মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
অনিয়মের ভালো লাগা (গল্প) - পর্ব ১
-------------- ডঃ রমিত আজাদ
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেলো। ঘন কালো চুল, ডাগর কালো আঁখি, বাদামী গাত্রবর্ণ (আমাদের দেশের হিসাবে হবে ফর্সা, কিন্ত এই দেশে ঐ রঙটিকে চকোলেট কালার বলা হয়, যেহেতু রুশরা ভীষন সাদা রঙের হয়)। এই ধরনের মেয়েদের হয় ব্রুনেট অথবা ব্রাউন গার্ল বলা হয়। হঠাৎ মনে পড়লো স্কুল জীবনের একটা গানের কলি। আমাদের ক্লাসের রাসেল নেচে নেচে খুব সুন্দর গাইতো, "ব্রাউন গার্ল ইন দ্যা রেইন, শা লা লা লা লা।
দেয়ার ইজ এ গার্ল ইন দ্যা রেইন শা আ আ লা লা লা লা লা। " এবার মনে স্বভাবতঃই প্রশ্ন জাগলো, মেয়েটি কি আমার বাংলাদেশের? আবার ভাবলাম নাও হতে পারে, ইন্ডিয়ানও হতে পারে, পাকিস্তানের সিন্ধীরাও দেখতে অনেকটা আমাদের মতোই। অনেক কিছুই হতে পারে, আপাতত ওকে প্রশ্ন না করে ওর দেশ পরিচয় জানা সম্ভব নয়। তবে এই মুহুর্তে সেই প্রশ্ন করার পরিস্থিতি নেই। এটা ক্লাসরূম, আর আপাততঃ আমি ওর টীচার।
যদিও এটা স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম নয়।
আমি অনেকগুলো বছর মস্কোতে থাকি। এখানেই পড়ালেখা শেষ করে একটি বড় কোম্পানীর পদস্থ কর্মকর্তা। কোম্পানীটির নাম 'চেরিশ্নী সাদ' মানে চেরিফুলের বাগান। বেশ কাব্যিক নাম।
একসময় আমার ধারণা ছিল যে, শুধু জাপানেই চেরি ফুল ফোটে। এর সাথে সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত শব্দ 'সাকুরা'। আরও রয়েছে উৎসব 'হানামি'। জাপানে অধ্যয়ন করেছে এরকম একজন বাংলাদেশীকে একবার 'সাকুরা' ও 'হানামি' সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি ভালো উত্তর দিতে পারলেন না।
পরে বললেন যে, তিনি জাপানী ভাষা ভালো জানেন না, পি,এইচ,ডি, করেছেন ইংরেজীতে, তাই জাপানের কালচার সম্পর্কে ভালো আইডিয়া নেই। এই একটা সমস্যা আমি লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশীরা অনেক দেশেই যায় কিন্তু সেখানকার ভাষা শিক্ষায় আগ্রহ দেখায় না। ফলে ঐ দেশটাকে তারা ভালোভাবে বুঝতে পারে না। কোন একটি দেশের ভাষা জানা না থাকলে ঐ দেশ বা সমাজকে পেনিট্রেট করা যায়না। এদিক থেকে রাশিয়ায় ভালো, সব বিদেশী ছাত্রকেই বাধ্যতামূলক রুশ ভাষা শেখানো হয়।
ফলে তারা রাশিয়াকে ভালো বুঝতে পারে। চেরি ফুলের যে কথা বলছিলাম, রাশিয়া এসে দেখলাম, এখানেও অজস্র চেরি গাছ রয়েছে।
এখন আমি এসেছি 'আভানগার্দ' নামে একটি কোম্পানীতে ক্লাস নিতে। আই.টি. ও অফিস ম্যানেজমেন্টের উপর মূলতঃ ক্লাসটি। 'আভানগার্দ' কোম্পানীর মালিক আবার আমাদের কোম্পানীর মালিকের বন্ধু।
আমাদের মালিকই আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, "তুমি তো আই.টি. ও অফিস ম্যানেজমেন্টের উপর ভালো জ্ঞান রাখো, আমার বন্ধুর একটু উপকার করে দাওনা। ওর কোম্পানীটা নতুন, ওর স্টাফদের একটু প্রশিক্ষণ দিয়ে আসো। ওরা পেমেন্টও ভালো করবে। "
পেমেন্টটা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না। আমি বর্তমানে যেই কোম্পানীতে চাকরী করছি সেটি মস্কোর বড় ডিলার কোম্পানীগুলোর একটি।
এখানকার ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের চীফ হিসাবে আমি যা পাই এটা যথেষ্ট। আমার অন্য একটা বিষয় ভালো লেগেছিলো যে, আমার বস্ আমাকে মূল্যায়ণ করছেন। উনি নিজে ইন্টারভিউ নিয়ে আমাকে কোম্পানীতে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আমার বন্ধু-বান্ধব তখন বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলো যে, এতো বড় একটা কোম্পানীতে এতো সহজে চাকরী হয়ে গেলো! আমি নিজেও বেশ খুশী হয়ে গিয়েছিলাম। আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গিয়েছিলো ভীষণ।
কিন্তু জয়েনিং-এর প্রথম দিনেই বস্ আমার আত্মবিশ্বাস ও কিছুটা অহংবোধ এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিয়েছিলেন।
যেদিন জয়েন করেছিলাম, সেই প্রথম দিনেই লাঞ্চের পর আমার টেবিলের উপর রাখা টেলিফোনটি বেজে উঠলো। প্রথম দিন তাই বাইরে থেকে কোন কল পাওয়ার কথা না। তাছাড়া আমি নিজেও এখনো আমার এক্সটেনশন নাম্বারটা জানিনা। তাহলে অফিসের ভিতর থেকেই কেউ কল করেছে।
টেলিফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ রিনরিনে গলায় বললো,
"শরীফ বলছেন?" আমি উত্তর দিলাম, "জ্বী, বলছি। " আমি কোম্পানী প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারী নাতাশা বলছি। গসপাদিন (মানে জনাব বা মিস্টার) কোম্পানী প্রেসিডেন্ট আপনাকে তার রূমে ডাকছেন। " আমি ঝটপট উঠে গেলাম।
কোম্পানী প্রেসিডেন্টের রূমের সামনের স্পেসটি বেশ বড় সেখানে তিনজন সেক্রেটারী বসে আছে।
রুশ মেয়েরা চোখ ঝলসানো সুন্দরী হয়। এই তিনটি মেয়েও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এদের মধ্যে কোনজন নাতাশা তা বোঝার উপায় নেই। আমি তাদেরকে প্রশ্ন করলাম, "নাতাশা কে"? সাথে সাথে দুজন একসাথে বলে উঠলো "আমি"। এই একটা সমস্যা রাশিয়ায়।
