আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জামায়াত পৃষ্ঠপোষকতায় জাবি ভিসি

সত্য প্রকাশে সংকোচহীন

২০০৯ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির। এর পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ উঠতে থাকে। প্রচারণা আছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তার শক্তির উৎস। এছাড়া গোপালগঞ্জ বাড়ি এই ইমেজটাও কাজ করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনÑ উপাচার্যের তোপের মুখে রয়েছেন।

ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আশায় দিন গুণছেন তারা। প্রতিবেদন করেছেন আনিস রায়হান বিএনপি-জামায়াত তোষণ উপাচার্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ জামায়াতপন্থিদের ক্যাম্পাসে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জানা যায়, ২৯ এপ্রিল ২০১০ সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে আওয়ামী প্যানেলের মাধ্যমেই উপাচার্য নির্যাতিত আওয়ামী লীগের শিক্ষকদের বঞ্চিত করে জামায়াত-বিএনপি শিক্ষকদের নির্বাচিত করিয়েছেন। নির্বাচিতরা ছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজা হোসেন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদা আহমেদ, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন, দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী, প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান খান, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুর রব, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মো. আব্দুছ ছালাম, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুজ্জামান এবং পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দা শাহনারা হক। এদের মধ্যে ড. ফিরোজা হোসেন, ড. মো. রফিকুজ্জামান ও মো. আব্দুর রব ২০০০ সালের ১৮ নভেম্বর বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল উদ্বোধনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান বর্জন করে ১৬ নভেম্বর ২০০০ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক পরিষদের (সাদা দল) ব্যানারে অকথ্য ভাষায় লিখিত এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

সেই বিবৃতি দানকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর জসীম উদ্দিন আহমেদ। যিনি বর্তমান উপাচার্যের অন্যতম পরামর্শক। এবারের আওয়ামী প্যানেলে নির্বাচিতদের মধ্যে অধ্যাপক ফাহমিদা আহমেদ, ফিরোজা হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান খান, ড. সৈয়দা শাহনারা হক, মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী ও মো. গোলাম মোস্তফা ১৭ আগস্ট ২০০৫ দেশব্যাপী বোমা হামলার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের বিবৃতিতে ১৮ আগস্ট ২০০৫ স্বাক্ষর দিয়েছেন। উপাচার্য সিনেট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফিরোজা হোসেন, ফাহমিদা আহমেদ, মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী, মো. আব্দুর রবকে। যারা ছিলেন ২৯ জুলাই ২০০৯ বেগম খালেদা জিয়া হলের সামনে স্থাপিত খালেদা জিয়ার ম্যূরাল ভাঙার প্রতিবাদে সাদা দলের বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী।

বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি এবং বিদেশে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে সাদা দলের বিবৃতিতে নাম অন্তর্ভুক্তকারী প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কবিরুল বাশারকে উপাচার্য আওয়ামী লীগের প্যানেলে সিন্ডিকেট নির্বাচন করিয়েছেন। বর্তমানে তিনি এ্যাসিস্ট্যান্ট প্রক্টর। সবচেয়ে মারাত্মক খবর হচ্ছে, উপাচার্য বাগেরহাট জেলার বদর বাহিনীর প্রধান ও ৭২ এর দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত রাজাকার তোফাজ্জল হাওলাদার ওরফে তোফা রাজাকারের পুত্র আব্দুল জব্বার হাওলাদারকে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন নির্বাচিত করিয়েছেন। আব্দুল জব্বার হাওলাদার নানা অভিযোগে অভিযুক্ত প্রভাবশালী দুই অধ্যাপক আব্দুল্লাহেল বাকি ও জামায়াতপন্থী ইলিয়াছ মোল্লারও ঘনিষ্ঠ শিষ্য। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কম বেশি সত্যতা আছে।

তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়টাকে আমরা ইতিবাচকভাবে নিয়েছিলাম। যেহেতু তিনি ছিলেন এই ক্যাম্পাসেরই ছাত্র। অপরদিকে তার একাডেমিক রেকর্ডও অনেক ভালো ছিল। আমরা ভেবেছিলাম ক্ষমতার, রাজনীতির দৌড়ে এগিয়ে থাকার চেয়ে তিনি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নয়নে বেশি ভূমিকা রাখবেন; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তিনি আশঙ্কার সেই পথেই হেঁটেছেন।

