আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হামাস যেখানে জয়ী



এমন কোনো লাঙল নেই যার ফলা ঘৃণার শেকড় উপড়ে ফেলতে পারে। স্থাপনা নির্মূল করে কখনই জিঘাংসা ধ্বংস করা সম্ভব না, জিঘাংসা ভুলিয়ে দিতে পারে এমন নৃশংসতা সম্ভব নয়, সুতরাং ঘৃণার চাষাবাদ বাড়ে পৃথিবীতে। প্রশ্নটা তখনই সামনে আসে, আদতে বর্তমানে জিতছে কারা? যারা বিভেদ আর বিদ্বেষ ছড়াতে চায় তাদের নানাবিধ কার্যক্রমে ক্রমশ মানুষের ভেতরে এইসব অন্ধকার বোধের ক্রমবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না কোনো ভাবেই। রাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধতা, বহুজাতিক ঐক্য পরিকল্পনা কিংবা পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ঠতার কপট দাবি মেনে নিয়ে অবাধ পণ্য ও মানবসম্পদের প্রবেশাধিকার দিয়েও বিবাদমান জাতিসত্ত্বাগুলোর নিজস্ব সাংস্কৃতিক ব্যবধান মুছে ফেলে অভিন্ন সংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব হয় নি এখনও। মানুষ অবশ্য ভাবনার শ্রম চায় না, মানুষ এখন ভাবতেও চায় না, খতিয়ে দেখতে চায় না কিছুই।

চারপাশের কোনো দৃশ্যই তাকে কোনোভাবেই তাড়িত করে না। তৃতীয় বিশ্ব, যেখানে মানুষের টিকে থাকবার লড়াই চিরস্থায়ী, সেখানে মানুষ অনেক বেশী সংবেদনশীল, অনেক বেশী রাজনৈতিক সচেতনতা বিদ্যমান এখানে। নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার বক্তব্য দিয়ে গাজায় অব্যহত বোমা ও স্থল হামলার ফলাফল কতটা ভালো হবে এটা নিয়ে সন্দেহ আছে আমার। হামাসের নেতৃত্ব নির্মূল করে দিয়ে কি হামাসের আদর্শকে ধ্বংস করে ফেলা সম্ভব? মানুষ স্বপ্ন দেখে, বিরুদ্ধ সময়েও সুসময়ের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে থাকে, তাই মানুষ বিরুপ পরিস্থিতি বদলানোর লড়াই করে সব সময়ই। প্রকৃতির বিরুদ্ধাচারণ, কিংবা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানুষ তার শেষ প্রতিরোধের দেয়াল তুলে, মানুষ সর্বস্ব দিয়ে লড়ে শেষ লড়াইটা, পায়ের নীচের এক ইঞ্চির জমিও ছাড়ে না, মরিয়া মানুষের লড়াইয়ের সামনে সকল প্রতিষ্ঠান আর সকল আগ্রাসন স্তব্ধ হয়ে থাকে।

এবং এই নিশ্চিত মৃত্যুর সামনেও মানুষই মাথা তুলে দুর্বিনীত দাঁড়িয়ে থাকে। লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে গাজা উপত্যকায়, এখন গেরিলা লড়াই হচ্ছে, ইসরাইলী বোমারু বিমানের বোমা হামলে পড়ছে জাতিসংঘ শরনার্থী শিবিরে, আঘাত হানছে নিরাপদ বিবেচিত স্কুল আর মসজিদে, সব খানেই বিপন্ন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের লোভে লুকিয়ে ছিলো, সেখানেও মৃত্যুর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় নি, যদিও এইসব বেসামরিক স্থাপনার সম্পূর্ণ মানচিত্র ছিলো ইসরাইলের কাছে, এরপরও এসব স্থানে বোমা ফেলানো থেকে নিজেদের বিরত রাখে নি ইসরাইল। তবে বাস্তবতা হলো, সাময়িক এই আগ্রাসন হয়তো থামবে, ইসরাইলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র নিতান্ত অনিচ্ছায় হলেও যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব মেনে নিতে চাপ দিবে ইসরাইলকে। ইসরাইলের যদিও জাতিসংঘের প্রয়োজন নেই, জাতিসংঘের সনদ কিংবা সহায়তা প্রয়োজন নেই এই দেশের, বরং বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নাগরিক, যাদের অনুদানে এই রাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থ ভান্ডার ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তাদের অব্যহত সাহায্য সহযোগিতায় তাদের অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ থাকবার সম্ভবনা নেই কিংবা অনাহারে বিশ্ববিচ্ছিন্ন থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা নেই। বান কি মুন, কিংবা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রধান যতই ঘৃনা কিংবা আশংকা প্রকাশ করুক না কেনো, এই বর্বরতার বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধাপরাধের প্রস্তাব উত্থাপন সম্ভব হবে না।

তবে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও গাজা উপত্যকায় হামাসের অস্তিত্ব নির্মূল হবে না, এই যুদ্ধে হয়তো অনেকগুলো মানুষের জীবন অকারণেই ধ্বংস হবে কিন্তু মৃত্যুর বর্বরতা দেখে দেখে যে ঘৃণা জন্মাচ্ছে প্যালেস্টাইনের নাগরিকদের সেই ঘৃণার শেকড় সহসা উৎপাটিত হবে না। সব হারানো কোনো মানুষ প্রবল প্রচন্ড ঘৃণায় এক দিন ইসরাইলের মাটিটে নিজেকে বিস্ফোরিত করবে, কিংবা সামর্থ্য না থাকলেও শেষ মরণ কামড় দেওয়ার চেষ্টা অব্যহত রাখবে, হামাসের প্রধান নেতৃত্ব নির্মূল হয়ে গেলেও হামাসের আদর্শ কিংবা লড়াই চলতেই থাকবে ভিন্ন নামে, ভিন্ন কোনো পতাকা আর মেনিফেস্টোর আড়ালে, হামাসের জয় এখানেই। ইহুদিরা যদি নিজেদের জাতির ইতিহাসটা পুনরায় পড়তো তবে সেখানেও তারা এই বাস্তবতাই দেখতে পেতো, একটা জনগোষ্ঠী প্রতিকূল সময়েও লড়াই করেছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছে, নিজস্ব আবাসভুমি আর দাসত্ব মুক্তির লড়াই করে গিয়েছে অবিরাম। তাদের সামনে কল্পিত একটা স্বপ্নভুমির লোভ ছিলো, সব হারানো প্যালেস্টাইনের মানুষের সামনে নিজের স্বাধীনতা এবং স্বাধীকারের লোভ। এবং এই আশায় তারা আরও এক হাজার বছর লড়ে যাবে।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.