নামের পরিমান খুবই কম, নাতাশা, তানিয়া, ইরা, স্ভেতা, মাশা, ইউলিয়া, ভিকা, ওলগা এই জাতীয় বিশ-পচিশটা মাত্র নাম। তার মধ্যে নাতাশা নামটা আবার বেশী কমোন। আমার মনে পড়ে ইউনিভার্সিটি পড়ার সময় আমাদের বিশ জনের গ্রুপে চারজন নাতাশা ছিলো। কোনজন কোন নাতাশা এটা বুঝতে হলে আবার ফ্যামিলি নেইম-টা বলতে হতো। আমি সেক্রেটারী দুজনের দিকে তাকিয়েই বললাম, "আমি শরীফ আহমেদ" আমার মনোভাব বুঝতে পেরে ওদের মধ্যে থেকে একজন বললো, "আমি নাতাশা ইউজোফোভিচ।
আমিই আপনাকে কল করেছিলাম। গস্পাদিন প্রেসিডেন্ট রূমের ভিতরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। " মেয়েটির ফ্যামিলি নেইম শুনে বুঝলাম ও ইহুদী। ওর দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম বহিরঙ্গে জাতীয়তার ছাপ রয়েছে। মেয়েটির গায়ের রঙ সাদা হলেও চুল কালো, চোখ কালো।
কোম্পানী প্রেসিডেন্টের রূমে ঢুকে চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। বিশাল জমকালো রূমের একপাশে উনার টেবিল। তার উপরে কম্পিউটারের বিশাল মনিটর। এতো বড় মনিটর কম দেখা যায়। আবার উনার সামনে একটি দামী ল্যাপটপও দেখতে পেলাম।
রূমের যেপাশে উনার টেবিল তার উল্টো পাশে একটি জাঁকালো কনফারেন্স টেবিল। এই দুয়ের মাঝখানে দামী সোফাসেট রাখা। রুশ ফার্নিচারগুলোও গর্জিয়াস হয় তবে ডিজাইনটা থাকে ক্লাসিকাল। উনার সোফাসেটের ডিজাইন আধুনিক। মনে হয় ইটালী বা বাইরের কোন দেশ থেকে আনিয়েছেন।
এরকম একটা সেটের দাম ত্রিশ-চল্লিশ হাজার ডলার বা তার বেশীও হতে পারে। কোম্পানী প্রেসিডেন্ট আমাকে দেখে মুখভঙ্গীতে হালকা গাম্ভীর্য্য রেখে বললেন
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ বসো (উনার সামনের চেয়ারটি দেখিয়ে)
আমিঃ জ্বী ধন্যবাদ (চেয়ারে বসলাম)
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ আজ তোমার অফিসের প্রথম দিন। ওয়েল কাম টু বোনানজা ফ্যামিলি।
আমিঃ জ্বী, ধন্যবাদ।
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ কেমন লাগছে অফিসের পরিবেশ?
আমিঃ জ্বী, বেশ ভালো।
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ লাঞ্চ করেছ?
আমিঃ জ্বী, করেছি। খুব ভালো লাঞ্চের ব্যবস্থা। আপনার ক্যান্টিনটিও সুন্দর!
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ হ্যাঁ, চেষ্টা করি স্টাফদের ভালো সুযোগ-সুবিধা দিতে। (এর মধ্যে উনার সেক্রেটারী দ্বিতীয় নাতাশা মেয়েটি দুকাপ চা নিয়ে এলো। আমার সামনে একটি চায়ের কাপ ও উনার সামনে একটি চায়ের কাপ রাখলেন।
সাথে কিছু কাজু বাদাম ও ড্রাই ফ্রুট দিলো) যাহোক তোমাকে যে জন্যে ডেকেছিলাম। তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আর তাছাড়া তোমার পড়ালেখা ভালো ও অন্যান্য রেপুটেশনও আছে। তাই অনেকটা ইনফর্মাল ইন্টারভিউ করে আমি তোমাকে নিয়েছি। তবে শুরুতেই আমি কিছু কথা বলবো মনযোগ দিয়ে শুনবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আর কমার্শিয়াল অরগানাইজেশনের পরিবেশ এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন নামী-দামী প্রফেসররা। হাইলি কোয়ালিফাইড, হাইলি কালচার্ড মানুষ তারা। তাদের সাথে অন্যদের তুলনা হয়না। কমার্শিয়াল অরগানাইজেশনে সেরকম পাবেনা।
যাহোক, আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা। তুমি এখানে একজন বিদেশী। তোমাকে এখানে চাকরী দেয়া মানে, আমি মাথায় বাড়তি কিছু ঝামেলা নিয়েছি। তোমার জায়গায় একজন রুশকে নিলে আমার সেই ঝামেলাগুলো থাকতো না।
আমিঃ জ্বী, কিসের ঝামেলা? (আমি হঠাৎ বলে বসলাম)
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ আনেকগুলিই।
যেমন তোমার ভিসা ও রেজিস্ট্রেশনের পুরো দায়িত্ব আমার। তোমার বাসস্থানের দায়িত্ব আমার। আবার তোমার চিকিৎসার দায়িত্বও আমার। তারপর খোদা না করুক তোমার যদি নিরাপত্তা জনিত কোন সমস্যা হয় সেই দায়িত্বও আমাকেই নিতে হবে। আমি কেন তোমাকে কথাগুলো বলছি? কারণ এখানে টিকে থাকতে চাইলে তোমাকে কাজের গুনে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে হবে।
তুমি যদি একজন রাশানের চাইতে খারাপ কাজ করো, তাহলে তোমাকে এখানে রাখার প্রশ্নই ওঠেনা। আবার তুমি যদি একজন রাশানের সমান সমান কাজও করো তাহলেও হবেনা। যদি তুমি একজন রাশানের চাইতে ভালো কাজ করো কেবলমাত্র তখনই তোমাকে এই কোম্পানীতে ধরে রাখার একটা কারণ থাকবে। একমাত্র এভাবেই তুমি টিকে থাকতে পারবে। তোমাকে আমার ভালো লাগে, আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো, শুধু এটার উপরে ভর করে তোমাকে রাখার কিছু নেই।
পুঁজিবাদের এই যুগে পুরো পৃথিবীটাই কম্পিটিশনের পৃথিবী। আশা করি আমার কথা তুমি বুঝতে পেরেছো।
উনার এই হালকা স্বরে বলা কড়া কথাগুলো অনেকগুলো সুঁইয়ের মতো আমার গায়ে বিধলো। কিন্তু উনি যে কতো গুরুত্বপূর্ণ কথা আমাকে বলেছেন। তা বুঝতে আমার আর বাকী রইলো না।
কোম্পানী প্রেসিডেন্টঃ কিছু বলবে?
