আমরা করবো জয় ‘নেত্য...। কতবার ডাকতি হয় তোরে? বলি এই থালা গুলো মন্দিরে রাইখে আয়।
নেত্য মাথা নিচু করে এসে দাড়ায়।
‘বলি, কই ছিলি? এতোক্ষণ ধরি ডাকতিসি তোরে। আজ বাদে কাল পুজো।
কি যে করিস তোরা। আর পারিনা তোগে নিয়ে।
আরে তাকায় তাকায় কি দেখতিসিশ? রাইখে আয় থালা গুলো। ’
‘মা একটা কথা কতাম। ’
‘তোর ওই এক কথা।
টাকা দাও, টাকা দাও। বাড়ি যাবো, বাড়ি
যাবো।
যাদিন, যা করতি কইসি তাই কর। খালি খালি আমার মাথা খাসনি। কত কাজ পরি আছে এখনো।
’
নেত্য থালা গুলো হাতে নেয় কিন্তু যায়না। দাড়িয়ে আছে।
‘কিরে? তুই যাদিন এখান থেকে। নাহয় বিদায় হ আমার বাড়ির থেকে। এই সব ফাঁকিবাজি চলবিনা আমার বাড়িতে।
’
‘মা, ছেলেটার খুব অসুখ। ডাক্তার কইসি শহরে না নিলি বাঁচানো যাবিনা। ২ লাখ টাকা লাগবি। ’
‘তুই কি যাবি এখান থাকি? না বিদায় হবি আমার বাড়ি থাকি?’
নেত্যর চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পরে।
‘সেই ৫ বছর বয়সে গোপালের মা মরি যায়।
এরপরের থেই আমি মানুষ করতিসি ছেলেটারে’।
‘মানুষ করি উদ্ধার করিসিশ আমারে। ’
‘এখন ১৭ বছর হয়ে গেসে ছেলেটার। পড়ালেখার মাথাও ভালো। এখন যদি ছেলেটা আমার মরি যায়।
আমার আর কেউ থাকবেনা মা। ’
নেত্য হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। গৃহকত্রীর সেদিকে তাকানোর সময় নেই। অনেক কাজ পরে আছে এখনো।
নেত্য থালা গুলো নিয়ে চলে যায়।
ঠাকুর মশাইয়ের কাছে রাখে।
‘কিরে নেত্য। তোর ছেলের খবর কি? টাকা-পয়সা যোগাড় করিসিশ?’
নেত্য চোখ মুছে।
‘না, ঠাকুর মশাই। কালকে রাত থাইকে জানিনা কেমন আছে।
টাকা-পয়সাও যোগাড় হইনি। ’
‘চিন্তা করিসনা। মা দুর্গা হচ্ছেন সর্বশক্তিমান। মার কাছে চা। দেখবি ওই টাকা-পয়সা লাগবেনা।
তোর ছেলে এমনিই ভাল হয়ে যাবে। মার কাছে চা। মন দিয়ে চালি মা কাউরে ফিরায় না। ’
নেত্য মা দুর্গার দিকে তাকায়।
‘নেত্য শোন, তোমার কর্তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাজার থেকে লিস্টের এই জিনিস গুলো নিয়ে আসো।
তাড়াতাড়ি আসবা। দেরি কইরেনা যেন। ’
নেত্য দুর্গা মূর্তিকে প্রণাম করে চলে যায়।
কর্তার বৈঠকখানার দিকে পা বাড়ায় নেত্য। কর্তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি জিনিস গুলো ঠাকুর মশাইকে এনে দিতে হবে।
দেরি হলে আবার বকা শুনতে হবে।
উঠানের এক পাশে ছোট বাবু তার ছেলেকে কাধে নিয়ে ঘুরছেন। গোপালের কথা ভাবে নেত্য। গোপাল যখন ছোট ছিল নেত্য তখন ঠিক এমনি করে গোপালকে কাঁধে চড়াতো।
গোপালটাও ভারি পাজি ছিল।
কাঁধে ওঠানোর জন্য কান্নাকাটি করতো আর কাঁধে ওঠালেই চুল ধরে টানতো!
সে গোপাল আজ মরতে বসেছে। কি হয়েছে এতো কিছু সে বোঝেনা। ডাক্তার বলেছে দুই লাখ টাকা লাগবে। শহরে নিয়ে চিকিৎসা না করালে বাঁচানো যাবেনা গোপালকে। এই কথা শোনার পর থেকেই তার কানে এই একটা কথাই ঘুরছে।
কাল রাতে ছেলেটাকে খাবার খাওয়ায় এসেছে। এরপর থেকে আর জানেনা কেমন আছে গোপাল। এতো কিছু সে জানেনা। মনে মনে ঠিক করে ফেলল জমি বিক্রি করে দেবে। ছেলেকেই যদি না বাঁচাতে পারে কি করবে জমি দিয়ে?
