অনেকবার চেষ্টা করেছি কলম আর ক্যামেরার দাসত্ব থেকে বের হয়ে যেতে..কিন্তু পারি নি....পারবো কিনা জানি না---এভাবেই হয়তো চলবে...
স্বপ্নের শহর লন্ডনে পড়তে আসার ভিসা পাওয়ার পরও অনেকের স্বপ্ন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্টে পৌছে। বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও প্রতিনিয়ত তাদেরকে থাকতে হয় চরম অনিশ্চয়তায়। কারণ তাঁরা জানে না, হিথ্রো এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন নামক ‘পুলসিারত’ কি আদৌ পার হওয়া সম্ভব? নাকি তাদের আবারো ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বাংলাদেশে।
উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৮/৯ হাজার শিক্ষার্থী লন্ডনে আসে। বৃটেনে লেখাপড়া করার জন্য সর্বপ্রথম এখানকার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশে গজিয়ে উঠা কিছু নামসর্বস্ব ট্রাভেল এজেন্ট, কনসালটেন্সী ফার্ম ও কলেজের মাধ্যমে অফার লেটার সংগ্রহ করে অনেকে ভিসার জন্য আবেদন করে ভিসা পান। কিন্তু হিথ্রো এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ভর্তি সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে অনেক সময় কোন তথ্যই প্রদান করতে পারে না সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্টুডেন্ট কনসালটেন্সী ফার্ম শিক্ষামেলা আয়োজন করে স্পট এডমিশনের নামে স্টুডেন্ট সংগ্রহ করে থাকে। আর এসব কলেজের অনেকগুলোই বাইরের চাকচিক্য, বাহারী প্রসপেক্টাস ও ওয়েবসাইটের মধ্যেই সীমবাদ্ধ থাকে। প্রকৃতপক্ষে অনেকগুলোরই নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই বলেও জানা গেছে এবং এদের অধিকাংশ বাঙালী, পাকিস্তানী ও ভারতীয় মালিকানাধীন ভিসা কলেজ নামেই পরিচিত।
সঠিক উপায়ে ভিসা পাওয়ার পরও বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা হিথ্রো এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন অফিসার কর্তৃক নানা অবাঞ্চিত প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে যেসব ছাত্র-ছাত্রী আইএলটিএস কোর্স ছাড়া পড়তে আসছে তাদেরকে রীতিমতো হতে হচ্ছে নাজেহাল। তাদের অনেকেই আপিল করে ভিসা পেয়েছেন। কিন্তু একমাত্র ইংরেজীতে দুর্বল হওয়ার অজুহাতে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রায় কলেজেই যেসব ছাত্রদের আইএলটিএসসহ কোন ধরণের ইংলিম কোর্স করা নেই তাদের জন্য ৩থেকে ৬ মাস মেয়াদী স্পেশাল এডভান্সড ইংলিশ কোর্স করার ব্যবস্থা রয়েছে।
এই কোর্সে ভর্তির কাগজপত্র অফার লেটারের সাথে সংযুক্ত থাকা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ইংরেজী ভাষা দুর্বল- এই অজুহাত তুলে বিদায় করার চেষ্টা চালায় বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। ইমিগ্রেশন অফিসারের এসব আপত্তিকর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী। সম্প্রতি লন্ডনে আসা একজন শিক্ষার্থী জানান, হিথ্রো এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন অফিসার তাকে কোর্সে ভর্তির অর্থ প্রদানের মানি রিসিট দেখাতে বলেন। জবাবে তিনি জানান, অফার লেটারটি তার এক বন্ধুর মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে, তাই রিসিটটি তার কাছে নেই। আর এই কারণেই প্রায় তিন ঘন্টা তাকে নানা প্রশ্ন করেছেন ইমিগ্রেশন অফিসার।
পরবর্তীতে একজন সলিসিটর ফোন করলে তাঁকে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
এটাও ঠিক যে, উচ্চ শিক্ষার্থে পড়তে আসা অনেক শিক্ষার্থীই পড়ালেখা না করেই শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা এ দেশে এসেই ভালোমানের কলেজগুলোর যে উচ্চ টিউশন ফি তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাই গত্যন্তর হয়ে পড়ালেখার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কাজে লেগে পড়ে।
উল্লেখ্য, লন্ডনে আসা শিক্ষার্থীরা তাদের আবেদন ভিএফএস এর মাধ্যমে বাংলাদেশস্থ বৃটিশ হাই কমিশনে জমা দেয়। ভিসা রিফিউজ করা হলে পরবর্তীতে প্রায় সকলেই আপিল করে।
