"আকাশে নক্ষত্র দেখে নক্ষত্রের মতন না হয়ে পারিনি আমি / নদী তীরে বসে তার ঢেউয়ের কাঁপন, / বেজেছে আমার বুকে বেদনার মত / ঘাসের হরিৎ রসে ছেয়েছে হৃদয়"। _আহমদ ছফা
পর্ব - ৪
মাস্টারদা চলে গেলেন আত্মগোপনে, কিন্তু বিপ্লবীরা তাদের কাজকর্ম প্রকাশ্যে পরিচালনার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। চট্টগ্রাম শহরে অনন্ত সিংহ ও লোকনাথ বলের পরিচালনায় একটি ব্যায়ামাগার স্থাপন করা হল, নাম দেয়া হল 'সদরঘাট ক্লাব'। ওই ক্লাবই পরিণত হল বিপ্লবীদের মিলনক্ষেত্রে। এখানে এবং অন্যান্য স্থানে গোপন বৈঠকে চট্টগ্রাম স্বাধীন করার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি চলতে থাকে।
এবার তাঁরা ডাকাতির আশ্রয় না নিয়ে নিজেদের বাড়ি থেকে চুরি করে, পরিচিতজনদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ইত্যাদি নানা উপায়ে আর্থিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অস্ত্র সংগ্রহ এবং অস্ত্রচালনা প্রশিক্ষণও চলছিল গোপনে গোপনে। তবে বিপ্লবের উদ্দেশ্যে সংগৃহিত অস্ত্র কেবল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই অর্থাৎ সাহেবদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হবে _ এমন মনোভাবও তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁরা প্রকাশ্য রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
ইতোমধ্যে মাস্টারদা সূর্যসেন প্রকাশ্যে চলে আসেন এবং চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন।
কংগ্রেসের কার্যকরি কমিটিতে বিপ্লবী দলের সদস্যরাই সংখ্যাধিক্য লাভ করেন। এ সময় কয়েক হাজার যুবকের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে যুব সমিতি যার নেতৃত্বে ছিলেন গণেশ ঘোষ। নবগঠিত ছাত্র সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন লোকনাথ বল। ওই সময়ে তাঁদের প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম শহরে এবং আশেপাশের গ্রামগুলোতে বহু ব্যায়াম সমিতি গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃক শহরের ক্লাবগুলোতে ছাত্র-যুবকদের ব্যায়াম শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অনন্ত সিংহকে শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়।
অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে বিপ্লবীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসের সাথে যুক্ত বিপ্লবী শক্তিগুলোর ভোটে নেতাজী সুভাষ বসু জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। ১৯২৮ সালের ২৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর কংগ্রেসের কলিকাতা অধিবেশনে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ প্রদর্শন এবং নেতাজী কর্তৃক সালাম গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
১৯২৯ সালে চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের উদ্যোগে জেলা রাজনৈতিক সম্মেলন, জেলা যুব সম্মেলন, জেলা ছাত্র-ছাত্রী সম্মেলন এবং জেলা নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনগুলির সভাপতিত্ব করেন যথাক্রমে সুভাষ বসু, জ্যোতিষ ঘোষ এবং নৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে সূর্যসেন এবং তাঁর সহযোগী বিপ্লবীরা পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে সরে এসেছিলেন। বিপ্লবীরা পরিবারের মেয়েদের সাহায্য-সহযোগিতা লাভের জন্যও চেষ্টা শুরু করলেন। বিপ্লবী বই, কাগজপত্র লুকিয়ে রাখা, অর্থসংগ্রহ করা, আত্মগোপন করা, গোপন বৈঠক করা ইত্যাদি কাজে পরিবারের মহিলাদের সহযোগিতা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। আবার প্রীতিলতাসহ বেশ কয়েকজন নারীও বিপ্লবী দলের সদস্য হওয়ার জন্য চাপ তৈরি করেছিলেন। ফলে একটি নারী সম্মেলন অনুষ্ঠান এবং ওই সম্মেলনের প্রধান দায়িত্ব স্থানীয় নারীরাই পালন করবেন এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