আমিঃ জ্বী না। আপনার কথা আমি বুঝতে পেরেছি।
------------------------------*----------*-------------------------
আমার টেবিলে ফিরে এসে উনার কথাগুলো আবার ভাবলাম। দারুণ ব্যক্তিত্ব লোকটির। এর আগে যতবার উনার সাথে দেখা হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে খুব নরম-সরম, সহজ-সরল একজন মানুষ।
আজ আর আমার সেরকম মনে হলো না। আজ একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে আমার সাথে কথা বললেন। এতদিন আমি ছিলাম উনার অফিসের বাইরে। আজ আমি উনার অফিসের ভিতরে। হালকা একটি গাম্ভির্য্য নিয়ে কথা বলে তিনি যে আমার বস্ সেটা বুঝিয়ে দিলেন।
দারুণ! উনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে গেলো। যতদূর জানি উনি একেবারেই জিরো থেকে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আজ তিনি মাল্টি মিলিয়নিয়ার। এম্নি এম্নি তো আর মাল্টি মিলিয়নিয়ার হন নি, ভিতরে মাল-মশল্লা আছে বলেই হয়েছেন। তিনি আমাকে আরো একটা জিনিস বুঝিয়ে দিলেন যেটা আমাকে আজই বোঝানোর প্রয়োজন ছিলো।
পরে বোঝাতে গেলে দেরী হয়ে যেতো। সেটি হলো আমার অহংবোধ ভেঙে দেয়া। এই অহংকার একটা খুব খারাপ জিনিস। এটা মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। কুরআন হাদীসের কথা যদি বলিই, তাহলে এই এক অহংকারের বিরুদ্ধে যত আয়াত ও হাদীস আছে, তা ব্যাখ্যা সহ লিখতে গেলে সারাদিন চলে যাবে।
কথা হচ্ছে, এই অহংকার কীসের জন্য হতে পারে। প্রকাশ্য অহংকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সম্পদের অহংকার, জ্ঞান-বিদ্যার অহংকার, রূপের অহংকার ইত্যাদি। আর এক প্রকার অহংকার আছে, যা আপনি ধরতেও পারবেন না, কিন্তু সূক্ষভাবে তা আপনাকে গ্রাস করে ফেলবে এবং এক সময় তার খারাপ প্রভাব আপনার আচরণেও প্রকাশ পাবে, যার ভুক্তভোগী হবে আপনারই কাছের মানুষজন। আর এই অহংকার হচ্ছে ভালোত্বের অহংকার। মানুষের জীবন হলো একটি দীর্ঘ পথ চলা।
দীর্ঘ পথ যেমন কোথাও মসৃণ কোথাও বন্ধুর। কোথাও কাঁচা কোথাও পাকা। জীবন পথও তেমনি। চাই বা না চাই যতদিন জীবন আছে ততদিন ঐ পথ চলতেই হবে। তাই পথ চলাটা মূল উদ্দেশ্য নয়।
মূল উদ্দেশ্য কত দ্রুত পথ চলতে পারছি এবং কতদূর যেতে পারলাম। অহংবোধ এই পথচলাকে শ্লথ করে দেয়। তাই আমার যিনি শুভাকাঙ্খী তার দায়িত্বই হলো আমার মধ্যে কোন অহংবোধ যদি ধরা পড়ে সেটা ভেঙে দেয়া। অথবা অহংবোধ জাগতে না দেয়া।
এরকম আর একটা অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিলো কয়েক বৎসর আগে।
তখন আমি এম, এস, কমপ্লিট করে পি, এইচ, ডি,-তে স্কলারশীপ পেয়েছি। এম্নিতেই এম, এস,-এ ভালো ফলাফল থাকায় একটা অহংবোধ তৈরী হয়েছিলো। তার উপর পেলাম পি, এইচ, ডি,-তে স্কলারশীপ, অহংবোধ দ্বিগুন হয়ে গেলো। এম, এস, করেছিলাম অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পি, এইচ, ডি,-তে স্কলারশীপ পেলাম মস্কোর পিপলস্ ফ্রেন্ডশীপ ইউনিভার্সিটিতে। ওখানে যাওয়ার পর আমাকে বললেন যে, এ্যাডমিশন টেস্ট দিতে হবে।
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! আমার অলরেডী স্কলারশীপ হয়ে গিয়েছে, এরপর আবার এ্যাডমিশন টেস্ট কি? ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারী আমাকে বললেন, "এখানে এটাই আমাদের ট্রেডিশন। রাশান, বিদেশী, এই ইউনিভার্সিটি বা বাইরের ইউনিভার্সিটি যেখানকার গ্র্যাজুয়েটই হোক না কেন, এ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে পাশ করতে হবে। না হলে আপনার স্কলারশীপ ক্যান্সেল হয়ে যাবে। এই নিন পরীক্ষার সিলেবাস। " যাহোক নির্ধারিত দিনে উপস্থিত হলাম।
গিয়ে দেখি আমার মতো আরো দু'জন আছে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সব প্রফেসররা। বোর্ড বসেছে, ওপেন ডিফেন্স হবে। প্রফেসরদের বোর্ডের সামনেই দেয়ালে টাঙানো বোর্ডে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রথমেই আমাকে ডাকা হলো।
