মঈনুল আহসান
ছেলেবেলায় বার্ষিক পরীক্ষা পরবর্তি সময়টা ছিল দারুন উপভোগ্য। তখন উঠে যেত ধরাবাঁধা সব নিয়মকানুন। দিনগুলো কাটতো খেলাধুলা আর এলোমেলো লাগামহীন কর্মযজ্ঞে। ১৯৭৩/৭৪-এর পরীক্ষা শেষের সেই শীতকালটাও ছিল তেমনি।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তখন দ্রুত ভেঙ্গে পড়ছিল মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা।
ধন, মান, ইজ্জত, আব্রু, প্রাণ সবই ছিল চূড়ান্ত অরক্ষিত এবং অনিশ্চিত। প্রতি সন্ধ্যায় পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা আমার আব্বাকে দেখতাম সহকারী ও বন্ধু স্থানীয়দের সাথে পরদিন কী কী বিপদ হতে পারে এবং তা কিভাবে সামলাতে হবে তার আলাপে ব্যস্ত। আর যাদের ঘরে ছিল তরুনী-যুবা তাদের আতংক ছিল বর্ণনাতীত।
অবশ্য ঘরে-বাহিরের সেই গুমোট পরিবেশেও আমরা ছোটরা ছিলাম স্বভাব সুল্ভ চপল-চঞ্চল। ‘অবুঝ বালক’ হওয়ার সুবাদে আমাদের বিচরণ ছিল সর্বত্র উন্মুক্ত।
তাই বিনা চেষ্টাতেই দেখে ফেলেছি, সাক্ষী বনে গেছি সে সময়ের বহু বিচিত্র ঘটনার। অনেকটা গল্পের সেই দূরন্ত বালকের মত, যে কিনা চতুর দর্জিদের হাতে প্রতারিত নিত্যনতুন পোষাক লোভী নগ্ন রাজাকে আঙ্গুল ঊচিয়ে নির্ভয়ে বলতে পেরেছিল, ‘আরে, আমাদের মহারাজ যে ন্যাংটো’।
তখন ধারনা হয়নি চোখের সামনে যা দেখছি তা হতে পারে এক কালজয়ী চিত্র। এক ঝলকে যা বলে দেবে তৎকালীন আর্থ- সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয় অবস্থার রূপ, রস, গন্ধ।
শেখ মুজিব তখন অবিসংবাদি ‘বঙ্গবন্ধু’।
শহরে আর গ্রামে, দেয়ালে, পোষ্টারে, টাকাতে, গাড়িতে, বাড়িতে এবং এখানে- সেখানের বিবিধ প্রতীকে তথা দেশের সবকিছুতেই স্থান করে নিয়েছিল তার মুখাবয়ব থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে উত্তোলিত ডান হাতের সেই তর্জনী পর্যন্ত। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম সেই মহান নেতার প্রতিবেশী হওয়ার কারণে। ধানমন্ডি ৩২ নং রোডের সেই বিখ্যাত বাড়ীর আশপাশ দিয়ে যাতায়াত কালে নিজের অজান্তেই দৃষ্টি চলে যেত লৌহ কপাট পেরিয়ে। নেহায়েত ছোট ছিলাম বলে বাড়ির ভেতরে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অবশ্য সে চেষ্টাও কোন দিন করিনি।
তবে আব্বার মুখে শুনেছিলাম ওই বাড়ির ভেতরের কথা। শেখ মুজিবের বিশাল হূদয় আর ব্যক্তিত্বের কথা। আব্বাকে ভেতরে যেতে হয়েছিল মূলতঃ সোবহানবাগ মসজিদ সংক্রান্ত কাজে। মিরপুর রোডের ওপর অবস্থিত এখনকার সুরম্য সোবহানবাগ মসজিদ তখন ছিল টিনের ছাদ দেয়া অনেকটা ছাপড়া ঘরের মত। তার ভেতরেই ছিল ভাঙ্গা চোড়া বাড়িতে মাদ্রাসা।
মসজিদের জায়গা ছিল যথেষ্ট কিন্তু ছিল না সংস্কারের অর্থ।
রাষ্ট্রীয় কাজে বহু ব্যস্ততার মাঝে কোন এক মহেন্দ্রক্ষণে হঠাৎ-ই মসজিদটি নজরে আসে শেখ মুজিবর রহমানের। লোক মারফত মসজিদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডেকে পাঠান তার বাড়িতে। সেই সূত্রেই আব্বাকে যেতে হয়েছিল সেখানে। নিজ বাড়ির এতকাছে একটা মসজিদের এমন বেহাল অবস্থা দেখে শেখ মুজিব বিস্মিত হয়েছিলেন খুবই।
