প্রগতি সরণির বসুন্ধরা ক্রসিংয়ের যানজট নিরসনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বক্তারা বলেছেন, বসুন্ধরা ক্রসিং বন্ধ করা হলে যানজট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। ছড়িয়ে পড়বে তা বিস্তীর্ণ এলাকায়। যানজট নিয়ে বক্তাদের এমন আশঙ্কা প্রকাশের পর এ বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরামর্শের ওপর। ওই বৈঠকে বলা হয়, বুয়েটের পরামর্শ গ্রহণের পরই সেখানকার যানজট সমস্যার সমাধানে সিদ্ধান্ত নেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এ অবস্থায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ক্রসিং খোলা থাকবে।
আগের মতোই যান চলাচল করবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)-এর সম্মেলন কক্ষে গতকাল প্রগতি সরণির যানজট নিরসনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বসুন্ধরা গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, প্রকৌশলী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সেবাসংস্থার প্রতিনিধি ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বক্তব্য রাখেন। বৈঠকের সরকারের সভাপতি ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক বলেন, বক্তাদের নানা আশঙ্কা প্রকাশের পর যানজট সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরামর্শ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। তারা দুয়েক দিনের মধ্যেই বুয়েটের কাছে মতামত চাইবে। বুয়েট ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করে ডিএনসিসিকে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করবে।
তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ট্রাফিক বিভাগের সহায়তায় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে ডিএনসিসি। বুয়েটকে এক সপ্তাহের মধ্যেই রিপোর্ট দেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে। বুয়েটের মতামত পাওয়ার আগ পর্যন্ত বসুন্ধরা মোড়ের বর্তমান ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতির কোনো পরিবর্তন হবে না বলেও জানান ডিএনসিসি'র নির্বাহী কর্মকর্তা।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক বলেন, প্রয়োজনে যমুনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের দুই কর্ণধারকেও চিঠি দিয়ে তাদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করে তাদের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে আলাপ করব।
দুপুর ২টায় বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর সোয়া ১টার দিকে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল সংসদ সদস্যের স্টিকার সংবলিত একটি কালো রঙের টয়োটা ভি-৮ ল্যান্ড ক্রুজার (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৪-০৬৫৮) গাড়িতে করে গুলশান এভিনিউয়ের ডিএনসিসি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
নেভি ব্লু জিন্স প্যান্ট ও কালো-নীল রং স্ট্রাইপের গেঞ্জি পরা অবস্থায় তিনি গাড়ি থেকে নামেন। এরপরই তিনি দোতলায় সভাকক্ষে চলে যান। যমুনা গ্রুপেরও এক দল কর্মকর্তা-কর্মচারী তার সঙ্গে ছিলেন। পরে দুপুর ২টা ৫ মিনিটে বৈঠক শুরু হয়। তার আগ পর্যন্ত তিনি কনফারেন্স কক্ষে বসে থাকেন।
বৈঠকে প্রগতি সরণির যানজট সমস্যার সাময়িক ও স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে বেশ কিছু প্রস্তাব উঠে আসে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে প্রগতি সরণির নতুনবাজার থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্ত করা, প্রগতি সরণিকে অযান্ত্রিক যানবাহনমুক্ত করা, বসুন্ধরা মোড়ে ওভারপাস বা আন্ডারপাস তৈরি, বসুন্ধরা মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যাল তুলে দিয়ে কুড়িল ফ্লাইওভার এলাকায় ইউটার্ন চালু, ফ্লাইওভার ঘুরে প্রগতি সরণির পূর্ব পাশের সড়ক ব্যবহার করে বসুন্ধরায় যাওয়া বা পূর্বাচল সড়ক ব্যবহার, কুড়িল থেকে আরেকটি ফ্লাইওভার তৈরি করে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত করা প্রভৃতি।
বৈঠকের শুরুতেই ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম প্রগতি সরণির বর্তমান যান চলাচলের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। এরপরই সমস্যার সমাধানে সবার কাছ থেকে পরামর্শ আহ্বান করেন বিএম এনামুল হক। এ সময় রাজউকের প্রতিনিধি ও কুড়িল ফ্লাইওভারের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মনিরুল হক বলেন, বসুন্ধরার গেটের ট্রাফিক সিগন্যাল তুলে দিলে কুড়িল ফ্লাইওভার পয়েন্টে ইউটার্ন তৈরি করতে হবে।
তাতে বিরাট সমস্যা দেখা দেবে ফ্লাইওভারে। কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে একটি বদ্বীপ আকৃতির কিছু জায়গা থাকলেও এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনের ইউটার্ন নেওয়ার জন্য সেটা পর্যাপ্ত নয়। কুড়িল পয়েন্টে কোনোভাবেই ইউটার্ন তৈরি করা সম্ভব হবে না।
বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিনিধি ডিএমডি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১৮টি বড় অফিস, ১০টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ৩৬ হাজার যানবাহন প্রতিদিন বসুন্ধরায় যাতায়াত করে।
এ ছাড়া ৬-৭ হাজার যানবাহন চলে বসুন্ধরার বাসিন্দাদের। ফ্লাইওভারের কাজও এখনো শেষ হয়নি। আবার পূর্বাচল সড়কও ব্যবহার উপযোগী হয়নি। বসুন্ধরা সিগন্যাল বন্ধ করলে কেবল বসুন্ধরা এলাকার মানুষেরই না, বাড্ডা থেকে কুড়িল পর্যন্ত দুই পাশের বাসিন্দাদেরই সমস্যা হবে। তিনি বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে নতুনবাজার থেকে কুড়িল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ২৫ ফুট করে সার্ভিস রোড থাকার কথা ছিল।
কিছু অংশে সার্ভিস রোডও আছে। এই রাস্তাটির দুই পাশে সার্ভিস রোড করে প্রশস্ত করলে যানজট সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যাবে।
এ সময় যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে ইউটার্ন বা পূর্বাচল সড়ক দিয়ে বসুন্ধরায় যান চলাচলের জন্য জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, 'বসুন্ধরার সিগন্যাল বন্ধ না করলে ৬ সেপ্টেম্বর থেকে আমার ফিউচার পার্ক চালু হবে। তখন দেখবেন এখানে মাইলকে মাইল গাড়ির কিউ হয়ে যাবে।
' বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বলেন, কুড়িল ফ্লাইওভার ঘুরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ঢুকতে গেলে যমুনা ফিউচারপার্কের সামনে যানজট লেগে যাবে। অনেকেই ফিউচারপার্কের সামনে গাড়ি থামাবে। বাস থামাবে। তখন ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। বর্তমান পদ্ধতিই বহাল থাকা প্রয়োজন।
ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল খায়ের বলেন, হঠাৎ করে সিগন্যাল বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। পরীক্ষামূলকভাবে সেটা করতে গেলেও সবাইকে আগে থেকেই অবহিত করতে হবে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। কুড়িল ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করতে হবে। তারপর ট্রায়ালে যেতে হবে।
সেই ট্রায়ালও এক-দুই ঘণ্টার জন্য। আর স্থায়ী সমাধান করতে হলে লেন বাড়াতে হবে। বর্তমানে দুটি লেনের জায়গায় সেটাকে তিনটা করতে হবে। লুপ করতে হলে বসুন্ধরা ও যমুনা গ্রুপ যৌথভাবে লুপ করে দিতে পারে। তাহলে আর সমস্যা থাকবে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, রাস্তা প্রশস্ত করার সুযোগ থাকলে সেটা ভালো কাজে আসতে পারে। পাশাপাশি স্থায়ী সমাধান করতে হলে বসুন্ধরা ও ফিউচার পার্কের মোড়ে একটি আন্ডারপাস বা ওভারপাস তৈরি করতে হবে।
পুলিশ ইন্সপেক্টর মারুফুল ইসলাম মারুফ বলেন, প্রগতি সরণিকে রিকশামুক্ত করতে হবে। ক্রসিং এখানে বন্ধ করলে যানজট বাড়বে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে।
এ ছাড়া যমুনা ফিউচারপার্কের সামনে কিছু জায়গা ছেড়ে রাস্তায় দেওয়া হলে যানজট আর থাকবে না বলে নিশ্চিত করে বলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এখনো বসুন্ধরায় বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে। যদি ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে ট্রাক বসুন্ধরায় প্রবেশ করবে কোন পথ দিয়ে। ফ্লাইওভার দিয়ে শত শত ট্রাক মালামাল নিয়ে ওঠানামা ফ্লাইওভারের জন্যে সমস্যা হবে।
ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরতুল্লাহ বলেন, রাস্তার দুই পাশে দুটি সার্ভিস লেন করা ছাড়া সমস্যার সমাধান হবে না।
দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে বসুন্ধরা মোড়ে একটা লুপ করা যেতে পারে।
বৈঠক শেষে সভার সভাপতি বিএম এনামুল হক বলেন, এ বিষয়ে আমরা বুয়েটের কাছে একটি চিঠি লিখব। প্রয়োজনে বুয়েটের উপাচার্যকে অনুরোধ করব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি যেন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রগতি সরণির অবস্থা পর্যবেক্ষণ (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করে এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ওই রিপোর্টে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি প্রস্তাবও আশা করব।
সেই রিপোর্টের আলোকে আমরা ট্রাফিক বিভাগকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করব। তবে আমার মনে হয়, স্থায়ী সমাধান হিসেবে কুড়িল ফ্লাইওভারের লুপ বাড়িয়ে মগবাজার ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। একটা ওভারপাসও সমাধান আসতে পারে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।