নারী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কংগ্রেস নেত্রী লতিকা বসু।
এই নারী সম্মেলনের স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী গঠনের কাজ করতে গিয়েই প্রীতিলতার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে কল্পনা দত্তের। তাঁরা দু'জনেই তখন বেথুন কলেজের ছাত্রী, থাকেন বারাণসীদাস স্ট্রিটের ছাত্রীনিবাসে। সেখানেই তাঁরা কলেজে অধ্যয়নরত চট্টগ্রামের মেয়ে সরোজিনী পাল, নলিনী পালসহ অন্যদের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন মেয়েদর একটি গোপন বিপ্লবী চক্র। এ চক্রের কাজ ছিল অর্থসংগ্রহ করে চট্টগ্রামে পাঠানো।
কলকাতা থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম 'গানকটন' কেনার অর্থ যোগাড় করতে গিয়ে ছাত্রীদের কাছ থেকে গায়ের অলঙ্কার সংগ্রহ, এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কলকাতা থেকে বোমার খোল চট্টগ্রামে বয়ে আনার কাজও প্রীতিলতাসহ অন্য মেয়েরা করেছেন। এঁদের বাইরে ইন্দুমতী সিংহ, কুমুদিনী রক্ষিত, বিনোদিনী সেন, কুন্দপ্রভা সেনগুপ্তা, সাবিত্রী দেবী প্রমুখ নারী বিপ্লবীদের নাম উল্লেখযোগ্য।
রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং স্বাধীন জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার যে আকুতি বিপ্লবীদের মধ্যে জেগে উঠেছিল তা বাস্তবায়নের জন্য মাস্টারদা উদ্যোগী হলেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠন করা হল ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি বা ভারতীয় গণতান্ত্রিক বাহিনী। সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় অত্যন্ত গোপনে, এবং নিখুঁতভাবে।
১৮ এপ্রিল ১৯৩০। মাস্টারদার নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখার নির্ভীক বিপ্লবীরা তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন ইংরেজ রাজশক্তির ওপর। ওই দিন রাত ৯টা ৫৫ মিনিট (কারো কারো মতে রাত ১০টা ১০ মিনিট) একযোগে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে অবস্থিত অস্ত্রাগার দখল, পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাবে আক্রমণ এবং শহরে প্রচারপত্র বিলি করার পরিকল্পনা নিয়ে বিপ্লবীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করেন। রাত দশটার মধ্যে সমগ্র পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়। এ ঘটনায় বিপ্লবীদের কেউ আহত হয়নি।
অস্ত্রাগার দখল শেষে পুলিশ লাইনে বিপ্লবীদের সকল অংশ জড়ো হয়ে অভ্যুত্থানের প্রধান নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনকে ভারতের অস্থায়ী স্বাধীন সরকারের প্রধান বা প্রেসিডেন্ট হিসাবে ঘোষণা দেন এবং সামরিক কায়দায় তাঁকে অভিবাদন জানান।
বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে যে প্রচারপত্র বা লিফলেট চট্টগ্রাম শহরে বিলি করা হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল _"ব্রিটিশ-শাসকগণ ত্রিশ কোটি ভারতবাসীকে চিরদিন দাসত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ রাখিবার উদ্দেশ্যে এবং ভারতবাসীর জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত করিয়া তাহাদের মধ্য হইতে জাতীয়তাবাদের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত মুছিয়া ফেলিবার উদ্দেশ্যে