কিছুটা অহংবোধ (যেহেতু নিজেকে ভালো ছাত্র মনে করতাম) কিছুটা উদ্ধেগ নিয়ে বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে মনে ভাবছিলাম, কি আর, কিছু প্রশ্ন স্যাররা করবেন তার উত্তর দেয়া আরকি। স্যাররা প্রথমে মামুলি কিছু প্রশ্ন করলেন। ঝটপট ওগুলোর উত্তর দিলাম। তারপর শুরু হলো দাঁতভাঙা কিছু প্রশ্নের ঝড়।
এমন এমন সব প্রশ্ন করেন যার উত্তর আমি কেন, আমার বাবারও জানা নেই। হতভম্ব হয়ে গেলাম। শেষে খ্যাতিমান বিজ্ঞানী চেয়ারম্যান স্যার প্রফেসর রিবাকোভ আমাকে বললেন। "নাহ্, হচ্ছেনা। আপনার প্রিপারেশন ভালো নেই।
" তারপর অন্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কি করা যায় বলুন তো?" আমার বুক আশংকায় কেঁপে উঠলো, এই না আমার স্কলারশীপ ক্যান্সেল হয়ে যায়! চেয়ারম্যান স্যারের বয়সীই আরেকজন প্রফেসর (পরে জেনেছিলাম উনার নাম গুতসুনায়েভ, উনিও নামজাদা বিজ্ঞানী) বললেন, " ওকে আরেকবার চান্স দেয়া যেতে পারে। " চেয়ারম্যন স্যার আমাকে বললেন, "আপনাকে আরেকবার পরীক্ষাটা দিতে হবে। ভালো করে প্রিপারেশন নেয়ার জন্য কত সময় প্রয়োজন আপনার?" আমি ভাঙা মন নিয়ে বললাম, "এক সপ্তাহ সময় কি দেবেন?" "ঠিক আছে এক সপ্তাহই সময় দেয়া হলো। প্রিপারেশন নিয়ে আসেন। " ভেঙে পড়া মানুষের মতো টেনেটুনে পরীক্ষার হলের বাইরে এলাম।
আমার পর পরবর্তিজন ঢুকলো। এবার কৌতুহল হলো ওর ভাগ্যে কি হয় জানার। তাই ডিপার্টমেন্ট থেকে চলে না এসে, বাইরে অপেক্ষা করলাম। সেই ছেলেও দেখি ভার মুখ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। প্রশ্ন করলাম, "কি ভাই, কেমন হলো পরীক্ষা?" সে মন খারাপ করে বললো, "নারে ভাই কিছু হলোনা।
আবার দিতে হবে পরীক্ষা। কি কি সব প্রশ্ন করে!" তৃতীয় জনেরও একই দশা হলো। মনটা একটু ভালো হলো যখন দেখলাম আমি একা নই, বাকীদেরও আমার মতোই অবস্থা।
যাহোক খুব খেটেখুটে প্রিপারেশন নিয়ে গেলাম এক সপ্তাহ পরে। এবার আর অহংবোধ নিয়ে নয়, একেবারে জবুথবু হয়ে দাঁড়ালাম।
আগের বারের মতোই প্রশ্নবাণে জর্জরিতো করলেন প্রফেসররা। তবে এবার গতবারের চাইতে ভালো পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা শেষে প্রফেসররা মুখ চাওয়া চাওয়ি করে বললেন, "হ্যাঁ, কিছুটা ইমপ্রুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে। ঠিক আছে, পাশ করিয়ে দিলাম। তবে খুব মনযোগ দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে পি. এইচ. ডি. করা অত সহজ নয় কিন্তু!" আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম এটা ট্রেডিশনাল একটা টেকনিক।
শুরুতেই একজনার অহংবোধ ভাঙিয়ে দেয়া। যাতে সে বুঝতে পারে জ্ঞানের জগৎ বিশাল, সেই জগৎের সামান্যই সে জানে। তার শেখার আরো অনেক কিছুই বাকী আছে। তাকে আরো অনেক কিছুই জানতে হবে। এই অভিজ্ঞতাটি পুরো রিসার্চ লাইফে আমার ভীষণ কাজে লেগেছিলো।
------------------------------*----------*-------------------------
স্মৃতি রোমন্থন বাদ দিয়ে বর্তমানে ফিরে এলাম। আমার বর্তমান একটি ক্লাসরূম। একটি কোম্পানীর জনা দশেক সেখানে বসে আছেন। ছয়জন পুরুষ, চারজন নারী। এই একটা বিষয় এই দেশে, সব অফিসেই নারী-পুরুষ সমান সমান।
কোথাও কোথাও আবার নারীই বেশী। এর মধ্যে পাঁচজন বয়সে আমার চাইতে বড় হবেন। সবাই 'আভানগার্দ' কোম্পানীর কর্মকর্তা। সবাই শেতাঙ্গ কেবল ঐ মেয়েটি ছাড়া।
ক্লাসরূমে আমার সাথে ঢুকেছেন 'আভানগার্দ' কোম্পানীর মালিক ইউরি গেরমানোভিচ ইরমোলায়েভ।
উপস্থিত সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। পরিচয় পর্বটি ছিলো এরকম। ইউরি গেরমানোভিচ সবার উদ্দশ্যে বললেন
"ইনি জনাব শরীফ আহমেদ। মস্কোর একটি বড় কোম্পানীতে চাকুরী করেন। বয়স কম হলেও নলেজ কম নয়।
উনার সাথে কথা বলে আমার ভালো লেগেছে। নিজ বিষয়ের মতো রুশ ভাষায়ও যেমন দখল রাখেন বিদেশী হিসাবে এটা প্রসংশনীয়। তখন মনে হলো আমাদের কম্পিউটার নেটওয়ার্কের প্রোগ্রামটার ব্যাপারে তিনি হেল্প করতে পারবেন। উনাদের কোম্পানীর প্রোগ্রাম এবং আমাদের কোম্পানীর প্রোগ্রাম একই। সেখানে উনার অভিজ্ঞতা ভালোই।