জামায়াত বিএনপি পুনর্বাসনের যে কথাটা আসছে সেটা ঠিক আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দুটি অংশ রয়েছে। এদের উভয় দলেই রয়েছে জামায়াত ও বিএনপিপন্থিরা। তবে এটা ঠিক যে উপাচার্য যে অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাতে জামায়াত-বিএনপি লবি বেশি শক্তিশালী। আমার মনে হয় এখন উপাচার্যকে বহিষ্কার করা, নতুন কাউকে আনার মধ্যদিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

সমাধান করতে হলে উপাচার্য মনোনয়নে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হওয়া দরকার। পাশাপাশি শিক্ষকদের সোচ্চার হতে হবে অপরাধী লালনে সরকারসহ বিভিন্ন মহলের চাপের বিরুদ্ধে। ’ শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল প্রকার নিয়োগ বন্ধ ছিল। নতুন উপাচার্য হয়ে অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকালের রেকর্ড ভাঙেন। তার আমলে রেকর্ড সংখ্যক ১৬০ জন দলীয় শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

বাংলা বিভাগ, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, লোক প্রশাসন বিভাগ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, অর্থনীতি বিভাগ, ইতিহাস বিভাগ, প্রতœতত্ত্ব বিভাগ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ফিন্যান্স এন্ড মার্কেটিং বিভাগ, গণিত বিভাগসহ আরো কয়েকটি বিভাগে দলীয় শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, ডিন, সিনেট, সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতেই তড়িঘড়ি করে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। জানা গেছে, বেশ কয়েকটি বিভাগে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে একাধিক অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম থাকা সত্ত্বেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফোকলোর থেকে পাস করা আহসান ইমামকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে আত্মীয় কোটায়। গোপালগঞ্জ কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন দুইবার মাধ্যমিক শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া রেজওয়ানা আবেদীন তন্বী। এছাড়া মেধাক্রমে পেছনের দিকে থাকা নাজমুল হাসান তালুকদার, খন্দকার শামীম আহমেদ ও তারেক রেজা নিয়োগ পেয়েছেন ছাত্রলীগ কোটায়।

তাসনুমা জামান লিমা নিয়োগ পেয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের তদবিরের কোটায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন চালু হওয়া মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস অনার্সে ২৩তম ও মাস্টার্সে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা তার মেয়ে ফারহানা সেহরীনকে নিয়োগ দিয়েছেন। তার অপর মেয়ে ফারজানা সেহরীন এলিজা বর্তমানে অর্থনীতি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত থাকলেও তার নিয়োগ প্রক্রিয়াও মোটামুটি চূড়ান্ত বলে সূত্র জানায়। গণিত বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন মীর মশাররফ হোসেন হলের অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ ক্যাডার সাব্বির আলম। ইতিহাস, প্রতœতত্ত্ব, ফার্মেসি, পরিবেশ বিজ্ঞান এক কথায় সকল বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ ছিল দলীয় ভোটার বৃদ্ধির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।

অথচ এভাবে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়ায় শ্রেণীকক্ষে পাঠদান মানহীন হয়ে পড়েছে ক্রমশ। আওয়ামীপন্থি হওয়া সত্ত্বেও উপাচার্য কেন জামায়াত-বিএনপিকে পুনর্বাসন করছেন এ নিয়ে একটি মহলের ধারণা, উপাচার্যের যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনাকে পুঁজি করেই জামায়াত-বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা তাকে নিয়োগ প্রদানে বাধ্য করছেন। ২০০৩ সালে রসায়ন বিভাগের ল্যাবে জামায়াতি শিক্ষক অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা উপাচার্যকে জনৈক ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় হাতেনাতে ধরেন। এ ঘটনাকে পুঁজি করে জামায়াত-বিএনপি এজেন্ট ওই ছাত্রী, ইলিয়াস মোল্লা ও ড. আ. জব্বার হাওলাদার উপাচার্যকে হুমকি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত-বিএনপি শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে একটি মহল। এদিকে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে আত্মীয়করণের রেকর্ড করেছে বর্তমান প্রশাসন।

