পুলিশ অবশেষে ২১শে অগাস্ট গ্রেনেড হামলার চার্জশীট দিয়েছে, সেই চার্জশীটকে আমলে এনে বিচারের কাজও শুরু হয়েছে। চার্জশীটভুক্ত সব আসামিই হারকাতুল জিহাদের কর্মী, এর বাইরে একমাত্র অভিযুক্ত আব্দুস সালাম পিন্টু, যাকে তদন্তকর্মকর্তারা অভিযুক্তের তালিকায় রেখেছেন হাসিনাকে হত্যা চেষ্টায় তার সরাসরি সংশ্লিষ্ঠতার জন্য নয় বরং তার অপরাধ, তার মোহাম্মদপুরের বাসায় হারকাতুল জিহাদের নেতা কর্মীরা মিটিং করেছিলো।
অবশ্য জোট সরকারের আমলেও একটা চার্জশীট দাখিল করা হয়েছিলো, বর্তমানের চার্জশীটে তাদের সবাইকেই অভিযোগ থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, এই মানুষগুলো তৎকালীন সরকারের সরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত স্মাগলার বাবরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তদন্তকে তার মনমতো পরিচালনার কারণেই নির্যাতিত হয়েছিলো। তাদের কারো কোনো দোষ নেই।
পুরোনো চার্জশীটে মামলা পরিচালিত না হলেও নতুন চার্জশীটের ভিত্তিতে মামলা শুরু হয়েছে। আজ মামলার তৃতীয় দিন অতিবাহিত হলো। ঘটনার মূল নায়ক মুফতি হান্নান, কলংকিত এক চরিত্র, ২০০০ সালে হাসিনার সমাবেশে বোমা পাতার জন্য অভিযুক্ত হান্নানই মূল হন্তারক এ বিষয়ে সংবাদপত্রগুলোর কোনো সংশয় নেই।
মূলত অনেক রকম অনুমান ভারাক্রান্ত দলীয় কলামিস্টদের কলমে বিভিন্ন ধরণের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উদঘাটিত হয়েছে, তাদের একাংশ অবশ্যই আনন্দিত, অন্য অংশ লজ্জিত, কারণ বর্তমানের চার্জশীটে স্পষ্ট বলা হয়েছে শেখ হাসিনাই হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলো, জয়নাল আবেদীন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে অবশ্য এমনটা বলা ছিলো না।
যারা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চায় না এমন একদ মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে এই আক্রমন করেছে, এই অনুমাণকে সমর্থন করা মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
তবে আমার অভিযুক্তদের জবানবন্দী পড়ে মনে হচ্ছে মুফতি হান্নান নেহায়েত বলির পাঁঠা। বেচারার সংশ্লিষ্ঠতা এই ঘটনায় তেমন নেই।
বেচারা প্রায় ১৭০ দিন বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে ছিলো। ১৯শে নভেম্বর ২০০৬ সালে বেচারার জবানবন্দি ছিলো ২১শে আগস্টের ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, তবে দেশের অন্যান্য গ্রেনেড হামলাগুলোর সাথে আমার সংশ্লিষ্ঠতা আছে।
এই মানুষটাই ২০০৭ সালের ১লা নভেম্বর শেখ হাসিনার উপরে হামলা চালানোর বিস্তর বিবরণ প্রকাশ করলো।
কিভাবে হামলা হলো, কোথায় পরিকল্পনা হলো, কে কে ছিলো এখানে।
তার জবানবন্দীর কিছু অংশ প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতে। তবে পুরোনো পত্রিকায় প্রকাশিত আরও কিছু অভিযুক্তের জবানবন্দী বিষয়টাকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
এখন আমার মনে হয়, যদি শুধুমাত্র জবানবন্দীর উপরে ভিত্তি করে আদালত রায় দেওয়ার চেষ্টা করে তবে এই ২২ জন অভিযুক্তের কেউই শাস্তি পাওয়ার যোগ্য নয়। যদি জবানবন্দীকে আমলে আনি তাহলে এই জবানবন্দীগুলোর ভেতরেও তথ্যগত গলদ আছে।
হান্নান নিজের জবানবন্দী প্রত্যাহার করে বলেছে হত্যার ভয় দেখিয়ে তার কাছে জবানবন্দী আদায় করা হয়েছে, নানাবিধ ছলনাও করছে তারা এমনটাই সংবাদপত্রে এসেছে।
তবে সমস্যাটা পরিমাণগত- ২২শে আগস্ট ২০০৪ সালের পত্রিকা পড়লে কিংবা সেই বছরে এই হামলা নিয়ে যত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেসব পড়লে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় গ্রেনেড হামলার পরপর ৩টা গ্রেনেড অবশিষ্ট ছিলো, একটা সন্ধ্যা ৬টা ২৭ এ আওয়ামী লীগের অফিসের পাশের গলিতে বিস্ফোরিত হয়, অন্য একটা গ্রেনেড পাওয়া যায় হকার মার্কেটের টয়লেট থেকে, বাকিটা উদ্ধার করা হয় ধ্বংসস্তুপ থেকে। এবং সেনাবাহিনীর ৩৫ জন সদস্য এটা নিস্ক্রিয় করেন।
তবে আটককৃতদের জবানবন্দী থেকে জানা যাচ্ছে তারা ঘটনাস্থলে মোট ৬টা গ্রেনেড ফেলে এসেছে, অবশিষ্ট ৩টা গ্রেনেড কোথায় গেলো ঘটনাস্থল থেকে?