প্রোগ্রামের পাশাপাশি ম্যানেজমেন্টের বিষয়েও উনার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু আপনাদের সাথে শেয়ার করবেন। আশা করি তিনি আমাদের আশানুরূপ হেল্প করতে পারবেন। " ইউরি গেরমানোভিচ ইরমালয়েভ ব্যবসার পাশাপাশি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও। গণিত পড়ান। রুশ অধ্যাপকরা মাথাওয়ালা মানুষ হন, ইরমোলায়েভও তাই।
গতকাল উনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমার বস্। ঘন্টা দুয়েক উনার সাথে আলাপ করেছিলাম, একসাথে লাঞ্চও করেছি। ঐ এক আলাপেই বুঝেছি কেমন মাথাওয়ালা লোক উনি। একবার হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "অধ্যাপক মানুষ, ব্যবসায় আসলেন কেন?" তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, "এটা সময়ের দাবী। এই যুগ ব্যবসা-বাণিজ্যের যুগ।
যুগের সাথে তাল তো মেলাতে হবে। দেখো একজন চাকুরীজীবি কি করেন? তিনি কেবল নিজেরই অন্ন সংস্থান করেছেন। আর একজন সফল ব্যবসায়ী নিজেরটা তো করেছেনই, পাশাপাশি আরো দশজনেরটাও করেছেন। এটাকে কি আমরা পজেটিভলী নেবোনা? আমি একসময় আলজেরিয়ায় ছিলাম। তখনই ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে আমার ঝোঁক তৈরী হয়।
তাদের অফিসে একটা নতুন প্রোগ্রাম ইনস্টল করা হয়েছে। মেইনলি ঐ প্রোগ্রামটির উপরেই ক্লাস নিলাম। ঘন্টা দুয়েকের মত ক্লাস হলো। মাঝখানে ছোট ছোট দুটি ব্রেক নিলাম। টানা পয়তাল্লিশ মিনিটের উপর ক্লাস নেয়া ঠিক না।
এতে ব্রেনের উপর চাপ পড়ে। তাছাড়া মানুষের ব্রেন কোন কিছুর উপর একটানা পয়তাল্লিশ মিনিটের বেশি চিন্তাও করতে পারেনা। ক্লাসের পরে লাঞ্চ আওয়ার ছিলো। ইউরো গেরমানোভিচ আমাকে আগেই বলেছিলেন, যে কয়দিন ক্লাস নেব এখানেই যেন লাঞ্চ করি।
লাঞ্চ আওয়ারে ক্যান্টিনে গিয়ে আবারও ঐ মেয়েটিকে দেখলাম।
অন্য একটি টেবিলে বসেছিলো। আবার চোখ আটকে গেলো ওর ডাগর কালো আঁখি দুটিতে। তার উপর পরিপাটি ভ্রু, নিঁখুত দুটি রেখা, মেক-আপ করা নয়। প্যান্ট-শার্ট পরিহিতা স্মার্ট গার্ল হলেও, মেয়েটি যে প্রাচ্যদেশিয়া এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়না। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য টার্ম দুটি শুনে আসছি সেই স্কুলজীবন থেকে।
মোটের উপর যা বুঝতাম তা হলো, এশিয়ার দেশগুলি হলো প্রাচ্য আর ইউরোপীয় দেশগুলি হলো পাশ্চাত্য (প্রতিচ্য)। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের কোর্স করার পর তার নিগূঢ় অর্থ বুঝতে পেরেছি। প্রাচীনকালে দুটি বৃহৎ সাম্রাজ্য ছিলো, একটির নাম ছিলো রোম সাম্রাজ্য, আরেকটির নাম পারস্য সাম্রাজ্য। এরা ছিলো পরষস্পরের শত্রু। দুয়ের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো।
সেই রোম থেকে পারস্য অভিমুখে অভিযান চালাতে হলে সৈন্যদের অগ্রসর হতে হতো পূর্ব দিকে, বিপরীতক্রমে পারস্য থেকে রোম অভিমুখে অভিযান চালাতে হলে সৈন্যদের অগ্রসর হতে হতো পশ্চিম দিকে। সেই থেকেই রোম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে বলা হয় পাশ্চাত্য আর পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে বলা হয় প্রাচ্য। এই দুয়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, চিন্তা-চেতনা, জীবনধারা সবই ভিন্ন। তাই তারা কখনোই একে অপরকে বুঝতে পারেনি। east is east, and west is west, and never the twain shall meet. কথাটি বলা হয়েছিলো কবি Rudyard Kipling. লিখিত The Ballad of East and West কবিতায়।
প্রাচ্যের লোকেরা একটু আধ্যাত্মবাদী আর পাশ্চাত্যের বাসিন্দারা অনেকটাই বস্তুবাদী। প্রেমের ক্ষেত্রেও তাই। প্রেম বলতে পাশ্চাত্যরা বোঝে দেহের স্বাদ, আর আমরা প্রাচ্য দেশীয়রা বুঝি সর্বাতিক্রমী এবং পারমার্থিক অর্থে রূপের অতীত অপরূপ সৌন্দর্য্যকে। দেহের চাইতে মনের স্বাদ বেশী পেতে চাই আমরা প্রাচ্যবাসীরা। ক্যান্টিনের সাউন্ড বক্সে মৃদু বাজনা বাজছিলো।
সুরলহরীটি আমার পরিচিত, খুব সম্ভবত রুশ সুরশিল্পী চাইকোভ্স্কী হবে। রাশিয়া ইউরোপও নয় আবার এশিয়াও নয়। তার মাঝামাঝি কিছু একটা হবে। চাইকোভ্স্কী-র সুরও আমার কাছে মাঝামাঝি মনে হয়। সেই সুরের মৃদু মুর্ছনায় সুক্ষ্ণ স্পর্শাতুরতায় ঐ প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিকে বেশ মানানসই মনে হচ্ছিলো।