৫ আগস্টের সিন্ডিকেটে বর্তমান ট্রেজার অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিনের সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূকে পরিকল্পনা অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেয়া হয়। যদিও আবেদনকারীদের মধ্যে অনেকেরই ভালো রেজাল্ট ছিল। এছাড়া বর্তমান উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী, প্রক্টরের স্ত্রী, কলা ও মানবিক অনুষদের ডিনের স্ত্রী, শহীদ সালাম বরকত হলের প্রাধ্যক্ষর স্ত্রী, পরিবহনের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসকের স্ত্রীসহ আরো অনেককে জাহাঙ্গীরনগর স্কুল এন্ড কলেজসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নতুন করে সহকারী নিরাপত্তা অফিসারের পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তৎকালীন ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডার আজিমুদ্দিন আজিমকে। উপাচার্যের সপক্ষে তার দাপটে ক্যাম্পাস এখন অস্থির।

উপাচার্যের শিক্ষক নিয়োগের নানা দুর্নীতি নিয়ে শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি অধ্যাপক মজিবর রহমান বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন সভা, সেমিনারে উঁচু গলায় শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলেন; কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তিনি যেভাবে একের পর এক অযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে চলেছেন তাতে আমার মনে হয় অল্পদিনেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার মান বলে অবশিষ্ট কিছু থাকবে না। জামায়াত-বিএনপিপন্থিদের তিনি যে শুধু পুনর্বাসন করেছেন তা নয়। বরং তাদের তিনি প্রতিষ্ঠিতও করেছেন। জামায়াত-বিএনপিপন্থিদের ক্ষমতায়নে তার ভূমিকা চোখে পড়ার মতো।

তিনি আওয়ামী লীগের ব্যানারে ক্ষমতায় আছেন। এটা আওয়ামী লীগের জন্য বিপজ্জনক। কারণ সরকার যে সমস্ত বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয় বা যেসব নীতিতে বিশ্বাস করে তার কর্মকা-ে সে সমস্ত কিছুর কোনো ছাপ নেই। বরং এমন সব কাজ তিনি করছেন যা সরকারের নীতির বিরোধী। তার কর্মকা-ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আজ বিব্রত, উদ্বিগ্ন।

ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে তাকে অপসারণ করা উচিত। ’ যৌন নিপীড়নকারীদের রক্ষা বিগত দু’বছরে ক্যাম্পাসে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহেল কাফী এবং নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ সানির বিরুদ্ধে আনীত যৌন হয়রানি অভিযোগের বিচার শিক্ষকদের রাজনীতিতে ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টি করে। দুই শিক্ষকই আওয়ামীপন্থি হওয়ায় তাদের পক্ষপাতমূলক বিচারের মাধ্যমে রেহাই দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি আব্দুল্লাহেল কাফীসহ দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগের এক শিক্ষিকা বিভিন্ন সময়ে ৫ বার মৌখিকভাবে ও ১ বার লিখিতভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। এরপরও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ওই শিক্ষিকা ১৫ এপ্রিল ২০১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ জন শিক্ষিকাকে নিয়ে উপাচার্য বরাবর আবারো লিখিত অভিযোগ করেন।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের লঘু শাস্তি প্রদান করেন। প্রশাসনের বহুপদে আসীন আব্দুল্লাহেল কাফীকে সকল পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে সহযোগী অধ্যাপক থেকে পদাবনতি ঘটিয়ে সহকারী অধ্যাপক করা হয়। ২০০৯ সালে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ সানির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন ওই বিভাগের ৬ শিক্ষার্থী। তৎকালীন প্রশাসন তাকে অভিযোগ থেকে রেহাই দিলেও বর্তমান প্রশাসন আবার উচ্চ আদালতের আদেশে ঘটনার পুনর্তদন্ত করেন। তদন্তে তার দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ওই শিক্ষককে বেতন-ভাতাসহ সকল সুবিধা বজায় রেখে ২ বছরের বাধ্যতামূলক ছুটি প্রদান করে।

