আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শিক্ষার উদ্দেশ্য এখন জলপাই তেলের ঘানি বায়না নেয়া

যে মুখ নিয়ত পালায়......। । শিক্ষা কোন পণ্য নয় স্লোগান শোনা যায়। পপুলার স্লোগান। হাটতে বেরোলেই কোন একা একা দেয়ালের বুকে জ্বলজ্বল করে রঙ্গের লেখা।

তবে এগুলো কে উপহাস করে শিক্ষা পণ্য হয়ে গেছে। জ্ঞানী জ্ঞানী চেহারার কফিবিহীন কাপে চুমুক দেয়া বুদ্ধিজীবীদের ছেলে ভুলানো কথায় ও ভুলে নি শিক্ষা। সে ঠিকই পণ্য হচ্ছে। শিক্ষা পণ্য হওয়া দোষের না গুণের সে বিষয় পরে। আগে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় শিক্ষাকে কীভাবে মনে করা হয় সেটা গুরুত্বপূর্ন।

আমাদের সমাজে শিক্ষাকে টাকা উপার্জনের মাধ্যম হিশেবেই ধরা হয়। কোন নির্দিষ্ট পেশার প্রতি ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে অভিভাবক দের প্রত্যাশার পারদের উচ্চতা নির্ধারিত হয় ঐ পেশার উপার্জনের পরিমাণের সমানুপাতিক হারে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমনিতেই সমস্যা ব্যাপক। ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম আর মাদ্রাসা শিক্ষা(কওমী) শিক্ষায় তিন ধরনের উতপাদ বেরিয়ে আসছে। সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতার।

এই তিন প্ল্যাটফর্ম কে সরকারের নিয়ন্ত্রনে আনার কার্যকর ব্যবস্থা তবু নেয়া হচ্ছে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল গড়ে উঠছে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে। এটাকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ইউজিসি প্রায় বছর খানেক আগে ক্যাম্পাসের জন্য রেড এলার্ট জারি করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি। এদের মধ্যে বেশীরভাগই এখনো বহাল তবিয়তে ছাত্র ভর্তি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আর বছর খানেক সময়েই ব্যবসায়ীদের প্রতাপে হারিয়ে গেছে ইউজিসির লিস্ট এবং রেড এলার্ট। ব্যবসা হচ্ছে শিক্ষাকে নিয়ে। কোচিং বানিজ্য হচ্ছে কোটি কোটি টাকার। স্কুল সেকশন থেকে শুরু করে এইচ এস সি। পুরো জম জমাট কোচিং ব্যবসা।

এইচ এস সির পর ভর্তি কোচিং। তাই শিক্ষা পণ্য নয়, পণ্য নয় বলে স্লোগান দিলে হবে না এখন। পুঁজিবাদের যুগে সব কিছু পণ্য। আপনি রিমুভ করতে পারবেন না। রিমুভ করতে হলে পুঁজিবাদ কে ঠেকাতে হবে।

যা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। নিয়ন্ত্রিত ভাবে পুঁজিবাদের বিকাশ উন্নয়নশীল দেশের জন্য স্বস্থ্যকর। ঠিক তেমনি নিয়ন্ত্রিত ভাবে শিক্ষা পণ্য হওয়াও ভাল। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে হলে মানহীন শিক্ষা বিক্রির মাধ্যমে মানুষ ঠকিয়ে টাকা উপার্জনের ধান্দায় নামবে ব্যবসায়ীরা। প্রাচীন কালেও শিক্ষা পণ্য হবে কি হবে না এ নিয়ে বিতর্ক ছিল।

দু পক্ষেরই শক্ত সমর্থ যুক্তি দেয়ার লোক ছিলেন। মনে হয় সব সমাজেই শিক্ষা পণ্য ছিল কারো কাছে, আর আরেকদল পন্ডিতেরা মনে করতেন বিদ্যা বিক্রি পাপ। প্রাচীন গ্রীসের মহাজ্ঞানী সক্রেটিস মনে করতেন যারা টাকার বিনিময়ে বিদ্যা দান করে এবং যারা পয়সার জন্য দেহ বিক্রি করে তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তার কথা ছিল এরা জ্ঞান জগতের পতিতা। সক্রেটিসের এই মতের বিরোধী ছিলেন সফিস্ট দার্শনিক প্রোটাগোরাস।

তিনি নিজে দশ হাজার দ্রকমার বিনিময়ে ছাত্রদের পড়াতেন। দশ হাজার দ্রকমায় প্রায় পচিশ হাজার ডলার! তার কথা ছিল, শিক্ষা ছাত্রের স্কিল বৃদ্ধি করে ভবিষ্যতে বেশী উপার্জনের পথ করে দেয়। এজন্য ছাত্রকে বিদ্যা দান করার বিনিময়ে টাকা নেয়া যেতেই পারে। দোষের কিছু না। উল্লেখ্য, সক্রেটিসের জন্ম৪৬৯ বি সি এবং মৃত্যু ৩৯৯ বি সি।