আমার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিলো, মেয়েটি বাংলাদেশের কিনা। কিন্তু যেচে পড়ে ওকে জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবেনা ভাবলাম। এই বিষয়ে আমার মধ্যে এম্নিতেই একটা জড়তা কাজ করে। তাছাড়া আজ প্রথম দিন। এর বাইরে আমি আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছি যে, কোন মেয়ের প্রতি ইন্টারেস্ট দেখালে সাথে সাথে তার ডাট বেড়ে যায়।
দরকার নাই আমার ওর ডাট বাড়ানোর। লাঞ্চের শেষে কফি খেতে খেতে ঐ টেবিলের দিকে তাকাতেই ওর সাথে চোখাচোখি হলো। মেয়েটি আমাকেই দেখছিলো। সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলাম। জানিনা ও কি ভেবেছে, যা ভাবে ভাবুক! লাঞ্চ শেষ করে আমার অফিসে চলে এলাম।
------------------------------*----------*-------------------------
একদিন গ্যাপ দিয়ে তার পরদিন আবার 'আভানগার্দ' কোম্পানীতে গেলাম। যথারীতি ক্লাস নিচ্ছিলাম। প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটি গত পরশু দিনের জায়গাতেই বসেছিলো। আজ আমি ওর দিকে একবারও তাকালাম না। ইচ্ছে করেই কাজটা করলাম যেন ও মনে করে ওর প্রতি আমার বিন্দুমাত্রও আগ্রহ নেই।
ক্লাসের একফাঁকে বললাম, "কোন প্রশ্ন আছে কি?"
বয়স্ক একজন ব্যক্তি উচ্চাহাস্য করে বললেন, "আপনার দেশ কোথায়?"
এবার আমিও জোড়ে হেসে বললাম, "যাক ভালো, কোন টেকনিকাল কোশ্চেন করেননি। আপনার মতন বয়স্ক, অভিজ্ঞ একজন লোক জটিল প্রশ্ন করলে হয়তো আটকে যেতাম। সহজ প্রশ্নের, সহজ উত্তর দিচ্ছি। আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ" এবার ইয়াং মতন একজন বললেন, "আমিও তাই ভেবেছিলাম, ইন্ডিয়ান নন, বাংলাদেশী। "
আমিঃ কি করে বুঝলেন?
ইয়াং স্টাফঃ ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশীদের মধ্যে চেহারায় মিল যদিও বেশি, তবে অমিলও রয়েছে।
আপনাদের চেহারা ওদের চাইতে শার্প হয়। তাছাড়া ফেসের এক্সপ্রেশন একেবারেই ভিন্ন।
আমিঃ ও আচ্ছা। কিন্তু ফেসের এক্সপ্রেশনে পার্থক্যটা কি?
ইয়াং স্টাফঃ আমি ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তাম আমার সাথে ইন্ডিয়া বাংলাদেশ দুটি দেশের ছাত্র-ছাত্রীরাই পড়েছে। তখনই লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশীদের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনে এক ধরনের সরলতা থাকে যেটা ইন্ডিয়ানদের মধ্যে নেই।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর লাঞ্চের উদ্দেশ্যে ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিলাম এসময় আমি গত পরশু দিন থেকে যা চাচ্ছিলাম সেটাই ঘটলো। হঠাৎ প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে এলো। খুব মিষ্টি কন্ঠে পরিষ্কার বাংলায় আমাকে বললো।
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ আপনি কি বাংলাদেশের? আমিও বাংলাদেশের।
আমিঃ তাই? তা কি নাম আপনার?
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ সুমনা আফসানা বৃষ্টি
আমিঃ বাহ্, খুব কাব্যিক নাম তো!
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ আপনার নামও তো সুন্দর! শরীফ।
(প্রথম ক্লাসেই আমি আমার নাম বলেছিলাম। তাই ও মনে রেখেছে)
আমিঃ সেকেলে নাম। বোধহয় আমার দাদা রেখেছিলেন নাম। আপনার নামটা আধুনিক এবং পোয়েটিক। তবে এর মধ্যে আপনার ডাক নাম কোনটি?
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ এ প্রশ্ন করলেন কেন?
আমিঃ আপনার নামের তিনটি অংশ, সুমনা, আফসানা, ও বৃষ্টি।
তিনটিই ডাক নাম হবার যোগ্য। তাই বলছিলাম।
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ আপনি হলে কোনটিকে ডাক নাম বলে চুজ করতেন?
আমিঃ উঁ, বলা মুশকীল। সুমনা মানে সুন্দর মন। আপনি দেখতে সুন্দরী, মনটাও সুন্দর হবে নিশ্চয়ই।
(আমার মুখে তার রূপের প্রশংসা শুনে মুখটা হঠাৎ আরক্তিম হয়ে উঠলো। এটা স্বাভাবিক, বেশীরভাগ মেয়েরই তাই হয়। সেই প্রশংসা মন থেকে হোক আর উৎকোচ হোক) আবার বৃষ্টি নামটিও সুন্দর।
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ আফসানা সুন্দর নয়?
