আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সম্মানজনক পেশা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ



প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সম্মান জনক পেশা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির যুগে প্রতিবন্ধী নারীরা শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে নেই। নিজ উদ্যোগে ও অন্যের সহযোগিতায় উর্চ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার পর অনেক প্রতিবন্ধী নারী কর্মক্ষেত্রে সম্মানজনক পেশায় নিযুক্ত রয়েছে। ‘‘মানুষ নিজেই তার ভাগ্যের নিয়ন্ত্রা’’ কথাটি প্রমাণ করেছে। তবে এদের সংখ্যা অতি নগন্য। অনেক প্রতিবন্ধী নারী আয় বর্ধকমূলক কাজের সাথে জড়িত থেকে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে।

নিম্নে তাদের কেস স্টাডি শুনা যাক: শিরিন আকতার (দৃষ্টি প্রতিবন্ধী) সমন্বয়কারী ন্যাডপো মোসাঃ শিরিন আক্তার একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তরুণী। জন্মগত প্রতিবন্ধী নন। ২ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ দৃষ্টি শক্তি হারান। এসএসএসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় স্টার মার্কস পেয়ে উর্ত্তীণ হন। এসএসসি পাসের পর বদরুননেছা কলেজে ভর্তি নেয় নি তৎকালীন প্রিন্সিপাল অধ্যাপিকা রোকেয়া সুলতান।

পরে ভাইস প্রিন্সিপাল ভর্তি নেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে ইংরেজিতে এমএ, পাস করেছেন। তিনি স্ক্রীন রিডার সফট্ওয়ারের (জওস) মাধ্যমে কম্পিউটারে অফিসের যাবতীয় কাজ করতে সক্ষম। বর্তমানে ‘ন্যাশনাল এ্যালাইয়েন্স অব ডিজএ্যাবল্ড পিপলস্ অর্গানাইজেশনে (ন্যাডপো) সমন্বয়কারী হিসেবে কর্মরত। ইতোপূর্বে ‘‘ভকেশনাল ট্রেনিং অব দ্যা ব্লাইন্ড (ভিটিসিবি) নামক একটি বে-সরকারি সংস্থাতে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

চাকুরির ১ মাস পর জাপান থেকে কম্পিউটারের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি বললেন- প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সহযোগিতা পেলে কর্মক্ষেত্রে সহজেই এগিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুবই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চেয়ে তাদের কর্মক্ষেত্রের অভাব। এমনকি শত-শত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তরুণ, তরুণী বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করার পরও ধুকে-ধুকে মরছে।

এদেরকে সরকারি,বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সৈয়দা শাহীন মিথিলা (শারীরিক প্রতিবন্ধী) সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারি বাবা-মা কেউ পৃথিবীতে বেঁচে নেই। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রচেষ্টা এবং প্রিয়জনদের উৎসাহে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে বিএসএস অনার্স (সমাজ কল্যাণ) পাস করে প্রথমে একটি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সোসাইটি (পিকেএস) নামক এনজিওতে চাকুরি নেন। পরবর্তীতে তিনি চিন্তা করলেন যে, প্রতিবন্ধী নারী হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনে কাজ করা কে প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষমতায়ন বলা সাজে না। সেজন্য স্ব-উদ্যোগে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারি হিসেবে চাকুরি পেয়েছেন।

তিনি বললেন- অনেক প্রতিবন্ধী তরুণী প্রবেশগম্যতার অভাবে চাকুরি পাওয়ার পরও কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারেনা বলে বাধ্য হয়ে চাকুরি ছেড়ে দেয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মুক্ত চলাচলের জন্য প্রবেশগম্যতা দরকার। আশরাফুন নাহার মিষ্টি শারীরিক প্রতিবন্ধী (হুইল চেয়ার পারসন)। সমন্বয়কারী (প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন নের্টওয়ার্ক) বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস) সে ঘরের ছাদ থেকে পড়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০০১ সালের মাষ্টাস্ (হিসাব বিজ্ঞান) পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১ম স্থান করেন।