বৈঠকখানার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।
গ্রামের নতুন মাষ্টারের সাথে কথা বলছেন কর্তা।
‘কর্তা বাবু, ঠাকুর মশাই লিস্টির এই জিনিস গুলো আনতি বলিসেন। ’
কর্তার হাতে লিস্ট এগিয়ে দেয় নেত্য।
কর্তা হাতে নিয়ে দেখেন। খুব বেশী কিছুনা।
পুজোর জন্যই লাগবে।
‘তুই বাজারে যেয়ে এগুলো নিরাঞ্জনের কাছে দেগে। ও তোরে দিয়ে দেবেনে। বলবি টাকা যা লাগে পুজোর পরে বাবুর কাছ থেকে নিয়ে যেতে। ’
নেত্য চলে যায়।
দরজার কাছে এসে আবার দাঁড়ায়। কর্তাকে বলবে সে? কর্তা যদি সাহায্য করে?
‘তা যা বলতিসিলাম মাস্টার। তুমি কিন্তু কালকে থেকেই আসবা। খাওয়া দাওয়া সব আমার বাড়িতে। ’
নেত্য ফিরে আসে।
‘কর্তা, একটা কথা বলতাম। ’
‘তোর আবার কি কথা? বল, বলে ফেলা। ’
‘কর্তা ছেলেটার তো খুব অসুখ। ২ লাখ টাকা লাগবি। ’
‘তো এখন তোর ২ লাখ টাকা আমারে দিতে হবে?
‘বাড়িতে যে পুজো হচ্ছে তা কি তুই দেখতে পারতিসিশ না?
কত খরচ হচ্ছি তা তুই চিন্তাও করতি পারবিনা।
এখন যা। কাজে আছি। জালাইসনা আমারে। ’
নেত্য মাথা নিচু করে চলে যায়।
‘এবার পুজোতে কত টাকা খরচ হচ্ছে কাকা বাবু?’
‘অনেক টাকা, মাস্টার অনেক।
সব দিয়ে মনে হচ্ছে লাখ দশেক টাকা যাবে। মন্দির করলাম নতুন করে। বাতি লাগানোর ব্যাবস্থা করিসি। বিকালের দিকে সুভাষ এসে লাগায় দিয়ে যাবে দেখেনে। বাতি লাগালে সবাই হা হয়ে যাবেনা কলাম।
হা হা হা...।
আরও অনেক কিছু আছে। পুজো শুরু হলে দেখেনে। এতদিন তো এই সাত গ্রামির মধ্যে চক্রবর্তীরা পুজো ভাল দিতো তাইনা? অনেক টাকা খরচ করতো। এইবার দেখেনে, পুজো শুরু হলি কেউ আর চক্রবর্তীর নাম নেবেনা।
’
‘কিন্তু কাকাবাবু, এটাতো প্রতিযোগিতা হয়ে গেলো না?’
‘তা একটু প্রতিযোগিতা তো আছেই। কিন্তু আরও ব্যাপার আছে মাস্টার। এতদিন গ্রামের মানুষ এখানের পুজো রেখে ওই গ্রামে যেতো। এখন থেকে যদি আর যাওয়া না লাগে তা কি ভাল হলোনা? এইটা তো ধরো আমাগে গ্রামের জন্যও গর্বের ব্যাপার। ’
‘কাকাবাবু, এভাবে প্রতিযোগিতা করে কি আর মা কে সন্তুষ্ট করা যায় বলেন? মাকে সন্তুষ্ট করতে গেলে মন থেকে চাইতে হয়।
এভাবে লাইটিং করে, মন্দির বানিয়ে মা কে সন্তুষ্ট করা যায়না। তাছাড়া আমাদের এই গ্রামেই তো আরও ৪টা পুজো হচ্ছেই। আলাদা করে না দিয়ে সবাই একসাথে দিলেই তো হয়। পুজোও দেওয়া হল ভাল করে। আর টাকাও বেচে গেলো।
এই টাকা আপনি অন্য ভাল কাজেও ব্যাবহার করলেন। ’
‘আমি কি খারাপ কাজে টাকা খরচ করতিসি?’
‘খারাপ কাজ না কাকুবাবু। কিন্তু আরও ভাল কিছু কিন্তু করা যায়। ধরেন আমরা গ্রামের সবাই মিলে একসাথে পুজো দিলাম। যে টাকা বাঁচবে তা দিয়ে আমরা নেত্যর মত অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে পারি।
নেত্যর ছেলের চিকিৎসা করালে আমি নিশ্চিত মা দুর্গা অনেক বেশী সন্তুষ্ট হবে। শুধু তাইনা, আমরা গ্রামের অনেক অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে পারি। একটা অনাথ আশ্রমও খুলতে পারি। অনেক কিছু করা সম্ভব কাকাবাবু। ’
কর্তা বাবু উঠে দাঁড়ালেন।
‘শহরে পড়া-লেখা করি আসলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেসে মাস্টার। আমার চৌদ্দ পুরুষের পূজা আমি দেওয়া বন্ধ করে ওই নেত্যর ছেলেরে বাচাবো? এখন বইলেনা যে তোমার মাথা ঠিক করতি আমারে একটা মেন্টাল হসপিটাল খুলে দিতে হবে গ্রামে। ’
মাস্টার উঠে দাঁড়ায়।
‘তা বলবোনা। যার নিজের মাথারই ঠিক নেই, তার কাছে মানুষের মাথা ঠিক করার কথা আমি কিভাবে বলি।
যাই হোক আমি আসি। ’
মাস্টার চলে যায়। কর্তা বাবু রাগে ফুঁসছেন।
ঘর থেকে বের হতেই মাস্টার দেখলেন নেত্য বড় একটা ব্যাগে কি সব নিয়ে এসেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।
‘ব্যবাস্থা হল নেত্য?’