আমিঃ হ্যাঁ শ্রুতিমধুর। তবে শব্দটা ফার্সী।
আমি তার অর্থ জানিনা। ইন্টারেস্টিং দুদিকে দুটি বাংলা শব্দ মাঝখানে একটি ফার্সী শব্দ। যেন বাংলা শব্দ দুটি ফার্সী শব্দটাকে গার্ড দিচ্ছে।
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ কি সব মজার মজার কথা বলেন (আমার কথা শুনে হেসে ফেললো ও)।
আমিঃ যাহোক, আমি হলে বৃষ্টি-টাকেই ডাক নাম হিসাবে চুজ করতাম।
ছোট্ট আর মধুর।
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ আপনি বৃষ্টি পছন্দ করেন?
আমিঃ হু, খুউব।
প্রাচ্যদেশীয় মেয়েটিঃ আমার ডাক নাম বৃষ্টি-ই।
আমিঃ দেখেছেন আমার পছন্দের সাথে কেমন মিলে গেলো।
আমার কথা শুনে ও সলজ্জ্ব হাসি হেসে একটা নোড করলো।
ভঙ্গিটি ভারী চমৎকার লাগলো। মনে হলো বটল্ ব্রাস গাছের একটি কচি শাখা একবার মাত্র দুলে উঠলো।
মেয়েটিকে আমি গভীর মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। তন্বী মেয়েটি লম্বায় আমার চাইতে সামান্য উঁচু হবে। গাত্রবর্ণ এদেশের মেয়েদের তুলনায় চাপা হলেও বাংলাদেশের মেয়েদের তুলনায় উজ্জ্বল গৌরবর্ণ।
মুখটি পানপাতা গড়নের কাছাকাছি। দুই কপোলে স্নিগ্ধ গোলাপী আভা। বোচাও নয় আবার তীক্ষ্ণও নয় এমন মাঝারি গড়নের নাক। ডাগর ডাগর দুটি কালো আঁখি। সব চাইতে সুন্দর উজ্জ্বল গোলাপী রঙের ওর পাতলা ঠোট দুটি।
ঐ ঠোট দুটিতে রয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় বেদানা দানার লালিত্য অপূর্ব রস-মাধুর্য্য। সেই পাতলা ঠোট দুটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে একটি ছোট্ট তিল। অপরূপ সুন্দরী, যেন প্রকৃতির আপন হাতে গড়া।
------------------------------*----------*-------------------------
স্ত্রীঃ তোমার অফিস কেমন চলছে?
আমিঃ গতানুগতিক। যেমন সবসময় চলে।
স্ত্রীঃ ও। না মানে নতুন কিছু নেই?
আমিঃ নতুন বলতে ঐ যে অন্য কোম্পানীতে ক্লাস নিচ্ছি।
স্ত্রীঃ তুমি বলেছ। কিন্তু সেই সম্পর্কে তো কিছুই বললে না!
আমিঃ না, মানে তেমন কিছু না। ওদের প্রোগ্রামটা একটু বুঝিয়ে দেয়া আর কি।
স্ত্রীঃ তোমার তো টিচার হওয়ার সখ ছিলো তাই না?
আমিঃ কিছুটা।
স্ত্রীঃ কেন টিচার হতে চেয়েছিলে?
আমিঃ জাস্ট একটা আগ্রহ আর কি। খুব সম্ভবত জীবনে কিছু ভালো ভালো টিচার পেয়েছিলাম তাই হয়তো উনাদের মতো হতে চেয়েছিলাম।
স্ত্রীঃ (একটু ঠাট্টা করে বললো) কোন সুন্দরী আছে কি ঐ কোম্পানীতে, তোমার ট্রেইনীদের মাঝে?
স্ত্রীর এই প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে গেলাম। কি বলবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
বৃষ্টির কথা বলবো কি? তারপর ভাবলাম এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। হচপচ গোছের একটা উত্তর দিলাম।
আমিঃ না মানে, তেমন কেউ না। এখানে তো সব অফিসেই নারী-পুরুষ সমান সমান।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো আমার স্ত্রী, তবে এই বিষয়ে কিছু বললো না।
একটু চুপ করে থেকে বললো
স্ত্রীঃ আমার বান্ধবী ইরাকে মনে পড়ে?
আমিঃ হ্যাঁ কি হয়েছে?
স্ত্রীঃ বেচারী আজ খুব কাঁদছিলো।
আমিঃ কেন?
স্ত্রীঃ ওর একটা বয় ফ্রেন্ড ছিলো।
আমিঃ জানি, তুমি বলেছ। একটা নাইট ক্লাবের মালিক। ধনী বয়ফ্রেন্ড।
ইরা তো ভালোই আছে। ওদের বিয়ে হয়ে গেলে আরো ভালো হবে।
স্ত্রীঃ আরে সেই কথাই। বিয়ে ওদের হওয়ার কোন চান্স নেই।
আমিঃ কেন কেন? এতো সুন্দরী একটা মেয়ে! তোমার ক্লাসের সব ছেলেই তো ওর জন্য পাগোল ছিলো জানি।
স্ত্রীঃ সমস্যাটা সেখানেই। ঐ নাইট ক্লাবের ম্যনেজারের চাকরী নিয়েছিলো ইরা। সেখানেই মালিক জুজেই-এর সাথে পরিচয় হয় ওর।
আমিঃ জানি, তুমি বলেছ। জুজেই কোপভের্দ-এর।
স্ত্রীঃ হ্যাঁ, ঐ কোপভের্দ-এর ছেলেটার সাথেই হঠাৎ প্রেম হয়ে গেলো ইরার। এতো সুন্দরী মেয়ে! কতো ছেলে ওর পিছনে ঘুরতো! হঠাৎ করেই একটা জালে আটকা পড়ে গেলো ও।
আমিঃ (বিরক্ত হয়ে বললাম) জালে আটকা পড়ার কি আছে? দুজন দুজনকে ভালোবাসে। বিয়ে করে ঘর-সংসার করলে আরো ভালো।
স্ত্রীঃ ওটাই বলছি।
বিয়ে করার কোন সুযোগ নেই। জুজেই বিবাহিত।
আমিঃ কি? জুজেই বিবাহিত!
স্ত্রীঃ হ্যাঁ, তাই।
আমিঃ ইরা জানতো?