ট্রাইবুন্যালে যথাযথ কাগজপত্র উপস্থাপন করতে সক্ষম হলেই আবেদনকারীকে ভিসা প্রদানের জন্য বাংলাদেশস্থ বৃটিশ হাই কমিশনকে লিখিতভাবে জানানো হয়। বৃটিশ হাই কমিশন অনেক সময় ভিসা প্রদানে ৫-৬মাসও দেরী করে ফেলে বলে ভুক্তভোগীরা জানান। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী জানান, ট্রাইব্যুনালে আপিল করে ভিসা প্রাপ্তির পরও এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনে আমাদের প্রশ্ন করে অহেতুক হয়রানী করছে।
হিথ্রো এয়ারপোর্ট যে শুধুমাত্র নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য ডেঞ্জারজোন তা নয়; যারা বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন তাদের মধ্যেও রয়েছে হিথ্রো ভীতি। লন্ডনে বেশ কয়েক বছর পড়াশোনার পর ইমিগ্রেশনের নির্মম শিকার হয়ে অনেকেকইে ফেরত যেতে হয়েছে বাংলাদেশে।
এনআই, একাডেমিক রেজাল্টসহ বিভিন্ন কিছু পর্যবেক্ষণ করে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হচ্ছে তাদেরকে। আর এই ভীতির কারণে বর্তমানে লন্ডনে আছে এমন অনেক বাঙালী শিক্ষার্থীই সামার হলিডে কাটাতে দেশে যায়নি বলেও জানা যায়। এমনকি দেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে টিকিট কনফার্ম করে শেষ মুহুর্তে যাত্রা বাতিল করেছেন অনেকেই।
বৃটেনের অনেক স্থায়ী বাসিন্দাও বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে ফেরত আসতে পারছে না। হিথ্রো থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের।
আর তা হচ্ছে দি ইমিগ্রেশন রেগুলেশন এ্যাক্ট - ২০০৬ এর কারণেই। এই ইমিগ্রেশন এ্যাক্ট হলো - যাদের বাংলাদেশী পাসপোর্টে ব্রিটেনে থাকার অধিকার সম্বলিত রাইট অফ অ্যাবৌড স্ট্যাম্প দেয়া আছে, তাদেরকে পাসপোর্টটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে সাথে নতুন পাসপোর্ট তৈরী করে উক্ত স্ট্যাম্পটি ট্রান্সফার করতে হবে। কিন্তু অনেকে এখনও পুরাতন ও নতুন দুটি পাসপোর্টই একসাথে যুক্ত করে বাংলাদেশে যাতায়াত করার ফলে বিপাকে পড়ছেন।
তবে এসব ব্যাপারে পূর্ব লন্ডনের হোসাইন ল’ এসোসিয়েশনের প্রিন্সিপাল ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসাইন এর অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন শিক্ষার্থীরা অনেক সময় যে কলেজে ভর্তি হয়েছে সে কলেজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না। যখন তাকে ইমিগ্রেশন অফিসার কলেজে অনুসন্ধান চালিয়ে তাঁর ভর্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারলে তাকে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে ফেরত পাঠানোর পদক্ষেপ নেয়।
শিক্ষার্থী যে কলেজে ভর্তি হয়েছে সে কলেজটি বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা কেউ ঐ শিক্ষার্থী সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিলে তাকে স্বাভাবিকভাবে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। এমনকি যারা পড়ালেখা বন্ধ করে সার্বক্ষণিক কাজ করা সহ কলেজেরে টিউশন ফি পেমেন্ট না করার কারণেই তাদের ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটছে। আপিলে জিতে ভিসা নিয়ে লন্ডনে আসার সময় হিথ্রোতে এভাবে নাজেহাল করা সম্পর্কে তিনি বলেন, আইনগতভাবে এই ক্ষমতা ইমিগ্রেশন অফিসারদের আছে, আইনের ভাষায় ‘চেঞ্জ অব সারকামটেন্স’ অনুযায়ী তারা তাদের এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। যদি কারো গতিবিধি সন্দেহজনক হলেও তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে।
এ অবস্থায় কি করণীয়- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন অফিসাররা সাধারণত ল’ ইয়ারের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন না, তবে যদি সে শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিক ভাবে কোন সলিসিটর কিংবা ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয় তবেই হয়তো এ ধরণের সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিলেও সেখান থেকে ইমিগ্রেশন অফিসারের বিরুদ্ধে পুনরায় আপিল করা যায়। এক কথায় এ ধরণের পরিস্থিতির শিকার হলেই ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হওয়াটাই সবচে’ ভালো।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।