‘না স্যার। তবে ব্যাবস্থা একটা করে ফেলিসি। আমার জমিডা বিক্রি করে দেবো। রায় বাবুর সাথে কথা বলি আইসি। পাঁচ লাখ দেবেন বলিসেন।
কর্তা বাবুর কাছ থেকে ছুটি নিয়েই যাবো। ’
‘তোমার জমির এখন বাজার দর কত?’
‘তা কম করি হলেও দশ লাখ তো হবে। কিন্তু সমস্যা নেই স্যার। জমি দিয়ে আমি কি করবো। গোপাল সুস্থ হয়ে গেলে আমার আর কিছু লাগবেনা।
’
নেত্যর মনে এতটুকু দুঃখ নেই। চোখে মুখে যেন হাসি ছড়িয়ে পরেছে তার।
‘ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার ছেলে যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠে। আমি আসছি। শহরে নিতে কোন সাহায্য লাগলে আমাকে বোলো।
’
‘আচ্ছা স্যার। ’
পা বাড়ায় নেত্য। কর্তা বাবুর কাছে ছুটি নিতে যায় সে।
‘বাবু আমার টাকার ব্যাবস্থা হয়ে গেসে। আমারে ছুটি দেন।
’
কর্তা বাবু অবাক হয়ে তাকায় নেত্যর দিকে। এতো টাকা এক নিমিষেই কিভাবে যোগাড় করলো নেত্য?
‘চুরি করিসিস নাকি নেত্য?’
‘না বাবু, আমার জমি বিক্রি করে দিতিসি। রায় বাবু পাঁচ লাখ দেবেন বলিসেন। এখনই যেতে বলিসেন। ’
‘রায়ের কাছে যাতি হবেনা।
আমিই নিবানি তোর জমি। দলিল আছেনা তোর কাছে?’
‘আছে বাবু। আমার ট্রাঙ্কেই রাখা আছে। কিন্তু বাবু আমার যে যাতি হবে। ছুটি দেন বাবু।
’
‘একদম মারি ফালাবানি তোরে। ছুটি লাগবেনা। কাজ শেষ করে কাল সকালে টাকা নিয়ে যাবি। একরাত দেরি করলি তোর ছেলে ভূত হবেনা। ’
‘কিন্তু বাবু...’
‘কোন কিন্তু না।
আর টাকা আজকে দুই লাখ পাবি। বাকি টাকা পরে নিসকেনে। পুজো হচ্ছে বাড়িতে। বুঝিসই তো, কত খরচ। বাকি টাকা পরে নিস।
চিন্তা করিসনা তোরে দশ হাজার টাকা বাড়ায় দিবানি। ’
‘আচ্ছা বাবু। ’
নেত্য আচ্ছা বলে, কিন্তু নিজেই মন থেকে মেনে নিতে পারছেনা। অসহায় লাগছে। গোপালটা কি করছে কে জানে।
সব ব্যবস্থা শেষ। পুজো শুরু হয়েছে। ঠাকুর মশাই মন্ত্র পড়ছেন। নেত্য এক কোনায় বসে আছে। বাবু টাকা দিয়েছে দুই লাখ।
সকাল হলেই চলে যাবে ছেলের কাছে। শহরে যেতে হবে কালকেই। আর দেরি করা যাবেনা।
এতো ধুপ দিয়েছে। চোখ জ্বলছে সবার।
নেত্যর চোখ দিয়েও জল পরছে। এই জল কি ধুপের জ্বালায় পরছে?
রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি নেত্য। কখন যাবে। আর যে তোর সইছেনা।
কাউকে কিছু না বলে মাঝ রাতেই রওনা দেয় নেত্য।
ভোরের আগেই পৌঁছে যায় সে।
ফাকা বাড়ি। গোপাল একা আছে বাড়িতে। কি করছে কে জানে ছেলেটা।
ঘরে ঢুকেই চমকে যায় নেত্য।
মেঝেতে পরে আছে গোপালের নিথর দেহ। নেত্য গোপালের কাছে যেতে পারেনা। কোন এক
অদৃশ্য শক্তি নেত্যকে যেতে দেয়না গোপালের কাছে। ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।