আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অবিস্মরণীয় চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ এবং মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন (১)

"আকাশে নক্ষত্র দেখে নক্ষত্রের মতন না হয়ে পারিনি আমি / নদী তীরে বসে তার ঢেউয়ের কাঁপন, / বেজেছে আমার বুকে বেদনার মত / ঘাসের হরিৎ রসে ছেয়েছে হৃদয়"। _আহমদ ছফা

'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না' _ গোটা দুনিয়ার এ-প্রান্তে ও-প্রান্তে উপনিবেশ কায়েমকারী বর্বর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এই দম্ভে ছিল অন্ধ। আর ভারতবর্ষের বুকে তাদের শাসন-শোষণের প্রত্যাঘাত কেউ দিতে পারে _ এ ছিল তাদের কল্পনারও বাইরে। কিন্তু বীরপ্রসূ বাংলার সাহসী যৌবন সেদিন অসীম স্পর্ধায় ব্রিটিশ রাজশক্তিকে পদাঘাত করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। পৃথিবীর মানুষের সামনে অন্ধকারে বিদ্যুৎ-চমকের মতো আরেকটি সত্য তারা তুলে ধরেছিল _ সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল যত দীর্ঘ এবং যত শক্তিশালীই হোক, দেশপ্রেমের আধারে যৌবনের শক্তি তাকে তুচ্ছ করে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সংগঠিত ওই বিদ্রোহের নাম 'চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ', যার সর্বাধিনায়ক ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। আর তার অনুসারী ছিলেন বীরকন্যা প্রীতিলতার মতো অসীম সাহসী অগণিত ছাত্র-যুবক, তরুণ-তরুণী। তারা সেদিন জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ, কালারপোল যুদ্ধসহ অসংখ্যা ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন _ যা শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারতবর্ষের মুক্তিকামী মানুষের বুকে বিপুল সাহস আর উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এদেশে প্রায় দুইশ বছর রাজত্ব করেছে। শুরু থেকেই একদল মানুষ ছিল যারা শাসকদের গোলামী করা আর লাথি-জুতা খাওয়াকেই নিজেদের নিয়তি বলে মেনে নিয়েছিল।

সমাজের একটা অংশ ছিল এ বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। আর একটা অংশ ছিল যারা ইংরেজ রাজশক্তির প্রতি নিজেদের প্রভুভক্তির চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছে, ক্ষমতার হালুয়া-রুটির উচ্ছিষ্ট চেটেছে। এদের বাইরেও একটা অংশ ছিলেন যারা সংখ্যায় হাতে গোনা, কিন্তু তাঁরাই দেশপ্রেম আর মনুষ্যত্বের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে আহ্বান করেছেন মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তারা শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত হননি, স্বাধীনতার যূপকাষ্ঠে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দেশবাসীর ঘুমন্ত-নির্জীব বিবেককে জাগাতে সচেষ্ট হয়েছেন। পরাধীন দেশকে মুক্ত করতে ভারতবর্ষের প্রান্তে প্রান্তে বিপ্লবীরা সেদিন নানা কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন।

আর সমগ্র বিপ্লবী আন্দোলনের ভরকেন্দ্র ছিল বাংলা, বিশেষত আজকের বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য থাকায় বিপ্লবীরা সেদিন নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাদের নানা সীমাবদ্ধতাও ছিল। কিন্তু পরাধীনতার গ্লানি মোচন করে স্বাধীনতার লক্ষ্যে নিঃশঙ্ক চিত্তে নির্ভীক প্রাণে জীবনদান এবং সমস্ত দুঃখ-কষ্ট-প্রতিকূলতাকে বরণ করে নিয়ে তারা দেশপ্রেমের অনন্য উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন। অগ্নিশিশু ক্ষুদিরামকে দিয়ে যার সূচনা, কানাইলাল, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন, যতীন দাস, শান্তি-সুনীতি, বিনয়-বাদল-দীনেশ হয়ে প্রীতিলতা-সূর্যসেনে তার বলিষ্ঠ প্রকাশ।

মাস্টারদা খ্যাত সূর্যকুমার সেনের জন্ম ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ, চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার নোওয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম রাজমণি সেন, মায়ের নাম শশীবালা সেন। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান। পাঁচ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর থেকে সূর্যসেন লালিত-পালিত হয়েছেন তাঁর বড় কাকা গৌরমণি সেনের কাছে। পরবর্তীতে জ্যাঠাতুতো দাদা চন্দ্রনাথ সেন তাঁর অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন।

ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন মেধাবী। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ শাসকদের চক্রান্তমূলক বঙ্গভঙ্গ রোধকল্পে যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে তার ঢেউ বাংলার প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। বলে রাখা ভাল, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের এ উত্তাল সময়টাতেই সূর্যসেনের শৈশব কেটেছে। এ আন্দোলন তাঁর মাঝে গভীর রেখাপাত করেছিল নিঃসন্দেহে। স্কুলের লেখাপড়ার গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে চট্টগ্রাম কলেজে ও পরে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯১৮ সালে বিএ পাস করেন।

জানা যায়, ওই কলেজের শিক্ষক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, যিনি নিজে যুগান্তর দলের সদস্য ছিলেন, তাঁকে বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি গণিতের শিক্ষক হিসেবে ওরিয়েন্টাল স্কুলে যোগ দেন। ১৯২০-২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় একটি জাতীয় বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। তিনি সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ শুরু করেন। এর মধ্য দিয়েই তিনি খ্যাত হন মাস্টারদা নামে।

আর দশজন শিক্ষকের মতো ছাত্রদের তিনি শারীরিক শাস্তি দিতেন না, স্নেহ-ভালোবাসা দিয় জয় করতেন। আর তাই ছাত্ররাও তাঁকে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। এই স্কুলই তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ... (চলবে) ...

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.