যা অনেকের কাছে প্রহসন হিসেবে বিবেচিত হয়। এর আগে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. গোলাম মোস্তফা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তানভির সিদ্দিককে যৌন হয়রানির অভিযোগে স্থায়ী বহিষ্কার করা হলেও অধ্যাপক সানির বিরুদ্ধে এমনটা ঘটেনি। অভিযোগ রয়েছে উপাচার্যের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের বরাতেই তার এই সৌভাগ্য। টেন্ডারবাজি টেন্ডারবাজিতে স্বয়ং উপাচার্যের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নবনির্মিত রফিক-জব্বার হলের নির্মাণ কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য ছাত্রলীগ নেতা মাহফুজ উপাচার্যের আশীর্বাদে বাংলাদেশ ফাউন্ড্রি এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ লিমিটিডের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা আদায়ের চুক্তি করেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

পরবর্তীতে উপাচার্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে চুক্তিকৃত ৩২ লাখ টাকা নিজেই আত্মসাৎ করেন। প্রতিবাদ করায় উপাচার্য মাহফুজকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন করেন। ১০ কোটি টাকার বাজেটে বরাদ্দ ‘ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রে’র কাজ পছন্দের অনিক ট্রেডার্সকে পাইয়ে দেয়ার জন্য ছাত্রলীগের মাধ্যমে পুরনো কায়দায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে রেখেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাছাড়া বিনা টেন্ডারে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনের রাস্তা মেরামত, পুরাতন কলার সামনের ভবন মেরামত, কর্মচারীদের ক্যান্টিনসহ প্রায় ৩২ লাখ টাকার কাজ বিনা টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে দেন। এর বিনিময়ে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের উৎকোচ।

এ সমস্ত বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। খুঁটির জোর এসব কর্মকাণ্ড করে কীভাবে পার পাচ্ছেন উপাচার্য। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালালে উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, রাজনৈতিক সামাজিক উন্নয়ন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদের নাম। জানা গেছে, তিনিই উপাচার্যের মূল শক্তি। তার কারণেই উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ধোপে টিকছে না।

এছাড়া গোপালগঞ্জ বাড়ির বরাতে নানা ক্ষেত্রে শোনা যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও রয়েছে উপাচার্যের সরাসরি কানেকশন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আওয়ামীপন্থি অধ্যাপক বলেন, ‘নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ আছে বলে তিনি দাবি করেন। মনে হয়, এই যোগাযোগের সুবাদে তিনি নেত্রীকে এটা সেটা বুঝিয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন। তবে এ অবস্থা বেশিদিন চলবে না। তার যে পরিমাণ বাড় বেড়েছে, ধরা তিনি খাবেনই।

’ সশস্ত্র সন্ত্রাসী লালন উপাচার্য ক্যাডার বাহিনী হিসেবে সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মীদের একাংশকে লালন পালন করেন। তার মদদপুষ্ট মুরগি চোর নামে খ্যাত সরকার আজগর আলী এবং গোপালগঞ্জ কোরামের ও ছাত্রলীগের বহিস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সহ-সভাপতি শেখ নেয়ামুল পারভেজের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে উচ্ছৃঙ্খল, অস্ত্রবাজ বিশাল এক ক্যাডার বাহিনী। এদের ভয়ে ক্যাম্পাসে কেউ মুখ খুলতে পারেন না। এমনকি নিয়মতান্ত্রিক কোনো আন্দোলনে যেতেও ভয় পান শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরাও থাকেন নানা ধরনের ভয়-ভীতির মধ্যে।

উপাচার্যের মদদপুষ্ট ক্যাডার বাহিনীর মধ্যে রয়েছেন মাওলানা ভাসানী হলের ছাত্রলীগ কর্মী শাকিল ও সম্রাট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের অরূপ ও তিলন। শহীদ সালাম বরকত হলের রাজিব, মিশুক, রাহাত ও চয়ন। আল বেরুনী (বর্ধিতাংশ) হলের রাজু, শামিম ও রাসেল। আল বেরুনী (প্রধান ভবন) হলের আরিফ।

কামাল উদ্দিন হলের জাকারিয়া, মোস্তাফিজ, বাবুল। মীর মশাররফ হোসেন হলের তন্ময়, পাপন, লিখন, নিজাম ও অভি। এরা প্রত্যেকেই দুর্র্ধষ প্রকৃতির। জানা গেছে, উপাচার্যের প্রত্যক্ষ মদদে এরাই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ত্রজগৎ। মূলত হলভিত্তিক সশস্ত্র গ্র“প পালনের মাধ্যমে প্রশাসনের নানা এসাইনমেন্ট এরা বাস্তবায়ন করে থাকে।