আর প্রোটাগোরাসের জন্ম ৪৯০ বিসি এবং মৃত্যু ৪২০ বিসি। (আনুমানিক-উইকি) আরেক ধরনের মত ছিল। এর প্রবক্তা এরিস্টিপাস। তার কথা ছিল শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু টাকাই না। আবার সক্রেটিসের সাথেও তিনি দ্বিমত ছিলেন।

এরিস্টিপাস মনে করতেন শুধুমাত্র টাকাই যেন উদ্দেশ্য না হয়ে পড়ে। এই শর্তে তিনি প্রোটাগোরাস কে সমর্থন করতেন। সক্রেটিসের পতিতা সম্পর্কীত মনোভাবের ও বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। তার এক বারবনিতার সাথে সম্পর্ক ছিল। এ নিয়ে কেউ কথা বললে তিনি জবাব দিতেন, অন্যের ব্যবিহৃত গাড়ি বা জাহাজ ব্যবহার করতে পারলে অন্যের ব্যবহার করা নারী ব্যবহারে অসুবিধা কি? প্রাচীন ভারতেও টাকার বিনিময়ে শিক্ষাদান কে ভাল চোখে দেখ হত না।

মনুসংহিতায় তিন ধরনের শিক্ষকদের মধ্যে গুরু রা হলেন শ্রেষ্ট। গুরুর বাড়িতে থেকে শিষ্য জ্ঞান অর্জন করতেন। গুরু অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তিনি কোন টাকা নিতেন না। এর পরে ছিলেন আচার্য গণ।

এরা বেতন হিশেবে টাকা না নিলেও উপহার নিতেন। একে ছোট অপরাধ হিশেবে দেখা হত। সর্ব নিম্ন শ্রেনীর শিক্ষক ছিলেন উপাধ্যায় গণ( বন্দোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়,চট্টোপাধ্যায়)। এরা টাকার বিনময়ে পড়াতেন। এরা বেদ পড়াতে পারতেন না।

বেদের সহায়ক গ্রন্থ পড়াতেন। উপার্জনের জন্য পড়ালেও এরা শুধু উচু শ্রেণীর লোকদেরই পড়াতে পারতেন। চীনেও দু ধরনের মত ছিল। কনফুসিয়াস এবং তার শিষ্যরা অর্থের বিনিময়ে পড়াতেন। তারা মনে করতেন শাসকদের বা আমলাদের শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।

পক্ষান্তরে লাও জু মনে করতেন শিক্ষিত হলেই এরা ভাল দ্বেষ চালাতে পারবে ভাল এটা ভুল ধারনা। শিক্ষার প্রসারের সাথে বদমাসদের সংখ্যা বাড়বে। প্রকৃত শিক্ষা আন্তর দিয়ে উপলব্ধির ব্যাপার। জ্ঞানকে বা শিক্ষাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিশেবে সরাসরি মেলান হয় নি প্রাচীন কালে। দার্শনিক এন্টিফেনিস এমনি দরিদ্র ছিলেন যে ছেঁড়া কাপড় পড়তেন।

সক্রেটিস বলতেন, এন্টিফেনিসের কাপড়ের ছেড়া অংশ দিয়ে দেখা যায় তার দম্ভ! তবে টাকা উপার্জনে জ্ঞানকে সরাসরি কেউ কেউ যে ব্যবহার করেন নি এমন না। যেমন গ্রীক জ্ঞানী থেলিস। তিনি একবার হিশেব করে দেখলেন এ বছর জলপাই ফলন ভাল হবে। জলপাই দিয়ে তেল তৈরী হত প্রচুর। তিনি সব তেলের মিল বায়না নিয়ে ফেললেন।

ফলন ভাল হওয়ার পর সবাই দেখল সব তেলের মিল থেলিস বায়না নিয়ে বসে আছেন। চড়া দামে তার কাছ থেকে কিনতে হল। আর তিনি হয়ে গেলেন টাকাওয়ালা! তার টাকা ধুলায় মিশে গেছে! কিন্তু রয়ে গেছে এই ইতিহাস। শেষকথা হল, শিক্ষার উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে বাহির দিকে এরিস্টাপাস বা কনফুসিয়াসের মতাবলম্বী আজকের দুনিয়া। কিন্তু ভিতরের দিকে প্রোটাগোরাসের মত মানে।

আর ইচ্ছা পোষন করে থেলিসের মত জ্ঞান দিয়ে জিম্মি করে প্রচুর টাকা উপার্জনের। ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ১৬ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.