তৎক্ষণাৎ কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মসজিদ সংস্কার ও সৌন্দর্য্য বর্ধনে হাত দেয়ার জন্য।
আব্বা বেচারা ছিলেন মসজিদের ট্রেজারার। উনার জানা ছিল মসজিদ ফান্ডের করুণ অবস্থা। তাই সংস্কারের নির্দেশ পেয়ে তার প্রতিক্রিয়াই হয়েছিল সবচেয়ে বেশী। উনার অসহায় চেহারা দেখে দক্ষ জননেতা মুহুর্তেই বুঝে গিয়েছিলেন অবস্থা।
আশ্বস্ত করেছিলেন দ্রুত। বলেছিলেন, ‘টাকা-পয়সা নিয়ে ভাববেন না। সুন্দর একটা প্লান নিয়ে আসুন যা খরচ লাগে আমি ব্যবস্থা করবো’। সেই আশ্বাসেরই ফলাফল আজকের দৃষ্টিনন্দন সোবহানবাগ জামে মসজিদ।
তা শুধু মসজিদ নয়, প্রেসিডেন্ট মুজিবের চোখে আশেপাশের অনেক কিছুই বোধ করি তখন বেখাপ্পা, জীর্ণ মনে হচ্ছিল।
তাই একদিন সকালে ৩২ নং সড়কের উল্টো দিকে শুক্রাবাদ এলাকার ওকে স্পোর্টস (OK Sports)- এর সামনে যখন বুলড্রেজার দেখলাম তখন আমার ছোট্ট বুকটা কেঁপে উঠেছিল। আতংকিত হয়েছিলাম প্লাষ্টার খসে পড়া ওকে স্পোর্টসের এক তলা দালানটা গুড়িয়ে ফেলার আশংকায়। সে সময় ওই এলাকায় ওকে স্পোর্টস ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রির বিশ্বস্ত দোকান। বিশেষত আমরা বালক, কিশোর, যুবকেরা ছিলাম ওকে স্পোর্টসের নিয়মিত ক্রেতা। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে দেখছিলাম বুলড্রেজারের নির্মম ধাক্কায় তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ছে বেড়ার ঘর আর টিনশেড বাড়ীর সারি।
ভেঙ্গে ফেলা হলো ওকে স্পোর্টসের একপাশের দেয়ালও। কিন্তু কিভাবে যেন বেঁচে গেল দোকানটা। ভাঙ্গাভাঙ্গি শুরুর সময় থেকে দোকানের অসহায় মালিক, কর্মচারীদের দেখছিলাম এর-ওর সাথে কথা বলতে। হয়তো কাকুতি-মিনতিতে কাজ হয়েছিল। কয়েকদিন সময় হয়তো তারা হাতে পেয়েছিলেন জিনিসপত্র সরানোর জন্য।
কিন্তু টিনের ঘর, বেড়ার ঘরের জন্য কোন সময় বরাদ্দ হলো না। একজন মাকে দেখেছি ন্যাংটো বাচ্চাটাকে কোলে আঁকড়ে ভেঙ্গে ফেলা ঘর থেকে টেনে সরাতে সংসারের টুকটাক জিনিসপত্র। কিইবা আর জিনিস? রং চটা বাসন-কোসন, জীর্ণ-ছেঁড়া কাঁথা ইত্যাদি। এত সামান্য দ্রবাদিও যে করো প্রয়োজনীয় হতে পারে তা চাক্ষুষ উপলব্ধি করেছিলাম সেদিনই প্রথম। লোকজনকে দেখেছি ঘুরে ঘুরে ৩২ নম্বর রোডের দিকে তাকাতে, ফিশ ফিশ করতে।
এসব ভাঙ্গনের নির্দেশ নাকি সরাসরি এসেছিল ঐ বাড়ি থেকেই।
এর ক’দিন পরের আরেকটা সকাল। রোদ উঠেছিল কড়া। তাই শীতের দিনেও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল কোমল উষ্ণতা। একাকী সোবহানবাগের দিক দিয়ে ধানমন্ডির ভেতর ঘুরে লেকের মধ্য দিয়ে এলোমেলো হাঁটছিলাম শুক্রাবাদ হয়ে বাসায় ফিরবো বলে।
হাতে ছিল গুলতি। তখন আমাদের নেশা ছিল পথের ধার থেকে নুঁড়িপাথর কুড়িয়ে গুলতি দিয়ে পাখি মারা। পাখির গায়ে কোনদিন ঠিকমত লাগাতে পেরেছি বলে মনে পড়ে না। তবে এবাড়ি, সেবাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙ্গেছি প্রচুর।
পাখির খোঁজে গাছে গাছে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে শেখ মুজিবের বাড়ি বারাবর এসে থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল।