প্রশাসনের নির্দেশে, উপাচার্যের ইশারায় ক্যাম্পাসে তাদের অপকর্মের আমলনামা ইতোমধ্যে অনেক ভারি হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে অর্থনীতি বিভাগের ৩৩তম ব্যাচের সরকার আজগর আলী ও বাংলা বিভাগের ৩৩তম ব্যাচের শেখ নেয়ামুল পারভেজের ছাত্রত্ব বহু আগেই শেষ হয়ে গেলেও উপাচার্য বিশেষ ক্ষমতাবলে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রেখে ক্যাম্পাসে তাদের স্থায়ী করেছেন। ক্যাম্পাসে উপাচার্যের শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১ ফেব্র“য়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ছাত্রলীগের মূল কমিটির পক্ষের নেতাকর্মীদের বিতাড়িত করে অস্ত্রধারীদের হলে ওঠানো হয়। এদিন উপাচার্যের বাসায় মিটিংয়ে সিদ্ধান্তের পর গাড়িতে করে প্রক্টর অধ্যাপক আরজু মিয়ার নেতৃত্বে অস্ত্রধারী শামিম ও শরীফকে হলে ওঠানোর চেষ্টা করা হয়। এ সময় সহকারী প্রক্টর নাজমুল হাসান তালুকদার, কবিরুল বাশার সঙ্গে ছিলেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে গভীর রাতে হল তল্লাশির নামে প্রায় দুইশ পুলিশের উপস্থিতিতে অস্ত্রধারীদের হলে ওঠানো হয়। এ সময় সহকারী প্রক্টর কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসগর-পারভেজের নেতৃত্বে প্রায় ৩০-৪০ জন সশস্ত্র ক্যাডার বঙ্গবন্ধু হলে প্রবেশ করে। বিতাড়ন করে মূল কমিটির পক্ষের নেতাকর্মীদের। এ সময় লুটতরাজ, হামলা ও ভাঙচুরও করা হয়। পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক স্বপন কুমার ধর বলেন, ‘আওয়ামী লীগ তাকে বসিয়েছে আর আওয়ামী লীগকে তিনি ধ্বংস করছেন।

ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগসহ প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে হটিয়ে নিজের একটা সশস্ত্র গ্রুপ দিয়ে কর্মকা- পরিচালনা করছেন। ক্যাম্পাসে শিক্ষার মানোন্নয়ন, সাংস্কৃতিকচর্চা সব আজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার দাপটে এবং তার সন্ত্রাসী গ্রুপের তা-বে আজ সবাই অস্থির। ’ হাতিয়ার যখন বহিষ্কার উপাচার্য ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মীদের বিভিন্ন অজুহাতে বহিষ্কারের মাধ্যমে একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দু’বছরে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্রলীগ কর্মীকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কারণ ছাড়াই বিভিন্ন অজুহাতে আজীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করেন।

গত ৫ জুলাই’র সংঘর্ষে উপাচার্য সংঘর্ষরত ছাত্রলীগ কর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদ দেন, ‘তোরা মারামারি কর, বিচার তো আমি করব। ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে এমন ন্যক্কারজনক উস্কানির প্রতিবাদ করায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে, বিনা দোষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মাহী মাহফুজকে বহিষ্কার করা হয়। উপাচার্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তোলা তাই শিক্ষার্থীদের পক্ষে অসম্ভব। বহিষ্কারের খড়গের ভয়ে ভীত পুরো ক্যাম্পাস। উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব, পরিসংখ্যান বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. এম এ মতিন বলেন, ‘আমরা ইতোপূর্বে একটি বিবৃতিতে বলেছি উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো মিথ্যে হলে তিনি তো মানহানির মামলা করতে পারতেন।

অথবা উপাচার্য বা প্রশাসন এগুলোর জবাব দিতে পারত। তাদের উচিত ছিল বিষয়গুলো স্পষ্ট করা; কিন্তু তারা তা করেননি। এতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ মনে করবে যে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সঠিক। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি, কেউ তো এই দায়ভার বহনের জন্য এখানে আসিনি। যেহেতু উপাচার্য এখনো বিষয়গুলো খোলাসা করতে পারেননি।

