নিঃস্বার্থ মন্তব্যকে ধন্যবাদ, সাময়িক ভাবে আমি মন্তব্যে নেই
(কন্যা সমর্পণের একটি পরিচিত দৃশ্য থেকে এই লেখার প্রেরণা। যেহেতু বাড়তি নাটকীয়তা নেই, এটি গল্পও নয়। বলা চলে আটপৌরে রচনা। )
ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক শব্দ করে যাচ্ছে। কন্যার হাতটা প্রথামত তার পিতা তুলে দিয়েছে ছেলের হাতে।
মেয়ের সামনে আনন্দময় ভবিষ্যত। বাবার জন্য এর চেয়ে আনন্দের কিছু নেই। অথচ সেই আনন্দের উল্টো পিঠে নিরর্থক কিছু কষ্ট। মেয়েটির চোখে মুখে পুর্ণতার প্রতিচ্ছবি। সেখানেও হঠাৎ একটা কষ্ট উড়ে আসে বাজপাখীর মতো।
সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখেছে লাল চেলি, স্বর্ণালী ঝিলিক, মেহেদি রাঙা হাত - সেই লাজনম্র শাড়ীটা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায় । তারপর বাবার দিকে ফিরে প্রকাশ্যে বাবাকে জড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, "বাবা, বাবা"। অতিথিবৃন্দ তখন উৎসবের ঘনঘটায় ডুবে আছে। মুহুর্তটি দু'জন ছাড়া কেউই টের পায় না। আর বিজলিছুড়ে দেয়া চিত্রগ্রহণযন্ত্রগুলো শুধু বাইরের ছবি আর শব্দ রেকর্ড করতে জানে ।
লোকারন্য কোলাহলে মত্ত। রসনাপুর্তি, উচ্চগ্রামের সঙ্গীত, ব্যস্ততা এবং চঞ্চলতা বিবাহের রীতি। আর সেখানে বিরাম চিহ্নের মতো স্থির হয়ে আছে চিরন্তন এক সম্পর্ক - তাদের পরিচয় - পিতা আর কন্যা । দেয়ালের আলপনা, কাগজের পতাকা, উজ্জ্বল আলোর ঝলসানি নিভে যায় তাদের চোখের পাতায়। বাবা প্রথম বারের মতো নিশ্চিত হয় কন্যাটি দুরবর্তী ধুমকেতুর মতো সীমানার আড়ালে নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটার জন্মের সময় বাবার নিদারুণ অর্থাভাব। থাকে বাঁশের চাটাইয়ের ঘরে। উদ্বিগ্ন ছট ফট রাত । মায়ের নাড়ী থেকে কন্যা আলাদা হওয়ার পর সবাই হেসেছে। বাবার কোলে তুলে দেয়া হয়েছে ফুট ফুটে এক নবজাতককে।
পৃথিবীর সমস্ত বাবার মতো সেও আনন্দে উচ্ছাসে নিজেকে সুখী ভেবেছে । একটি মুহুর্তের জন্য সেলাই করা জুতো, আলুভর্তা ডালের নিয়মিত আহার, কাঠের ঘুনে ধরা চেয়ার ভুলে গিয়ে নিজেকে মনে হয়েছে সম্রাটের মতো বিজয়ী। আজ জীবনচক্র সেই জন্মের আনন্দক্ষণটি বদলে নিতে চায় খন্ড খন্ড জমাট বাঁধা বরফ দিয়ে । রাতে ঘরে ফিরে আর সে দেখবে না মেয়েটিকে। সকালে কিংবা অফিস ফেরার পর চাইলেই ডেকে নিতে পারবেনা প্রিয় কন্যাকে।
সুদীর্ঘ বিরতিতে ভিন্ন বাড়ি থেকে কন্যা দীর্ঘদিন পর বেড়াতে আসবে, তার পরিচয় তখন অন্যঘরের মানুষ।
সৌরজগতের কাছে সেকেন্ডের অভাব নেই। সময় তার কাছে নিরামিষ। অথচ কতবার সে কৃপণের মতো তার ঝুলি থেকে কষ্টের মুহুর্ত তুলে আনে ।
মেয়েটি চলে যাচ্ছে।
সানাইয়ের সুর ম্লান করে। বাবা দেখছে গাড়ির দরজা বন্ধ হয়। কাঁচ উঠে যায়। স্ট্রিটলাইট আর বিয়ের রঙিন আলো চিরে একটা যান্ত্রিক শকট যেন তার বহুসময়ে লালিত স্মৃতিগুলো তুলে নিয়ে যায়। গাড়ি সামনে এগোয়।
বাধানো গেট, ডেকোরেটরের বাঁশ, রান্নার আয়োজনের দৃশ্য, ঝুলন্ত মরিচবর্তিকাসহ বিবিধ দৃশ্যসমূহ বয়স্ক লোকটির চোখে অসহ্য লাগে।
পিতার সঙ্গে কন্যার সম্পর্কটি অতুলনীয় । সেই সময়ের কথা। সে শুধু কন্যাটির মুখদর্শনের জন্য আগে আগে বাড়ি ফিরে এসেছে। প্রায়ই ফেরার পথে সস্তা হলেও একটা জামা কেনা হয়।
কখনো দামদর করেও সাধ্যে হয় না। কখনো বৃষ্টি থেমে গেলে কাল ছাতাটা ভাঁজ করে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থেকে দোকানের জানালায় চেয়ে রয়। ইচ্ছে হয় কাঁচের জানালায় সাজানো ঝলমলে জামাগুলো কিনে ফেলে কপালে কাজলের টিপ দেয়া তার ছোট পুতুলটার জন্য।
মেয়েটা একটু বড় হলে বইমেলায় তাকে আঙুল ধরিয়ে নিয়ে সে হেঁটেছে। কিনে দিয়েছে মজার ছড়া আর রূপকথার গল্পের বই।
বিছানায় শুয়ে আব্দার মেটতে গিয়ে উলটেছে নতুন নতুন পাতা। কি করে রাজকন্যাকে ঘোড়া ছুটিয়ে নিয়ে যায় রাজপুত্র আর রাক্ষস রাজাকে বন্দী করে উঁচু পাহাড়ের চুড়ায়। আজ সময় নামের রাক্ষস তাকে অবরুদ্ধ করে দিচ্ছে। এটাই সংসারের রীতি। মেয়েকে চাইলেও সে ধরে রাখতে পারে না।
তার মা তার বাবার সংসারে এসেছে এভাবে, সে নিজে বিয়ে করে অন্য বাবার কন্যাকে নিয়ে এসেছে তার ঘরে। এভাবে প্রত্যেকেই একই বিচ্ছেদের সুড়ঙ্গে ভবিষ্যতে পাড়ি দেয়।
নদীর নতুন চর জাগাতে অন্য পার ভাঙতেই হয়। বাবার জানে সে একা এমন নয়। ভবিষ্যতের সম্ভাবনার জন্য এ এক বিসর্জন, জীবন চক্রে শত সহস্র বছর এভাবেই এক সংসারের ডাল থেকে নতুন সংসারের কুঁড়ি জন্ম নেয়, শাখা বিস্তার করে মানুষ বেঁচে থাকে।
তারপরও অবুঝ বুকটা নদীর মতো ভেঙে যেতে থাকলে চশমার কাঁচ মুছে বিন্দুর মত গাড়িটার মিলিয়ে যাওয়া দেখে।
গাড়িটা চলে গেলে বাইপাস করা শরীরে পিতা ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে। শূণ্যতাকে সঙ্গী করে।
-
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।