নিষ্ঠুরতম নীতি হিসাবে যুগযুগান্তকাল ধরিয়া যে অত্যাচার উৎপীড়ন চালাইতেছে তাহার বিরুদ্ধে আজ এতদ্বারা ভারতীয় রিপাবলিকান বাহিনীর চট্টগ্রাম শাখা রুখিয়া দাঁড়াইবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছে। ভারতবাসীরাই ভারতবর্ষের প্রভু, কেবল ভারতবাসীরাই ভারতের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকারী। ভারতবাসীরা একটা বিদেশী সরকারের দ্বারা সেই অধিকার হইতে দীর্ঘকাল যাবৎ বঞ্চিত থাকিলেও সেই অধিকার বিলুপ্ত হয় নাই, কোনও দিন তাহা হইবেও না। ভারতীয় রিপাবলিকান বাহিনী অস্ত্রশক্তির দ্বারা বিশ্বের সম্মুখে সেই অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার সংকল্পই আজ ঘোষণা করিতেছে এবং এইভাবে জাতীয় কংগ্রেসের দ্বারা ঘোষিত স্বাধীনতার আদর্শ কার্যকরী করিতে যাইতেছে।
স্বাধীনতার জন্য, মাতৃভূমির মঙ্গলের জন্য, বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে মাতৃভূমিকে মহিমামণ্ডিত করিবার জন্য রিপাবলিকান বাহিনীর প্রত্যেকটি সভ্য তাহার জীবন উৎসর্গ করিবার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করিতেছে। আজ রিপাবলিকান বাহিনী দুঃখভারাক্রান্ত ও ক্রোধকম্পিত চিত্তে ভারতভূমিতে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা ভারতবাসীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যার কথা, ভারতীয় নারীদের কামানের মুখে উড়াইয়া দিবার কথা, ভারতীয় যুবকদের নির্বিচারে ফাঁসি ও সুপরিকল্পিত হত্যার কথা, নিষ্ঠুর ব্রিটিশের বুটের তলায় ভারতীয় শিশুদের পিষিয়া মারিবার কথা, ভারতের শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস করিবার কথা স্মরণ করিতেছে এবং ভারতের নিহত সন্তানদের হত্যার প্রতিশোধের জন্য শপথ গ্রহণ করিতেছে। রিপাবলিকান বাহিনী ভারতের প্রত্যেকটি মানুষের সমর্থন পাইবার অধিকারী বলিয়াই জাতীয় আদর্শ ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এতদ্বারা প্রত্যেক ভারতবাসীর সমর্থন দাবি করিতেছে এবং আশা করে যে, কোনো স্বাধীনতাকমী ভারতবাসীই নিষ্ক্রিয়তা, কাপুরুষতা ও মনুষ্যত্বহীনতা দ্বারা এই মহান আদর্শের অবমাননা করিবে না। আজিকার এই চরম মুহূর্তে চট্টগ্রামবাসীরা এই আহ্বানে অবশ্যই সাড়া দিবে এবং তাহাদের সাহস, দেশভক্তি ও তাহাদের সন্তানদের আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হইয়া নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার এই মহান কর্তব্য সম্পাদনে যোগ্যতার প্রমাণ দিবে। " (ভারতের জাতীয়তাবাদী বৈপ্লবিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায়, পৃ: ৩১৯)
বিপ্লবী বাহিনীর পরিকল্পনা ছিল পুলিশ লাইন ও অস্ত্রাগার দখল শেষে শহরে প্রবেশ করে সরকারি ট্রেজারি, জেলখানা, বন্দুকের দোকান ইত্যাদি আক্রমণ করা এবং ট্রেজারির অর্থ জনগণের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া; ইংরেজ সমর্থকদের প্রকাশ্যে বিচার করা এবং কোর্ট বিল্ডিং দখল করে জাতীয় সরকার ঘোষণা করা।
কিন্তু অজ্ঞতাবশত একটি ছোট ভুল বিপ্লবীদের সমস্ত সাফল্য ম্লান করে দেয়। অস্ত্রাগার দখলে এলেও বারুদ ঘর তারা খুঁজে পেলেন না। এই তথ্য তাঁরা জানতেন না যে অস্ত্রাগার ও গোলা-বারুদ ঘর এক জায়গায় রাখা হয় না। এরই মধ্যে একটি দুর্ঘটনায় বিপ্লবী বাহিনীর এক অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মূল বাহিনী শহরের উপকণ্ঠে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেয়।
.............................................. চলবে ...............................................
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।