তাই আমি মনে করি, উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার আর কোনো অধিকার তার নেই। তাছাড়া ইতোপূর্বে ক্যাম্পাসে তিনি অনেক কিছু ঘটিয়েছেন যা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্কসের পরিমাণ ৩৫ থেকে নামিয়ে যে ২৫ এ এনেছেন। এটা করার অধিকার তো তার নেই। ক্যাম্পাসে আজ বাক স্বাধীনতা নেই।

তার বিরুদ্ধে বা ন্যায়ের পক্ষে আজ কথা বলা যায় না। এমনটা চলতে পারে না। তার উচিত পদত্যাগ করা। নতুবা তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা উচিত। ’ সাংস্কৃতিক চর্চার গলা টিপে ধরা সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, নানা প্রকার অযাচিত বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্যকে নষ্ট করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এর ফলে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে সেলিম আল দীনের স্মৃতিবিজড়িত এই ক্যাম্পাস। স¤প্রতি রাতে ছাত্রী হলে ফেরার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা হ্রাস করা হয়েছে। এ নিয়মটা আগে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য থাকলেও বর্তমানে নেই। সাংস্কৃতিকচর্চায় তাই নিয়মিত সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে কর্মীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত ও উদার মানসিকতার শিক্ষার্থীদের আড্ডাস্থল বটতলায় খাবার দোকান খোলা রাখার সময়ের ওপরও আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। রাত ১১টার পর দোকান খোলা রাখলে দোকানিদের গুণতে হয় দুই হাজার টাকা জরিমানা। ফলে রাতে ক্যাম্পাসের নয়টার গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফেরা শিক্ষার্থীদের খাদ্য সমস্যায় পড়তে হয় নিয়মিত। তাছাড়া অডিটরিয়াম, মুক্তমঞ্চ, সেমিনার রুমের ভাড়া বৃদ্ধি, গার্ড থাকা সত্ত্বেও আবৃত্তি সংগঠন ‘ধ্বনি’র রুম ভস্মীভূত, সাংস্কৃতিক উৎসবে অতিথি নির্বাচনে জটিলতা পাকানো, মিছিল, র‌্যালি, মাইকিং, পোস্টারিংয়ের ব্যাপারে সীমা আরোপকে সাংস্কৃতিকচর্চার মুক্ত পরিবেশ নষ্ট করার ষড়যন্ত্র বলেই মনে করেন শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মাহী মাহফুজ বলেন, ‘এসব বিধিনিষেধের মাধ্যমে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু সাংস্কৃতিকচর্চার পরিবেশকেই নষ্ট করা হচ্ছে।

’ গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর চাপ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বস্তুনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও উপাচার্য কিংবা প্রশাসনের কারো বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হলেই ক্ষেপে যান উপাচার্য। প্রতিবেদককে ফোন করে হুমকি-ধমকি দেয়া তার নিয়মিত স্বভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের গালিগালাজ তার আলোচনার একটি অন্যতম অংশ। এর আগে যৌন হয়রানি সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ অফিসে সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকাটি।

এককালীন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দৈনিক কালের কন্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন। মাওলানা ভাসানী হলে ‘পানিবাহিত রোগে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদন করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাংবাদিক মাহফুজুল হককে শোকজও করা হয়। যৌন নিপীড়ক শিক্ষক আব্দুল্লাহেল কাফি’র বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য যখন চ্যানেল আই’এর প্রতিবেদক ক্যামেরার সামনে উপাচার্যের বক্তব্য নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত সমকালের প্রতিনিধি সানাউল্লাহ সাকিব তনুকে কাছে পেয়ে উপাচার্য তার স্বমহিমায় আবির্ভূত হন। ক্যামেরার সামনেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবেননি তিনি। সবার সামনেই ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন উপাচার্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকাল প্রতিনিধি সানাউল্লাহ সাকিব তনু বলেন, ‘উপাচার্য নানাভাবে গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন। সাংবাদিকদের দমিয়ে রাখার জন্য প্রক্টর, সংশ্লিষ্ট বিভাগ, সাংবাদিক সমিতিকে ব্যবহার করছেন তিনি। এমনকি সরাসরি পত্রিকা অফিসকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা চালান তিনি। ’ এছাড়া গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর খবরদারি চালাতে ব্যবহার করা হয় জনসংযোগ শাখাকে। উপাচার্য বা প্রশাসনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে কোনো সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে ওঠেন জনসংযোগ কর্মকর্তা।

খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন কে সংবাদটি তৈরি করেছে, কে সংবাদ তৈরিতে সহযোগিতা করেছে। ছাত্রলীগে হস্তক্ষেপ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদ ২২ মাস অতিক্রম করেছে। এই সময় পর্বে ছাত্র রাজনীতিতে অস্থিরতা কখনোই পিছু ছাড়েনি। এর কেন্দ্রে ছিল ছাত্রলীগ। আর ছাত্রলীগের কাঁধে চড়ে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

স্বয়ং উপাচার্য নিজের সুবিধার জন্য ছাত্রলীগের নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন বেআইনি ও অন্যায়ভাবে। এ বছরের ১৯ মে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশেদুল ইসলাম শাফিনকে সভাপতি ও নির্ঝর আলম সাম্যকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু উপাচার্যের এলাকার সাগর, শামিম, প্রিতম পদবঞ্চিত এবং পারভেজ ছোট পদ পাওয়ায় তিনি এ কমিটিকে মেনে নিতে পারেননি। এর জের ধরে উপাচার্য তার পক্ষের ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলেন আলাদা একটি গ্রুপ। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে এই গ্রুপটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারিদের মধ্যে ঢুকে পড়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়।

৫ জুলাই আল বেরুনী হলে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সাধারণ সম্পাদক গ্র“পের এমিলের কর্মীরা সভাপতি গ্র“পের সজীবকে মারধর করে। এর জের ধরে পুরো ক্যাম্পাস সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক গ্র“পে বিভক্ত হয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মেতে ওঠে। এ ঘটনায় এমিলসহ তার গ্র“পের ৫/৬ জন কর্মীকে হলের ছাদ থেকে পিটিয়ে ও গুলি করে আহত করে নিচে ফেলে দেয়া হয়। সংঘর্ষের সময় ৭/৮ জন গুলিবিদ্ধসহ ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়।

উভয় পক্ষে ৩০ রাউণ্ড গুলিবিনিময়ের ঘটনাও ঘটে। পরিকল্পনামাফিক এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘর্ষের দায়ে উপাচার্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ২ বছর এবং ৬ জনকে আজীবনসহ আরো ১৩ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন। এ ঘটনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বিপক্ষের ছাত্রলীগের হাত থেকে মুক্ত করা হয়। এরপর উপাচার্য ইন্ধন দিয়ে বিষয়গুলো মিডিয়ার সামনে এনে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন যে, জাবি ছাত্রলীগ এখন সারা দেশের মানুষের কাছে ঘৃণীত। এ কাজগুলো তিনি অসাধারণ যোগ্যতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।

উপাচার্যসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন, বিপথে চালিত করেছেন এমন অভিযোগের সত্যতা প্রমাণীত হয় গোপনে রেকর্ড করা উপাচার্যের এক আলাপচারিতা থেকে। ‘প্রশাসন তোমাদের দেখবে...মিছিল করো। একটারে বানাও শিবির, একটারে বানাও ছাত্রদল’ খোদ প্রক্টরের এমন বক্তব্যের রেকর্ড পাওয়া গেছে। ওই রেকর্ডে উপাচার্যও রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে, নিজের অবস্থান শক্ত করতে ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টির নীলনকশা করাকালীন রেকর্ডটি করা হয়।

রেকর্ডে শোনা যায় উপাচার্য তার নিয়ন্ত্রণে আনতে চাচ্ছেন ছাত্রলীগের এমন একটি অংশকে বলছেন, ‘আমার যে অভিজ্ঞতা তাতে আমি জানি কি করতে হবে, ইভেন তোমরা নাও থাক আমার সঙ্গে (উত্তেজিত হয়ে) কয় মিনিট স্টে করবে? এক ঘণ্টা? দুই ঘণ্টা? তারপর তো ব্যবস্থা, এরেস্ট...আমার কথা হলো যে ওদের তোমরাই আসতে দিবা না, বিশ্বাস করি। একটি শোডাউন, একটি প্রোগ্রাম এভাবে চালালে ওরা ভয় পাবে। আমার মনে হয়, এটাই ভালো হবে। ’ এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের স্থগিত বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্ঝর আলম সাম্য বলেন, ‘উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগে তিনি ছাত্রদলের একটি গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। উপাচার্য হওয়ার পর তিনি তাদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেন।

