আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমার বিষন্নতার কথা

....

প্রবাস জীবনে যা হয় আর কি? একটু ফুরসত পেলেই গল্প করতে বসে যাই। আমার বাসা থেকে দু ব্লক দুরেই একটা গ্রোসারী। ওখানে এক বাঙ্গালী ছেলে কাজ করে, নাম মামুন । মামুন হলো গল্পের রাজা, ওর গল্প বলার ভঙ্গীটা মোহিত হবার মত। মামুন যখন গল্প বলতে শুরু করে আমি তা হা করে গিলে গিলে খাই।

আজ রোববার, ছুটি। সন্ধার দিকে আমি হাটতে হাটতে মামু্নের গ্রোসারীতে চলে গেলাম। একটা কফি হাতে কিছুক্ষন পত্রিকার পাতা উল্টে-পাল্টে অঢেল উদ্ভট খবরগুলো গলাধঃকরন করে ক্রমশঃ মন হাঁপিয়ে উঠতে লাগলো। বাসায় ফিরতে মন টানছিলনা একেবারেই; হাতে তখনও অঢেল সময়, কিছুই করার নেই। মামুনকে বললাম “অনেকদিন তোমার গল্প শোনা হয়নি-একটা গল্প বল শুনি” হাতের কাজগুলো শেষ করে মামুন বলল, গল্প শুনবেন? তাহলে একটা পুরানো গল্প বলি।

বল। এক ছিল চাষীপুত্র; চাষীপুত্রের পিতা অর্থাত চাষা মারা গেছেন অনেক আগেই। দুখিনী মায়ের সাথেই চাষীপুত্রের বসবাস। তো, চাষীপুত্র একবার ভয়ানক প্রেমে গেলো, আকাশ ছোয়া প্রেম। কার প্রেমে? কার আবার? রাজকন্যার।

সে এমন প্রেম যে চাষীপুত্রের চোখে কোন ঘুম নেই, পেটে দানা পানি পড়েনা, কেঊ কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে উত্তরও দেয় না। দুখিনী মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে খোকা? ছেলে কোনো কথা বলেনা, কেবলি কাঁদে। ছেলের কষ্টে মায়ের বুক হাহাকার করে উঠে, মা-ও কাঁদে। অবশেষে ছেলে মাকে জানায় রাজকুমারীর কথা। মা ভেবে পায় না কি করে এই বোকা ছেলেকে সে সান্তনা দেবে।

মা বলে আহারে খোকা আমার, যদি জানতাম কি পেলে রাজকুমারী তোকে ভালোবাসবে তাহলে তাই দিয়ে তাকে বউ করে নিয়ে আসতাম। মায়ের সান্তনায় বোকা ছেলের মাথায় বুদ্ধির উদয় হয়; সে দৌড়ে যায় রাজকুমারীর কাছে। চাষীপুত্র রাজকুমারীকে তার মনোবাসনার কথা বর্ণনা করে এবং এও জানায় যে তার মা বলেছে যে রাজকুমারী যা চায় তাই তাকে দেয়া হবে। রাজকুমারী তখন সখীসঙ্গে ক্রীড়ায় মত্ত। পাগলের কথা শুনে সে হেসে কুটি কুটি, বলে তোমার মা তাই বলেছে বুঝি? যাও তবে তোমার মায়ের হৃতপিন্ডটি ছিড়ে নিয়ে এসো, ও দিয়ে আমি খেলা করব।

রাজকুমারী রাজী হয়েছে, এই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া--এই ভেবে ছেলে দৌড়ে যায় মায়ের কাছে এবং মাকে রাজকুমারীর আব্দারের কথা বলে। মা’ তার বুক খুলে ছেলেকে বলে একটা কুড়োল দিয়ে এ বুকটা চিরে নিয়ে যা আমার হৃতপিন্ড, তাতে যদি তুই সুখী হোস আমার কোন কষ্ট নেই। ছেলে রাজকুমারীর প্রেমে কাতর, মায়ের কথা ভেবে দেখার ফুরসত তার নেই। তড়িত গতিতে, ঘরের বেড়ার ফাঁক থেকে কুড়োলটা নিয়ে এসে এক কোপে মায়ের বুকটাকে অর্ধেক করে ফেলে। তারপর, তাজা-রক্তে পিছল হয়ে যাওয়া হৃতপিন্ডটা দু হাতে খাবলে ধরে দৌড়াতে থাকে রাজকুমারীর বাড়ীর দিকে।

.........পাহাড় পর্বত ডিঙ্গোতে যেয়ে ছেলে হোচট খেয়ে মাটিতে থুবরে পড়ে, হাত থেকে পিছলে দুরে ছিটকে পড়ে মায়ের তখনো জীবিত হৃতপিণ্ডটা। ব্যথা পেয়ে ছেলে কোঁকাতে থাকে আর মায়ের হৃতপিন্ডটা বলে ঊঠে “খুব ব্যথা পেলি রে খোকা?” এ গল্পটা আমি আগেও শুনেছি কিন্তু মামুনকে তা বলার মতো শক্তি আমার ছিলনা, কেমন যেন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। গল্প শেষ হলো আর আমার মনটা ভালো হওয়ার চেয়ে যেন হাজারওগুন বেশী খারাপ হয়ে গেলো। আমি বললাম মামুন আজ যাই তবে। বাসায় এসে শুয়ে পড়লাম, রাতে আর কিছু খেতে ইচ্ছে হলোনা।

বার বার মনে হতে থাকলো এ যেন আমার-ই জীবনের গল্প, কেন তা মনে হচ্ছে তার কোন হদিস পেলাম না। চিন্তাগুলো ক্রমশঃ জট পাকাতে লাগলো, জানালার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে বিদেশী চাঁদ কেমন যেন এক কবরের নিঃশব্দতা বুনে চলছে আমার ঘরে। হঠাত মনে হলো আমিও কি সেই ছেলে নই যে মায়ের নাড়ী ছিড়ে সহস্র মাইল দুরে পাড়ি জমিয়েছে কোনো এক অদেখা রাজকুমারীর লোভে? রাজকুমারী মিলবে বলেইতো আমি আজ মা-মাতৃভুমি ত্যাগ করে এই অদৃশ্য-মরীচিকাকে ধাওয়া করে চলেছি। আর কত দূর যেতে হবে আমায়? মা-মাটি-মাতৃভুমিকে নিজের স্মৃতিতে কবর দিয়েছি কোন অভীপ্সাকে সার্থক করব বলে? হায়! যদিবা চলার পথে কখনও মুখ থুবড়ে পড়ি এই বিদেশ বিভুয়ে, পৃথিবীর অন্যপ্রান্ত থেকে সেই চিরন্তন মা বুঝি আমার পতনধ্বনি শুনতে পেয়ে বলে উঠবে, “খুব ব্যথা পেলি রে খোকা?” ধুত কি সব ভাবছি বলুন তো? আমার মাথাটাই বুঝি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সব ঠিক হয়ে যাবে কাল, কাজের চাপে এসব ভাবনার আর কোনো সুযোগ-ই পাওয়া যাবে না।

তারচেয়ে বরং দুটো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে নিই...............আয় ঘুম আয়। আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা............

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।