তিনি বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)-এ প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন নেটওয়ার্ক সেকশনে সমন্বয়কারী হিসেবে কর্মরত। জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১ বছরের ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি জানান- প্রতিবন্ধী নারীদের যোগ্যতা থাকার পরও চাকুরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না। অথচ একজন প্রতিবন্ধী নারীকে শত বাধা অতিক্রম করে লেখা-পড়া শিখতে হয়। প্রতিবন্ধীদের যোগ্যতাকে মূল্যায়ণ করে সম্মানজনক পেশায় কাজ করার সুযোগ দিলে অন্যান্য পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধী নারীরা উৎসাহিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

অন্তরা আহমেদ শারীরিক প্রতিবন্ধী (হুইল চেয়ার পারসন) সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, আরব বাংলাদেশ ব্যাংক পোলীয় রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। হাটি হাটি পা পা করে মাষ্টার্স পাস করেছেন। বর্তমানে আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিঃ সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি ‘‘এসোসিয়েশন ফর দি ওয়েলফেয়ার অব দি ডিজএ্যাবল্ড পিপলস্ (এডব্লিউডিপি)নামক সংগঠনের নির্বাহী সদস্য হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে নিবেদিতভাবে কাজ করছেন। অথচ তার হুইল চেয়ার ছাড়া এক পা ফেলার শক্তি নেই।

হাফছা আকতার (শারীরিক প্রতিবন্ধী) চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের পশ্চিম রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা। তিনি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের শোভন গ্রামে দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজ মেধা ও যোগ্যতা দ্বারা সরকারি চাকুরি পেয়েছে। তিনি ২০০৫ সালে জাপানের নাগোয়ায় হ্যান্ডি ম্যারাথনে প্রথম স্থান অধিকার করে বাংলাদেশে সম্মানকে ক্রীড়াঙ্গনে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেন। ২১টি দেশের ২৫১ জন প্রতিযোগীর সাথে প্রতিযোগিতা করেন সেখানে। শিক্ষকতার পাশাপাশি চাঁদপুর-ডিপিওডি’ নামক সংগঠনের ‘উইমেন উইথ ডিজএ্যাবিলিটিস’-এর প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন।

তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি চাকুরিতে ৩ ভাগ কোটা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহে ৫ ভাগ কোটা অবধারিত। কিন্তু বাংলাদেশে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি চাকুরিতে ১০ ভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোটার মধ্যে এতিমদেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বেশির ভাগই ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীরা অবহেলার শিকার হয়। আমাদের দেশে প্রায় ৭৫ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী নারী রয়েছে। এরা সবচে বেশি অবহেলিত।

একদিকে তারা নারী অন্যদিকে প্রতিবন্ধী। বহুকষ্টে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পরও চাকুরি ভাগ্যে জোটে না। অধিকাংশ প্রতিবন্ধী নারীরা অশিক্ষিত এবং দারিদ্রতার সীমার নিচে বসবাস করে। বিশেষ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারীরা কর্মক্ষেত্রের সুযোগ অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের চেয়ে কম পাচ্ছে। এছাড়াও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত পদে চাকুরি দেওয়া হয় না।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মক্ষেত্র সম্বন্ধে ডিজএ্যাবল্ড পিপলস্ ইন্টারন্যাশনাল (ডিপিআই)-এর জেনারেল সেক্রেটারী এবং বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি’র (বিপিকেএস) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সাত্তার দুলাল বললেন- আমাদের দেশে সরকারি চাকুরিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষিত থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয না । তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ‘আইসিটি’সহ যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলে চ্যালেঞ্জিং পেশায় এগিয়ে আসতে পারবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কম্পিউটার অপারেটর, ট্রেইনার, শিক্ষক, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, ফ্রন্ট ডেস্ক এ্যাসিস্টেন্ট, হিসাব রক্ষকসহ সরকারি, বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহে সম্মানজনক পদে চাকুরি প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। লেখক: আজমাল হোসেন মামুন (ন্নয়নকর্মী,ব্লগার এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক) উত্তরা, ঢাকা-১২৩০। মোবাইল নং- ০১১৯১০৮৯০৭৫ (প্রয়োজনে মিস কল)।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.