স্ত্রীঃ জানিনা।
আমিঃ আমরা বান্ধবীরা জানতাম না।
আজ ইরা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করলো। আমরা বললাম, "কি হয়েছে?" ইরা বললো যে, আজ জুজেই একটা এ্যালবাম নিয়ে এসেছে, সেখানে সে ও তার স্ত্রী ছিলো। কোন ছবিতে জুজেই ও তার স্ত্রী চুম্বনরত, কোন ছবিতে তারা আলিঙ্গনাবদ্ধ, খুব অন্তরঙ্গ ছবিগুলো। ইরা খুব খেপে গিয়ে বলেছিলো, "তোমার স্ত্রীর সাথে ছবিগুলো আমাকে দেখানোর কি আছে?" তারপর কথা কাটাকাটি হয়ে শেষে সম্পর্ক ছিন্ন করে, চাকরী ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছে।
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
বললাম,
আমিঃ কাজটা তো ভালো হয়নি। ইরা একটা ম্যারেড লোকের সাথে প্রেম করতে গেলো কেন?
স্ত্রীঃ কি জানি? মনের অজান্তে ঘটে গিয়েছে হয়তো।
আমিঃ আচ্ছা ইরার দিক থেকে তো বুঝলাম। কিন্তু জুজেই? কেমন শয়তান! ঘরে বৌ থাকতে আরেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক করে। না না, অন্যায়, এ ভীষণ অন্যায়।
-----------------------------*-----------*---------------------------
এর পর এক সপ্তাহের ব্যবধান হলো। ইউরি গেরমানোভিচের সাথে কথা হয়েছিলো সপ্তাহে দুটা করে ক্লাস নেবো। ডে হিসাবে চুজ করেছি মঙ্গল আর আর বৃহষ্পতিবার। সোমবার সপ্তাহের শুরু ঐদিন আমার নিজের অফিসেই কাজ থাকে বেশী, আবার শুক্রবার সপ্তাহের শেষ ক্লোজিংয়ের একটা ব্যাপার আছে তাই ঐ দিনটাও নিজের জন্য রাখলাম। এভাবে ঐ দুইদিন বাদ দিয়ে 'আভানগার্দ'-কে সময় দিয়েছি।
আজ ক্লাসে ঢোকার আগেই বৃষ্টির সাথে দেখা হলো । করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাকে দেখে মিষ্টি হাসলো।
আমিঃ কেমন আছেন?
বৃষ্টিঃ জ্বী। ভালো।
আপনি?
আমিঃ আমিও ভালো। আসুন ক্লাসে আসুন।
ক্লাসের ভিতরে ঢুকে ও এবার আগের জায়গায় না বসে, সামনের একটি চেয়ারে বসলো।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর আজ উনাদেরকে আগে বেরোতে দিলাম। আমি কম্পিউটার থেকে পেন ড্রাইভটা খোলা ও কাগজ-পত্র গোছানোর জন্য কিছু সময় নিলাম।
ক্লাসরূম (এটাই ওদের কনফারেন্স রূমের মতো) থেকে বেরিয়ে দেখলাম, দরজায় কাছেই বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে।
বৃষ্টিঃ আপনি কি ক্যান্টিনে লাঞ্চ করতে যাচ্ছেন?
আমিঃ জ্বী।
বৃষ্টিঃ চলুন, একসাথেই যাই।
আমিঃ চলুন।
ক্যান্টিনে অন্যান্য খাবারের সাথে আছে গ্লাস ভরা ফলের রস।
রুশরা কামপোত নামে এক ধরনের জুস তৈরী করে। পীচ, চেরী, আপেল ইত্যাদি ফল দিয়ে তৈরী। আমি নিজে কখনো তৈরী করিনি যা দেখেছি তা হলো বড় পাতিলে ফলগুলি নেয় আর সেখানে ঢালে প্রচুর পানি, তার সাথে মেশায় পরিমানমতো চিনি। বেশ কিছুক্ষণ চুলায় জাল দেয়ার পর তৈরী হয়ে যায় কামপোত। খুব সাধারন ক্যান্টিন থেকে শুরু করে মোটামুটি সব জায়গাতেই পাওয়া যায়।
আজকাল কামপোতের পাশাপাশি প্যাকেটজাত জুসেরও প্রচলন হয়েছে। প্যাকেটজাত জুস জিভে স্বাদ এনে দেয় সত্যি তবে তাতে প্রচুর পরিমানে প্রিজারভেটিভ থাকে। প্রিজারভেটিভ হিসাবে ব্যবহৃত কেমিকালগুলো স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর। এখানে আরেকটি জনপ্রিয় খাবার ভারিনিয়ে। গ্রীস্মকালে এখানে নানা ধরনের ফল হয়।
আর শীতকালে ঠিক বিপরীত। ফল তো দূরের কথা গাছের পাতাই থাকেনা। একেবারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতো নেড়া। শীতকালটা হয় এখানে দীর্ঘ। যেমনি শীতল তেমনি বিষন্ন।
ফলহীন এই কালে ফলের স্বাদ পাওয়ার জন্য তারা বের করেছে এক অভিনব পদ্ধতি। নানা ধরনের ফল চিনির সাথে জাল দিয়ে ঘন তরল করে বয়মজাত করে রাখে। তারপর সারা শীত রুটির সাথে মাখিয়ে বা প্লেটে তুলে নিয়ে সেই বয়মজাত তরল খাও। এই ভারিনিয়ে নিয়ে অনেক গানও আছে। ভারিনিয়ে হলো জ্যাম।
গ্লাস ভরে চেরির রস নিয়ে এলো বৃষ্টি। আমি নিলাম প্যাকেটজাত অরেঞ্জ জুস। খাওয়া শেষ হওয়ার পর সামান্য ভারিনিয়ে ঢেলে নিলো ছোট্ট তস্তরিতে। দেখে বুঝলাম ক্লুবনিকা মানে স্ট্রবেরীর ভারিনিয়ে। গাঢ়ো লাল রঙ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।