেখ্য, বিদিত লাল দাশ ব্যান্ড মিউজিককে বিশুদ্ধ লোকসংগীত চর্চার অন্তরায় বলে মনে করতেন। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যান্ড মিউজিককে অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্যান্ড মিউজিক- এর আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে থেকে টিংকু কিছুকাল আগে সিলেটের পাঁচজন গীতিকবির গানের অ্যালবাম বের করেছেন। টিংকুর এই উদ্যেগের মূল্যই বা কম কী।

এ ক্ষেত্রে ‘লালন’ ব্যান্ডের অগ্রযাত্রাও স্মরণীয় ... বিদিত লাল দাশ এর সুরে গিয়াসউদ্দিন আহমেদ- এর লেখা আনুশেহ আনাদিল- এর গাওয়া বাংলা ব্যান্ড-এর ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় ও যাদুধন’ গানটির লিঙ্ক ... Click This Link - Bangla - Morile Kandish Na.mp3.html কিংবা http://www.mediafire.com/?aag64b7jj0sh09g স্বীকার করছি: ... আমি এই পোস্টটি লিখেছি গত ১২ অক্টোবর ২০১২ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত শাকুর মজিদ -এর লেখা নিবন্ধ ‘সিলেটের পটলবাবু’-র তথ্যের ওপর। বিশিষ্ট প্রামান্যচিত্র নির্মাতা ও সংগীত-গবেষক শাকুর মজিদ এই নিবন্ধটি না লিখলে এই পোস্টটি লেখা সম্ভবপর ছিল না। শাকুর মজিদ কে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। নীচে নিবন্ধটির পিডিএফ লিংকটি রয়েছে ... http://www.mediafire.com/view/?8hmvhp8ty1ls2u2 ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.