আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মানুষ ভজ হে সোনার মানুষ[

হারিয়ে দু ডানা উড়তে শিখেছিল সে একদিন দুঃখ-বেদনাকে যদি সঙ্গী করে নাও তারাও কাজে আসবে কোনোদিন।

মানুষ ভজ হে সোনার মানুষ মধ্যরাতের মেঘলা আকাশ কিছুটা লালচে হয়ে এসেছে। আর চৈত্র্ মাসের লালচে রাতের আকাশ মানেইতো তাণ্ডব। সেদিকে তাকিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে কোদালটা উঁচু করেছে আইনাল। বড় বড় কোপে খুব তাড়াতাড়ি গর্তটা খুড়ে ফেলতে হবে।

কিন্তু এরমধ্যেই তার আশঙ্কা সত্য করে দিয়ে আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা চিড়ে একটা আলোর ঝলকানি খেলে গেল, সাথে মৃদু গর্জন। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রঘুনাথও। মাটি কাটা ভুলে সে একিসাথে বিস্মিত ও মুগ্ধ। -মনে হয় আসমান ফাইট্টা অন্য দুনিয়াত্তে আলো আইয়া পড়ে। কি ফর্সা !চান সুরুজের আলোর থেইক্কাও অনেক তেজ! কত্ত সাদা! - যেই দুনিয়ার আলোই ঔকগা।

আলোডা যে ভালো কিছু না হেইডা বুঝাই যায়। -কেমনে? -মাডিতে পড়লেই অইলে গরীব মানুষ নাইলে গরু-বাছুর আর গাছ-পালা মইরা যায়। অতটা ধর্মভীরু নয় রঘুনাথ। তবে এই গভীর রাত, শুনশান এলাকা সাথে টাটকা লাশের বস্তা এই সব মিলিয়ে তার মধ্যে অন্যরকম ভয় কাজ করছে এবং ভয় কাটাতে হয়তো ধর্মবোধ এখন প্রবল। আইনালের কথায় তাই সায় না দিয়ে রঘু কোদাল তুলে নিয়ে একরকম আস্তিক সুরে বলল, –হ হ।

সবই ঠাকুরের লীলা। -হে হে। কুন ঠাকুরের লীলা? তুমগোর তো আবার একশো পদের ঠাকুর। অনেকটা ঠাট্টার সুরে কথাটা বললেও রঘু মাথায় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠল। ধর্ম পালন করুন আর না করুক কোন মুসলমান তার ধর্ম নিয়ে কিছু বলার কে?সে হুঙ্কারের সুরে বলল, -আইনাইল্লা ধরমো লইয়া কিছু কবিনা।

এই লাশগুলির লগে গাইরা থুইয়া যামু। তোরা দলে ভারি দেইক্ষা দাড়ি আতাবি আর যা খুশি কইয়া যাবি? দাড়িটা যদিও ধর্মীয় অনুভুতিতে রাখেনি আইনাল তবু ঠাট্টা বুঝতে অক্ষম রঘুর উপর তার রাগই হয়। তার উপর নিজের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট একজন তাকে তুই করে বলছে এটা এতটাই গায়ে লাগে যে সে কোদাল উচিয়ে মারার উপক্রম করে রঘুকে। মধ্য বয়সি হলেও রঘুর চেয়ে গায়ে গতরে আইনাল এখনো সবল। তাই রঘুর তুই তোকারিতে গা পাতার কোন প্রশ্নই উঠে না।

এদিকে রঘু শরীরে পাতলা হলেও একটা আধ বুড়োকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ দেখে না। কেউ কারো কাছে নত নয় এই ব্যাপারটা বুঝাতে কাজের তাড়া ভুলে দুজনের চোখই রক্তিম হয়ে উঠেছে। একটা তাৎক্ষণিক হাতাহাতির পর্যায়ে যাওয়ার আগেই তীব্র আলোর ঝলকানি দেখা যায় চারপাশে। দিক বিদিক ফাটিয়ে খুব কাছেই কোথাও বাজ পড়েছে। চিরায়ত নিয়মেই বড় দূর্যোগে সৃষ্টি জগত একত্রিত হয়ে যায়।

সেই নিয়মেই নিজের অজান্তেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে আইনাল হক ও রঘুনাথ। আকাশ ডেকে যাচ্ছে সাথে বজ্রপাতের শব্দ। আশে পাশেই ক্রমাগত বাজ পড়েই বুঝা যাচ্ছে । যার যার প্রভুর নাম ডাকতেও ভুলে গেছে তারা। কিছুটা সয়ে নিয়ে দুজোড়া চোখ খোলা মাঠটা চষে ফেলে সাহায্যের আশায়।

-চলো, বড়ো গাছটার তলে গিয়ে দাড়াই। কাঁপা কন্ঠে বলল রঘুনাথ। এক হাজার টাকার জন্য এই মাঝরাতে খুন হয়ে যাওয়া লাশ মাটি চাপা দিতে কেন এসছিল এখন দুজনেরই ভেবে আফসোস লাগছে। অথচ তখন প্রস্তাবটা কত লোভনীয় লেগেছিল। মাইল বিস্তৃত জংলা মাঠটির দিকে তাকিয়ে আইনাল হকের মনে হলো এই ধরনের খোলা জায়গায়ই মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়।

