ইতিহাসের পেছনে ছুটি তার ভেতরটা দেখবার আশায়
‘রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টা। রমনা এলাকার হলি ফ্যামিলি স্টাফ কোয়ার্টারের আত্মীয়ের বাসা থেকে হলে ফিরছিলাম। রিকশা না পেয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। দুর্নীতি দমন কমিশনের সামনে পৌঁছার পর হঠাত্ করেই সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস থামে। পুলিশের কয়েকজন সদস্য জোর-জবরদস্তি করেই আমাকে গাড়িতে তোলেন।
কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন। থানায় নিয়ে শরীরের গিরায় গিরায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। পরের দিন সকালে ওসি একটি চাপাতি বের করে বলেন, দেখি ধার আছে কি না?-বলেই আমার বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে পোঁচ দেন। সঙ্গে সঙ্গেই পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। আমি ভয়ে চিত্কার করে উঠি।
’
গতকাল সন্ধ্যায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ু্ল মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে এভাবেই গ্রেফতার এবং পুলিশের নির্যাতনের বর্ণনা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদের। এ সময় তিনি বলেন, আমি নির্দোষ। পুলিশ আমাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে। আমার পা কেটে দিয়েছে। আমি এর বিচার চাই।
এদিকে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পায়নি কাদের। প্রিজন সেল থেকে বের হয়ে কোথায় চিকিত্সা নেবেন এ খবর জানতে স্বজনদের হাত ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। ব্যান্ডেজ বাঁধা পা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যান হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে।
পুলিশ হেফাজতে ১ দিন : কাদের বলেন, থানায় আটকের পর আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশে অসহায় মানুষের জন্য কেউ নেই। পুলিশের কাছে কান্নাকাটি করে বলেছি, আমি নির্দোষ।
তারা আমার কোনো কথা শুনেনি। রাতে পুলিশ সদস্যরা ব্যাপক নির্যাতনের পর থানার একটি সেলে বন্দি করে রাখে। সামনের পাহারাদার কনস্টেবলের কাছে অনেক অনুরোধ করেছি আমার বন্ধুদের খবর দেওয়ার জন্য। তিনি চাকরির ভয়ে আমার কোনো কথাই শুনেননি। ভোরের দিকে তিনি আমার এক বন্ধুর নম্বরে ফোন দিয়ে খবর জানান।
এরপর মোক্তাদির নামে এক বন্ধু থানায় যান। তিনি পুলিশের সঙ্গে কথা বলে আমার জন্য খাবার আনতে যান। এরপর তিনিও আর ফেরেননি। পরে জানতে পারি, পুলিশ ভয় দেখিয়ে তাকে থানা থেকে বের করে দিয়েছে।
কাদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে আমি বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি।
কিছুক্ষণ পর একজন পুলিশ সদস্য আমাকে ওসির রুমে নিয়ে যান। ওসি আমায় তার কক্ষে নিয়ে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করাতে চাপাচাপি করতে থাকেন। কিন্তু আমি বারবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি আমি ডাকাত নই, ছাত্র। নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে কাদের বলেন, আমি অভিযোগ স্বীকার না করায় ওসি আমাকে লম্বা একটি লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন। একপর্যায়ে তার টেবিলের নিচ থেকে ধারালো একটি চাপাতি বের করে আমার পায়ে আঘাত করেন।
পায়ে আঘাত করার পর মেঝে রক্তে ভেসে যায়। ভেবেছিলাম মরেই যাব। কিছু সময় পর স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে আমার পায়ে ব্যান্ডেজ করা হয়। পরে আমার বিরুদ্ধে মামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা দিতে চাইলেও ওসি আমার গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় মামলা করেন।
দুপুরের পর পুলিশের গাড়িতে করে আমাকে উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে উপ-কমিশনারের কাছে নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দিলে তিনি তার পরিচিত একজনকে ফোন করে আমার পরিচয় নিশ্চিত হন। এরপর আবার থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আদালতে নেওয়া হলেও বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি। ১৬ জুলাই বিকেলে আদালত থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ।
জামিনের পর নতুন ভোগান্তি : সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ‘নো ওয়ান ফ্রি’ লেখা মুক্ত আকাশের ছবি যুক্ত একটি টি-শার্ট পরে প্রিজন সেল থেকে বেড়িয়ে আসেন কাদের।
এ সময় সহকারী জেলার আবু মুসা জানান, আইনগতভাবে কাদের এখন মুক্ত। তবে তিনি যদি চিকিত্সাধীন থাকতে চান, তাহলে সাধারণ রোগীর মতোই তাকে চিকিত্সা নিতে হবে। এরপরই শুরু হয় কাদেরের ভোগান্তি। কাদেরকে নিয়ে তার মা মনোয়ারা বেগমসহ স্বজনরা প্রথমে হাসপাতালের বি-ব্লকে যান। সেখান থেকে জানানো হয়, কাদেরকে ডি-ব্লকে নিতে হবে।
ব্যথায় হাঁটতে পারেন না কাদের। মা এবং বন্ধুদের কাঁধে ভর করে কাদের রওনা হন ডি-ব্লকের উদ্দেশে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ডি-ব্লকের অর্থোপেডিক জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিত্সক সাকলাইন জানান, তার হাতে ছাড়পত্র পৌঁছেনি। এ কারণে তিনি কাদেরকে ভর্তি করতে পারবেন না। পরে পৌনে ২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর রাত পৌনে ৮টার দিকে কাদেরকে ডি-ব্লকের ২ নম্বর ওয়ার্ডে ডা. রোকন কুমার দত্তের তত্ত্ব্বাবধানে তাকে ভর্তি করা হয়।
আইন ও বিচার বিভাগের তদন্ত কমিটি : হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘটনা তদন্তে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যুগ্ম সচিব আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রধান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল জলিল বলেন, কমিটি কাজ করে যাচ্ছে। ভিকটিম এবং অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে তদন্ত কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।
তিন মামলায় কাদেরের জামিন : দীর্ঘ ১৮ দিন কারাভোগের পর জামিন পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিভাগের ছাত্র আবদুল কাদের। গতকাল সকালে খিলগাঁও থানার অস্ত্র ও ডাকাতির মামলায় জামিন পান তিনি। এ নিয়ে কাদেরের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি মামলায় তিনি জামিন পেলেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক জহুরুল হক ওই দুই মামলায় তাকে জামিন দেন। গত সোমবার মোহাম্মদপুর থানার গাড়ি ছিনতাইয়ের মামলায়ও জামিন পান কাদের।
অস্ত্র ও ডাকাতির মামলায় জামিনের শুনানি শেষে আদালত ১০ হাজার টাকার মুচলেকায় কাদেরকে জামিনে মুক্তির আদেশ দেন। এদিকে কাদেরের মা মনোয়ারা বেগম জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন তিনি।
আদালতে কাদেরের পক্ষে জামিনে শুনানি করেন আইনজীবী আবদুল মতিন খসরু ও মঞ্জুর আলম। জামিন শুনানিতে সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেন, কাদের পুলিশের সাজানো মামলার শিকার। তার ওপর নির্যাতনের ঘটনাটি সারা দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।