এরপর নিজের নানা দুর্নীতি ঢাকতে এবং ক্ষমতাকে সুসংহত করতে গিয়ে ছাত্রলীগের প্রতিবাদের মুখোমুখি হন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সব সময়েই তার সব অপকর্মের বিরোধিতা করেছি। তিনি আমাদের অনেককে অনেক লোভ দেখিয়েছেন; কিন্তু আমরা তার দলে যোগ না দেয়ায় তিনি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে উচ্ছেদের জন্য নানা পরিকল্পনা ফাঁদেন। এর অংশ হিসেবে প্রথমে তিনি অঞ্চলভিত্তিক অর্থাৎ গোপালগঞ্জের একটি গ্রুপ তৈরি করেন। তাদের দিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হয়।

এক পর্যায়ে ক্যাম্পাসের শক্তিশালী এই প্রগতিশীল সংগঠনটিকে ভঙ্গুর করে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কারসহ নানা উপায়ে বের করে দেয়া হয়। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে উপাচার্যকে অপসারণ এবং বিচারের মুখোমুখি করা উচিত বলে আমি মনে করি। ’২০০৯ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির। এর পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ উঠতে থাকে। প্রচারণা আছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তার শক্তির উৎস।

এছাড়া গোপালগঞ্জ বাড়ি এই ইমেজটাও কাজ করছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনÑ উপাচার্যের তোপের মুখে রয়েছেন। ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আশায় দিন গুণছেন তারা। প্রতিবেদন করেছেন আনিস রায়হান বিএনপি-জামায়াত তোষণ উপাচার্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ জামায়াতপন্থিদের ক্যাম্পাসে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জানা যায়, ২৯ এপ্রিল ২০১০ সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনে আওয়ামী প্যানেলের মাধ্যমেই উপাচার্য নির্যাতিত আওয়ামী লীগের শিক্ষকদের বঞ্চিত করে জামায়াত-বিএনপি শিক্ষকদের নির্বাচিত করিয়েছেন।

নির্বাচিতরা ছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজা হোসেন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদা আহমেদ, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাঈল হোসেন, দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী, প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান খান, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুর রব, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মো. আব্দুছ ছালাম, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকুজ্জামান এবং পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দা শাহনারা হক। এদের মধ্যে ড. ফিরোজা হোসেন, ড. মো. রফিকুজ্জামান ও মো. আব্দুর রব ২০০০ সালের ১৮ নভেম্বর বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল উদ্বোধনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠান বর্জন করে ১৬ নভেম্বর ২০০০ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক পরিষদের (সাদা দল) ব্যানারে অকথ্য ভাষায় লিখিত এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। সেই বিবৃতি দানকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর জসীম উদ্দিন আহমেদ। যিনি বর্তমান উপাচার্যের অন্যতম পরামর্শক। এবারের আওয়ামী প্যানেলে নির্বাচিতদের মধ্যে অধ্যাপক ফাহমিদা আহমেদ, ফিরোজা হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান খান, ড. সৈয়দা শাহনারা হক, মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী ও মো. গোলাম মোস্তফা ১৭ আগস্ট ২০০৫ দেশব্যাপী বোমা হামলার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শিক্ষক পরিষদের বিবৃতিতে ১৮ আগস্ট ২০০৫ স্বাক্ষর দিয়েছেন।

উপাচার্য সিনেট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফিরোজা হোসেন, ফাহমিদা আহমেদ, মুহাম্মদ তারেক চৌধুরী, মো. আব্দুর রবকে। যারা ছিলেন ২৯ জুলাই ২০০৯ বেগম খালেদা জিয়া হলের সামনে স্থাপিত খালেদা জিয়ার ম্যূরাল ভাঙার প্রতিবাদে সাদা দলের বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী। বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি এবং বিদেশে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবিতে সাদা দলের বিবৃতিতে নাম অন্তর্ভুক্তকারী প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কবিরুল বাশারকে উপাচার্য আওয়ামী লীগের প্।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.