অবাক হতে হয়েছিল নতুন এক দৃশ্য দেখে। পাশাপাশি থাকতাম বিধায় লেকে আসা হতো, মুজিবের বাড়ি এলাকায় যাতায়াত হতো প্রায় নিয়মিত। কিন্তু বিগত দিনগুলোর স্মৃতি ঘেটেও মেলাতে পারছিলাম না সেই দৃশ্য।
দেখলাম চকচকে বেয়নেট লাগানো বন্দুক হাতে একেবারে যুদ্ধ সাজে হেলমেটধারী দুই রক্ষীবাহিনী সদস্য পাহারা দিচ্ছে লোহার একটা খাঁচা। অনেকটা চিড়িয়াখানার বানরের খাঁচার মত মোটা তারের উঁচু বেড়া দিয়ে বানানো খাঁচাটার অবস্থান ছিল মুজিব বাড়ির মেইন গেট সোজা ফুটপাতের ধার ঘেষে লেকের ভেতরে।
তবে ঐ খাঁচার মধ্যে কোন জন্তু ছিল না। ছিল আমাদের মতই কয়েকজন মানুষ। হত দরিদ্র জীর্ণ মলিন চাদর গায়ে কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। প্রচুর রৌদ্র তাপের উষ্ণ সকালেও লোকগুলো খাঁচার মধ্যে বসে ছিল জুবু থুবু হয়ে। নগ্ন প্রায় স্বল্পাচ্ছাদিত রুগ্ন মানুষগুলো শীতে কাঁপছিল খাঁচাটা বড় বড় গাছের ঠান্ডা ছায়ায় থাকার কারণে।
শুরুতেই যেমন বালেছি, আমি ছিলাম তখন এক ‘অবুঝ বালক’। তাই বোধহয় রণসাজে সজ্জিত রক্ষী দু’জন আমাকে ওখান থেকে ভাগিয়ে দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
খাঁচার এক বৃদ্ধকে দেখলাম হঠাৎই তার কুঁজো পিঠটাকে আস্তে ধীরে যতোদূর সম্ভব সোজা করে রং চটা গোল একটা থালা মুজিব বাড়ির দিকে মেলে ধরে বিড়বিড় করে কিছু যেন বলতে লাগলো। বোঝা যাচ্ছিল ভয়ানক দুর্বলতার কারণে বৃদ্ধ দাঁড়াতে পারছিলেন না ঠিকমত। নিদারূন কষ্ট হচ্ছিল যেন হাল্কা ঠোঁট নাড়তেও।
পাশে বসা এক বৃদ্ধাকেও দেখলাম ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মুজিব বাড়ির দিকে। বৃদ্ধের মত বৃদ্ধাও একবার চেষ্টা করলেন উঠে দাঁড়াবার। কিন্তু দ্রুতই আবার বসে পড়লেন শরীরে জড়ানো নোংরা তেল চিটচিটে কাপড়টা ধরে। উঠে দাঁড়ালে সম্ভবত কাপড়ে পুরো শরীর ঢাকবে না সেই জন্যে।
বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দৃষ্টি ধরে আমিও তাকালাম মুজিব বাড়ির দিকে।
দেখলাম বাড়ির গাড়ী বারান্দার ছাদে অসংখ আচারের বোয়ম। ধবধবে স্যান্ডো গেঞ্জী আর চেক লুঙ্গী পরা ওবাড়ির তরুণ ভৃত একে একে মুখ খুলে বোয়ামগুলোকে রোদে রাখছে ছাদ জুড়ে আর দোতালার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কোন্ বোয়াম কতটুকু খুলে কতটুকু কড়া রোদে রাখতে হবে, তর্জনী তুলে সেই দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন মাথায় আঁচল টানা, পরিপার্শ্বকতার প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন শাশ্বত এক বাঙ্গালী নারী স্বয়ং বেগম মুজিব।
বুঝতে অসুবিধা হলো না খাঁচায় বন্দি লোকগুলো চেষ্টা করছিল বেগম মুজিবেরই করুণা আকর্ষণের। সম্ভবত আচার ছাড়াই তারা চাইছিল এক মুঠো সাধারন কোন খাবার।
বাল্যকালের ফ্রেশ মেমরিতে আটকে যাওয়া দৃশ্যটা আমার কাছে এখনও এতটাই স্পষ্ট যে প্রায়ই মনে হয় পেন্সিল বা রং তুলির আঁচড়ে ছবিটাকে স্থায়ী করে রাখি কোন ক্যানভাসে আমাদের সবার প্রতিদিনের শিক্ষার জন্যে, কিন্তু পারি না, কারণ আমি যে চিত্র শিল্পী নই।
লস এঞ্জেলস, ইউএসএ
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।