আবু জান্দাল বলছে সে উপস্থিত ছিলো না পিন্টুর বাসায় হামলার পরিকল্পনার সময়, কিন্তু হান্নান নিশ্চিত ভাবেই বলছে তার উপস্থিতির কথা, হান্নানের বক্তব্য, জান্দাল গ্রেনেড বিতরণ করেছে এবং হামলাকারীদের রিক্রুট করেছে। তবে জান্দাল এইসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ঠতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গ্রেনেড হামলাকারী হিসেবে গ্রেফতারকৃত সবুজ বলছে হান্নান ২১শে আগস্ট সকালে তাদের ৪ জনের দলকে ৬টা বোমা দেয়, এমন ৩টা দল হামলায় অংশগ্রহন করে, আবু জান্দাল প্রথম গ্রেনেডটা ছুড়ে।
হামলায় অংশ গ্রহন করে ৩টি দল, মোট ১২ জন অংশগ্রহনকারী ছিলো এই হামলায়। তাদের কাছে দেওয়া হয় ১৮টি গ্রেনেড। সবুজ তার জিম্মায় থাকা ২টা গ্রেনেড নিয়ে বাসে উঠে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তবে ব্যপক প্রানহানীর দৃশ্য দেখে গ্রেনেড ফেলে পালিয়া যায়।
রতন, অন্য একজন গ্রেফতারকৃত আসামী বলছে সে ২টো গ্রেনেড ফেলে পালায়।
মামলার তদন্তকারী তত্ত্বাবধায়ক ফনীভুষন বলছেন শেখ হাসিনার গাড়ীর উপরে কোনো বুলেট হামলা হয় নি, তবে উপস্থিত আইন রক্ষাকারী বাহিনীরা কিছু গুলি ছুড়ে, তবে লক্ষ্যভ্রস্ট বুলেটগুলোর ৭টা বিদ্ধ হয়ে হাসিনাকে বহনকারী গাড়ীতে।
হান্নান এবং আরও কয়েকজন অভিযুক্ত বলছে মোট ১৫টি গ্রেনেড সবাইকে বিতরন করা হয় এবং বিতরণের কাজটা করে আবু জান্দাল, তবে সবুজের ভাষ্য সঠিক ধরে নিলে মোট ১৮টি গ্রেনেড ব্যবহৃত হয় হামলার সময় এবং এই গ্রেনেডগুলো বিতরন করে মুফতি হান্নান নিজেই।
এই সংখ্যার হিসাব মিলে না মোটেও, হয়তো এলিট ফোর্স র্যাবের যোগ বিয়োগ শেখা প্রয়োজন।
হান্নানকে অনেক বিবেচনায় উপযুক্ত হামলাকারী বিবেচিত করা যায় হয়তো, মানবিক অনুভবের কারণে তার জিঘাংসাকরে চরিতার্থ করবার বাসনায় সে ৩ বার শেখ হাসিনার জীবননাশের চেষ্টা করে, একজন অভিযুক্ত মানুষ যার অতীত ইতিহাস তেমন সুবিধার না তাকে ফাঁসি দিয়ে দিলেই ঘটনার সমাধান হয়ে যায় না।
আমার নিজের মনে হয়, হান্নান হয়তো অন্য কোনো ভাবে জড়িত এই হামলায় তবে সরাসরি সে অংশগ্রহন করে নি, এমন কি এই হামলায় যদিও কোনো কোনো অভিযুক্ত বলছে শুধুমাত্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ করা জঙ্গীরা অংশগ্রহন করেছিলো, তবে অন্তত ৩ জন বলছে তারা এর আগে গ্রেনেড দেখে নি কোনো দিন।
দ্রুত বিচারে হয়তো হান্নান এবং অন্যসব অভিযুক্তদের ফাঁসী হয়ে যাবে, তবে এটার পরিণতিও হবে বাংলা ভাইদের ফাঁসীর মতো, এরা মূলত ব্যবহৃত হয়েছে, কিংবা নেহায়েত জজ মিয়ার মতো বলির পাঁঠা, ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো শক্তিশালী গোত্র উপস্থিত,
হামলায় অংশগ্রহন করে ১৮জন, ১২জনের হদিশ জানে মুফতিহান্নান কিন্তু বাকী ৬ জনকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় নি। এরাই কি শেখ হাসিনার গাড়ীতে হামলা করেছিলো?
কিংবা সে সময়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মুন্সী আতুকুর রহমান, আব্দুর রশিদ এবং তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়, পুলিশ চাইলেই ফৌজদারী মামলা করতে পারে তাদের বিরুদ্ধে, মানুষকে বিভ্রান্ত করা, জোরপূর্বক সাক্ষ্য আদায় করা এবং মানুষের জবানবন্দী গ্রহন যাতে তাদের প্রাণদন্ডে দন্ডিত হইবার সম্ভবনা থাকে একটি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে অভিযুক্ত হইবার মতো অপরাধ।
তবে পুলিশ এই কাজটি করছে না, তারা আইন মন্ত্রনালয়ে বিষয়টি বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছে।
হয়তো জোট সরকার এটাতে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো না, তবে এমন কোনো ক্ষমতাশালী চক্র এটাতে সম্পৃক্ত ছিলো যাদের কাউকেই উন্মোচিত করতে আগ্রহী নয় বর্তমান শাসক শ্রেণী।
যেমন ভাবে মতিউর রহমান বলেছেন এটাতে অংশগ্রহন করেছে পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা সেটা সত্যও হতে পারে, তবে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা হুজিকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছে এই সহজ সমীকরণটা আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।
এরপরেও যদি এদের ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হয় তবে আমরা কখনই জানবো না ঘটনার নেপথ্যে আসলে কারা ছিলো, কলকাঠি নেড়েছিলো কারা।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।