আইনাল রঘুর হাত ধরে গাছের গুড়ির সাথে আরো একটু চেপে দাড়ায়। তবে দুজনেই উপরে তাকিয়ে বুঝতে পারে গাছটা অনেক পুরানো আর জাতে বট। বিরাট বিরাট ঘন ডালপালা ছাপিয়ে তাঁদের উপর বাজ পড়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। একটু একটু করে স্বস্তির শ্বাস নিতে শুরু করেছে তারা। এখনো আকাশের ঘন ঘন ডাক, বিজলীর চমকানী তবে বাজ পড়ার শব্দ ধীরে ধীরে দুরে সরে যাচ্ছে যেন।

বিপদ কেটে যাওয়ার আগেই, শুধু সম্ভাবনাতেই মানুষ আবার তার মৌলিক বৈশিষ্ঠ্যতে ফিরে আসে। সেই নিয়ম অনুযায়ী আইনালের হঠাৎ খেয়াল হলো সে রঘুর হাত ধরে আছে। আর সাথে সাথে কিছুটা ঝট করেই হাতটা ছাড়িয়ে নিল সে। রঘুও সংবেদ ফিরে পেল যেন। আইনলের হাত ছাড়ানোর ভঙ্গীর মধ্যে যে ঘৃণাটুকু ছিলো সেও যে তার চেয়ে বেশি ঘৃণা বোধ করছে তা বুঝাতে মরিয়া হয়ে উঠল ভেতরে ভেতরে।

অল্প কিছু সময় পার হতেই পরিবেশে কিছুটা নিরাপত্তা অনুভব করে লুঙ্গির খুটি থেকে ম্যাচ আর সস্তার সিগারেট বের করে ফেলেছে আইনাল হক। রঘুও এলোমেলো চুল হাতরে হাতড়ে অস্ত্র খুজে পেয়েছে এর মধ্যে, -ক্ষেপকি কিছু কইছে? বস্তার ভিতরের মাল কি হিন্দু না মুসলমান? -না। কে? দরকার কি জাইন্না? -আমি উড়া উড়া হুনছি এরা শাখাড়ি পাড়ার হিন্দু দুই ভাই। -তো? -কপাল খারাপ এগোর। ইট্টু আগুন ইট্টু পুজা পাঠ পাইলো না?আহারে লাশগুলোর দিকে তাকালো আইনাল।

এখনো বস্তা চুইয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ধর্মের ব্যাপারে কখনোই কিছু জিজ্ঞেসই করা হয়না পার্টিকে শুধু মহিলা হলে আগে বলে দেয় কেউ কেউ। আর কিভাবে লাশটা গুম করতে হবে সেই পদ্ধতিটা। খুন হয়ে যাওয়া মানুষের ধর্ম নিয়ে ভাবার কি?ভাবে আইনাল। আইনাল চুপ করে থাকলেও এবার রঘুতো এখন চুপ করে থাকবে না।

গর্ত খুড়ে ঘৃনার কেচোটা প্রথমেতো আইনালই বের করেছে। রঘু তাই আলগা দুঃখবোধ নিয়ে জিভে চুক চুক শব্দ করে বলল, -আহারে এই দেশে আমরা কপাল পোড়া। গুম খুন হইলেও এই বেজাইত্তাগো মতো মাডি চাপা পড়তে অয়। ইট্টু আগুন পাই না, রঘুর গায়ে পড়া উস্কানিতে এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল আইনাল। ঠোটে সিগারেট পিষে চেপে চেপে বলল, -তাইলে এক কাম কর খতনা কইরা লা।

যেই লাইনে কাম করছ, তোর ও মাডি চাপা পড়নের সম্ভাবনাই বেশি। রঘু ক্ষীপ্র বাঘের মতো লাফ দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ল আইনালের উপর। কিন্তু দস্তাদস্তির শুরু না হতেই চোখ ঝলসানো আলোয় দুজনের শরীর মন দুটোই নিথর হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তীব্র শব্দে মাত্র দশহাত দুরেই পড়েছে শেষ ব্জ্রপাতটি। এতটা আলো এতটা শব্দের কাছে বোবা হয়ে গেছে তাঁদের চেতনা।

থর থর করে কাঁপছে দুজন। তারা যে বেঁচে আছে এই ব্যাপারটা বুঝতে যে সময়টা লাগে তা পার হবার পর বুঝতে পারল, কিছুদুরে তাঁদেরই আনা লাশের বস্তাটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টিটা ধরে গেছে এর মধ্যে। মুসলধারের ঝরছে বিদায়ী বসন্তের বৃষ্টি। আকাশ ডাকাডাকি বন্ধ করে আস্তে আস্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে ।

শুধু ঝমঝম বৃষ্টির পড়ার শব্দ দূর থেকে দূর পর্যন্ত। নিস্তব্ধ আইনাল আর রঘু ও। পোড়া লাশেগুলোর ধর্ম নিয়ে আর ভাবিত হয়নি রঘু । আইনাল ও ভুলে গেছে একটু আগের তর্কের ব্যাপার। কিছুক্ষণ কাটতেই কোদাল তুলে নিয়েছে দুজন।

পোড়া লাশদুটো পাশে রেখে বোবা অনুভূতিতে কেটে চলছে মাটি। আর মিথ্যা হলেও প্রকৃতি তৈরি করেছে তার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য ……………… বৃষ্টির পানিতে বার বার চোখ ঘোলা হয়ে যাওয়াতে দুজনেই কান্নার মত করে বার বার চোখ মুছে মুছে গর্ত খুড়ছে । মনে হচ্ছে যেন , স্বজন-সজাতী ব্যতিরেকে শুধু মানুষের জন্যই এভাবে কাঁদে মানুষ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.